বিদেশি ত্রাণের লোভে ৯ বছর ধরে রোহিঙ্গা সেজে নিবন্ধিত হাজার হাজার বাংলাদেশি ফেঁসে গেলেন এনআইডি-পাসপোর্ট করতে গিয়ে

১০ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের অন্তত এক হাজার বাংলাদেশি বায়োমেট্রিক ডাটাবেজে নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করেছিলেন—ত্রাণ পাওয়ার আশাতেই এই পথ বেছে নেন তারা এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরে নাম তুলিয়েছিলেন। সম্প্রতি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ একীভূত হওয়ার পর গত জুলাই থেকে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। সরকারি বিভিন্ন সেবা—যেমন পাসপোর্ট তৈরি, ভোটার নিবন্ধন কিংবা বিদেশযাত্রা—নিতে গিয়েই মূলত প্রশাসনিক জটিলতায় পড়ছেন নিজেদের রোহিঙ্গা পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেওয়া এই ব্যক্তিরা। এমনই একজন কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা দিনমজুর মোস্তাক মিয়া, যার পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সময় তিনি নিজের উঠানে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনটি রোহিঙ্গা পরিবারকে। সেই সময়ই বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের সুযোগে নিজের নামও রোহিঙ্গা হিসেবে তুলিয়ে নেন মোস্তাক, এরপর টানা ৯ বছর ধরে তিনি ও তার পরিবার নিয়মিতভাবে রেশন গ্রহণ করে আসছিলেন। কিন্তু সেই রেশনের সিদ্ধান্তই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে মোস্তাক মিয়ার জন্য। চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষদিকে পাসপোর্ট করাতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন তার বড় ছেলে মিজানুর রহমান। আঙুলের ছাপ নেওয়ার সময় দেখা যায়, মিজানের তথ্য রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত ডাটাবেজে শনাক্ত হচ্ছে—যদিও জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই নিবন্ধিত। দুই ডাটাবেজের এই গরমিলের কারণে কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস তার আবেদন গ্রহণ না করেই ফেরত পাঠায়। এ প্রসঙ্গে মিজানুর রহমান বলেন, ‘যখন রোহিঙ্গারা এসেছিল তখন আমার বয়স ছিল ১৪ বছর। পরিবারের অন্যান্য সদস্যসহ ক্যাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে বায়োমেট্রিক করেছিলাম। দুই বছর আগে এনআইডিও পেয়েছি। সে মোতাবেক পাসপোর্ট করতে গিয়েছি। কিন্তু ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে গেলে আমাকে ফিরিয়ে দেয়।’ শুধু মিজানুর একা নন—উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির-সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী অন্তত এক হাজার বাংলাদেশি একই সমস্যায় জর্জরিত। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে চান না, তবে ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেজ থেকে নিজেদের নাম বাতিল করাতে তারা এখন ছুটছেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কার্যালয়ে কার্যালয়ে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ৯ বছর ধরেই বাঙালিদের রোহিঙ্গা বনে যাওয়ার এই বিষয়টি এলাকায় সবার জানা ছিল। তবে গত জুলাইয়ে এনআইডি ডাটাবেজের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ সংযুক্ত হওয়ার পরই একে একে এসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। দ্বৈত তথ্যের এই জটে পাসপোর্ট তৈরি, ভোটার নিবন্ধন কিংবা বিদেশযাত্রার মতো বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেক বাংলাদেশি নাগরিক। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ইউএনএইচসিআরের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়, সীমিত সংখ্যক বাংলাদেশিকে ভুলবশত নিবন্ধন করা হয়েছিল। সংস্থাটির ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গা নন এমন ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া বর্তমানে চালু আছে এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথ প্রক্রিয়ায় যাদের নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত করছে, তাদের রোহিঙ্গা নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। যেভাবে রোহিঙ্গা সেজেছিলেন তারা স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা ঢল নামার পর ত্রাণসহায়তা পাওয়ার লোভে অনেক বাংলাদেশি নিজেদের আসল পরিচয় গোপন করে ইউএনএইচসিআরের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজে রোহিঙ্গা হিসেবে নাম তোলেন। এই কাজে তাদের সাহায্য করেন ক্যাম্পের মাঝি (রোহিঙ্গাদের স্থানীয় নেতা) এবং বায়োমেট্রিকের দায়িত্বে থাকা কিছু কর্মকর্তা ও সুপারভাইজার—বিনিময়ে জনপ্রতি নেওয়া হতো এক থেকে দেড় হাজার টাকা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুতুপালং ক্যাম্প ১-এর সাব ব্লকের এক মাঝি জানান, ওই এলাকার বাংলাদেশিরা রোহিঙ্গা ডাটাবেজে নিবন্ধিত হতে প্রথমেই মাঝিদের পরামর্শ নিতেন এবং সেই সঙ্গে মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রামের নাম-ঠিকানা এমনকি বার্মিজ মুদ্রার নাম ও ভাষাও কিছুটা রপ্ত করে নিতেন। আরেক মাঝি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ কাজে সহযোগিতাস্বরূপ ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছিল। আর ক্যাম্পের বায়োমেট্রিক সেন্টারে থাকা সুপারভাইজার ও সহকারীরা উৎকোচের বিনিময়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের রোহিঙ্গা সাজতে সহায়তা করে।’ কুতুপালং লম্বাশিয়া এলাকার বাসিন্দা শহিদ উল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘যেসব পরিবার নিবন্ধিত হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই দরিদ্র। তারা রোহিঙ্গাদের কারণে জমি বা বাগান হারান। জীবিকা হারিয়ে সহায়তা পেতে ডাটাবেজে নাম তুলেছিল। তখন বুঝতে পারেনি, ত্রাণের জন্য নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হবে।’ নাম বাতিলের আবেদনের হিড়িক গত ২৯ ও ৩০শে জুলাই এবং ১লা আগস্ট উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী ও থাইংখালী এলাকায় বাংলাদেশি পরিবার, ক্যাম্পের মাঝি ও একাধিক প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকাতেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এছাড়া টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং, নয়াপাড়া ও বাহারছড়ার শীলখালী এলাকাতেও বাংলাদেশি থেকে রোহিঙ্গা বনে যাওয়ার বহু নজির মিলেছে। কুতুপালং লম্বাশিয়া এলাকার একাধিক বাসিন্দার ভাষ্যমতে, ওই ক্যাম্পের ৪৫০ থেকে ৫০০টি বাংলাদেশি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই রোহিঙ্গা ডাটাবেজে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পের একাধিক মাঝি জানান, কাঁটাতারের ভেতরে বসবাসরত বাঙালি জসিম উদ্দিনের পরিবারের চার সদস্য, জয়নাল উদ্দিনের পরিবারের পাঁচ সদস্য, মোহাম্মদ রফিকের পরিবারের পাঁচ সদস্য এবং ফরিদ আলমের পরিবারের পাঁচ সদস্য রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে রেশন কার্ড নিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদ আলম রেশন কার্ড নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং জানান, রোহিঙ্গা ঢলের পর তারা কোনো সহায়তাই পাননি। তার ভাষায়, ‘আশপাশের মানুষ আমাদের সঙ্গে দুশমনি করছে।’ মোস্তাক আহমদ (৪২) বলেন, ‘মাস তিনেক আগে আমার ছেলের পাসপোর্ট করেছি। তবে জমির খতিয়ানসহ অনেক কাগজপত্র দেখাতে হয়েছে।’ কোনো জটিলতায় পড়েছেন কি না জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার সব ঠিক আছে।’ ফরিদ আলম ও মোস্তাক আহমদ অস্বীকার করলেও ক্যাম্পের হেড মাঝি আবদুর রশিদ নিশ্চিত করেন যে উল্লেখিত পরিবারগুলো রোহিঙ্গাদের মতোই ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘তারা প্রতি মাসের শুরুতে রেশন পান। পূর্ণাঙ্গ তালিকা আমার হাতে আছে।’ রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অনেকে ত্রাণের আশায় রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধনে নাম তোলে। এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ও রোহিঙ্গা ডাটাবেজ একীভূত হওয়ার পর পাসপোর্টসহ নানা সরকারি সেবা নিতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়ছেন। আমার ওয়ার্ডে ২০ থেকে ৩০টি পরিবারের এমন সমস্যা রয়েছে। অনেকের নাম বাদ দিতে আবেদনে সুপারিশ করেছি।’ পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ইউনিয়ন থেকে ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন জেলা প্রশাসন ও আরআরআরসি কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, বিশেষত যারা পাসপোর্ট করতে গিয়ে আটকে গেছেন তাদের ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেজ থেকে নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ত্রাণের লোভ একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এখন তাদের ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু পাসপোর্ট নয়, ভবিষ্যতে ভোটার নিবন্ধনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবাও জটিল হয়ে যেতে পারে। অনেক তরুণ আছে, যারা ২০১৭ সালে শিশু ছিল। এখন প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পাসপোর্ট করতে গিয়ে জানতে পারছে, তারা রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত।’ ডাটাবেজ একীভূত হতেই ধরা পড়ছে বেশি শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্যমতে, এতদিন রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডাটাবেজের নিয়ন্ত্রণ ছিল ইউএনএইচসিআরের হাতে, আরআরআরসি কেবল সেই তথ্য দেখার (রিড-অনলি) সুবিধা পেত। পরবর্তীতে সরকার অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। এ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার তথ্য ধারণের জন্য নতুন একটি সার্ভার তৈরি করে, যা চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে ইউএনএইচসিআর ধাপে ধাপে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক তথ্য বাংলাদেশি সার্ভারে স্থানান্তর করা শুরু করে। আরআরআরসি জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল ডাটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে। এর ফলে কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি বা পাসপোর্ট বানাতে গেলে যেমন ধরা পড়ছেন, তেমনি বাংলাদেশি নাগরিক হয়েও রোহিঙ্গা পরিচয়ে নিবন্ধিত ব্যক্তিদের তথ্যও উঠে আসছে। কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহ বলেন, ‘বহু আগে থেকেই রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিদের ডাটাবেজ একীভূত করা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও যেসব বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে চান তাদের আগে রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ থেকে নাম ও তথ্য মুছতে হবে। না হয় পাসপোর্ট করা যাবে না। ইতিমধ্যে অনেককে ফেরত পাঠিয়েছি।’ আবেদন জমা পড়ছে একের পর এক কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বাংলাদেশি নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতেই পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু কেউ যদি ত্রাণ পাওয়ার আশায় নিজেকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করে থাকেন, সেটি বেআইনি। এ ধরনের এক হাজারের মতো আবেদন আমাদের কাছে এসেছে। আবেদনকারীদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘যেসব বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে গিয়ে আটকে যাচ্ছেন মূলত ওই ধরনের তথ্যগুলো বেশি পাচ্ছি। প্রথমে জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পর সরকার বিষয়গুলো সামনে এনেছে। আমরা সুপারিশ করতে পারি, কিন্তু বাদ দেওয়া একটি গভীর ও জটিল সংকট।’ মোট কতটি আবেদন জমা পড়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না।’ ইউএনএইচসিআরের দাবি: ভুলবশত নিবন্ধন জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান জানান, ‘২০১৭ সালে স্বল্প সময়ের মধ্যে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেই জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’ ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তথ্য বিনিময়-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় সেই তথ্য ইউএনএইচসিআরের কাছে হস্তান্তর করা হয়, এরপর ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ যাচাইকরণ কার্যক্রম চালানো হয়। শারি নিজমান আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী। কয়েক দশক ধরে ধাপে ধাপে তাদের নাগরিক পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র কেড়ে নেওয়া হয়। ২০১৭ সালের সহিংসতার সময় অনেকে কোনো পরিচয়পত্র ছাড়াই প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবিক মানদণ্ড অনুযায়ী এমন নিবন্ধন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, এমন কেউ নিবন্ধনের বাইরে না থাকেন বা জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে না পড়েন।’ তিনি যোগ করেন, ‘এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথ যাচাইকরণ সাক্ষাৎকারসহ বিভিন্ন যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যাতে শরণার্থী নন এমন কেউ নিবন্ধিত না হন। তবে এসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সীমিত সংখ্যক অ-আশ্রিত ব্যক্তি ভুলবশত নিবন্ধিত হয়েছেন। এমন ঘটনা শনাক্ত হলে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য সরকার ও ইউএনএইচসিআরের একটি নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে।’ কিছু বাংলাদেশি নাগরিক ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা নিবন্ধন থেকে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেছেন উল্লেখ করে তিনি শেষে বলেন, ‘ইউএনএইচসিআর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে একটি প্রক্রিয়া চালু করেছে, যার মাধ্যমে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ যাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত করে, তাদের শরণার্থী নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই কার্যক্রম চলমান। কক্সবাজারে আরআরআরসি কার্যালয় ও ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এটি পরিচালিত হচ্ছে।’ নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, যারা রোহিঙ্গা ডাটাবেজ থেকে নিজেদের নাম বাতিলের আবেদন করেছেন, তাদের নাম-ঠিকানা প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো প্রকৃত রোহিঙ্গা বাংলাদেশি এনআইডি বা পাসপোর্ট তৈরির উদ্দেশ্যে নিজেকে ‘ভুলবশত নাম উঠে যাওয়া বাংলাদেশি’ পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশি হতে চাইছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে।