যাত্রীদের অভিযোগ— রাত কাটাচ্ছেন মেঝেতে, খাবার ও চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা
যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের একটি ফ্লাইট ইতালির রোম বিমানবন্দরে আটকা পড়ে রয়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল থেকে আটকে থাকা উড়োজাহাজটির ২৬০ জন যাত্রীকে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরেই অপেক্ষা করতে হয়েছে। এসব যাত্রীদের হোটেলে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এমন অবস্থায় লাউঞ্জে জায়গা না পেয়ে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের অনেকে বিমানবন্দরের মেঝেতে রাত কাটিয়েছেন। যাত্রীদের অভিযোগ তাদের খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও বিশ্রামেরও ব্যবস্থাপনা করেনি বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে নিয়মিত জ্বালানি নেওয়ার সময় উড়োজাহাজটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর প্রায় ৮ ঘণ্টা যাত্রীদের উড়োজাহাজের ভেতরেই বসিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ। দীর্ঘ সময় পর যাত্রীদের বিমান থেকে নামানো হলেও তাদের জন্য ছিল না পর্যাপ্ত বিকল্প ব্যবস্থা। ফ্লাইটের ২৬০ যাত্রীর মধ্যে অন্তত ১৭০ জন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী। তারা ইতালিতে প্রবেশ করতে না পেরে বিমানবন্দরের বাইরে গিয়ে হোটেলে উঠতে চাইলেও পারেননি। বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির খেসারত দিতে হয়েছে যাত্রীদেরই। জানা গেছে, বিমান বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ শুক্রবার রাতে একটি লাউঞ্জের ব্যবস্থা করে। তবে ২৬০ যাত্রীর তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। জায়গা না পেয়ে অনেককে বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে বসে ও মেঝেতে শুয়ে থাকতে হয়েছে। ভুক্তখোগী যাত্রীরা জানান, ফ্লাইটে থাকা শিশু ও বয়স্কদের পাশাপাশি ডায়াবেটিক রোগীরাও চরম দুর্ভোগে পড়েন। কারও ইনসুলিন বা প্রয়োজনীয় ওষুধ লাগেজে থাকলেও তা সময়মতো ব্যবহার করতে পারেননি। শিশুদের খাবার নিয়েও সংকট তৈরি হয়। এমনকি নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২ ঘণ্টা পর সকালের নাশতা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ফ্লাইটের যাত্রী মো. আবু সাঈদের বলেন, ত্রুটির কথা বলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানের ভেতরে বসিয়ে রাখা হয়। এক পর্যায়ে অনেক যাত্রী অসুস্থ বোধ করলে তাদের নামিয়ে নেওয়া হয়। তবে হোটেলে নয়, সারারাত মেঝেতে কাটাতে হয়েছে তাদের অনেককে। অন্য এক যাত্রী বলেন, ‘এখানে চরম বিপর্যয় পরিস্থিতি।’ অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে যাত্রীদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সেই বক্তব্যের মিল নেই। বিশেষ করে বিদেশের একটি বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ সময় ফ্লাইট গ্রাউন্ডেড থাকার পরও কেন পর্যাপ্ত লাউঞ্জ, খাবার, চিকিৎসা সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যবস্থা আগে থেকে করা হলো না এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কখনোই পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়; কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা, খাবার, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তার জন্য বিকল্প পরিকল্পনা বা জরুরি ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ত্রুটি মেরামতে শনিবার দুপুরে একদল প্রকৌশলী রোমের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে তাদের পৌঁছানোর কথা। ত্রুটি সমাধান হলে শনিবার রাত ১০টায় ফ্লাইটটি রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ার কথা। সে ক্ষেত্রে রোববার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের ঢাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ সবকিছু পরিকল্পনামতো হলেও যাত্রীদের প্রায় ৪০ ঘণ্টা রোম বিমানবন্দরে আটকে থাকতে হবে। এ ঘটনায় বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেছেন, ইতালির রোমে কারিগরি ত্রুটিতে গ্রাউন্ডেড হওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ মেরামতের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিমানমন্ত্রী আরও বলেন, ইতালিতে বিমান মেরামতের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমইউ) ছিল, তাদের কাছ থেকে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। তারা ফেল করেছে, পার্টস দিতে পারেনি। রোমে কারিগরি ত্রুটির কারণে ফ্লাইট গ্রাউন্ডেড থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, টেকনিক্যাল টিমের কাজ শেষ হলে রোববারের মধ্যে ফ্লাইটটি বাংলাদেশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে আরও দক্ষ টেকনিক্যাল টিম নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। বিমানমন্ত্রী বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে বর্তমানে কিছু উড়োজাহাজ পুরোনো। তাই নতুন কিছু উড়োজাহাজ কিনে বিমান বহরে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
