যুবলীগ নেতার বাড়িতে হামলা-লুটপাটে গিয়ে জনতার প্রতিরোধে হাত খোয়ানো বিএনপি নেতা কীভাবে ‘জুলাই যোদ্ধা’?
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের উৎখাতের পর ময়মনসিংহে ছড়িয়ে পড়েছিল উল্লাস। কিন্তু সেই রাতের একটি নৃশংস ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিএনপির অঙ্গসংগঠন তাঁতি দলের কোতোয়ালি থানা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সরকারি তালিকায় ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আল আমিন (৩৮)। এক হাতে কোপের দাগ এবং অন্য হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ছবি ও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর তার এই ‘আহত হওয়ার গল্প’ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধোঁয়াশা। যদিও আল আমিনের দাবি, তিনি বিজয় মিছিল শেষে বাড়ি ফেরার পথে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ওয়ার্ড কমিশনারের লোকজনের হামলার শিকার হন। তবে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বক্তব্য আল আমিনের এই দাবির একদম বিপরীত। আল আমিন ২০২৪ সালের ১৬ই অক্টোবর কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলায় দাবি করেন, ৫ই আগস্ট আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কমিশনার রাশেদুজ্জামান রোমানের কার্যালয়ের সামনে তার ওপর হামলা হয়। যদিও আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় নেতারা জানান, ৫ই আগস্ট সন্ধ্যার আগেই শহরের সব বিজয় মিছিল থেমে যায়। মানুষ বাড়ি ফেরে। সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রাণভয়ে দুপুরের পরেই ঘরবাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। আল আমিন নিজেও স্বীকার করেন তাদের বিজয় মিছিল বিকেলে শেষ হওয়ার কথা। আল আমিনের বাড়ি ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সানকিপাড়া শেষমোড় এলাকায়। অথচ ঘটনাটি ঘটে তার বাড়ি থেকে প্রায় ২ কিলোমিটারের বেশি দূরে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের কলপা গ্রামে। দুটি পৃথক স্থানের অবস্থানের প্রেক্ষিতে, শহরে ফেরার পথে ৪ নম্বর ওয়ার্ড পার হয়ে কেউ কলপা গ্রামে যায় না। ফলে “বাড়ি ফেরার পথে হামলা”র দাবিটি ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাচ্ছে না। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ঘটনাটি বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় নয়, ঘটে রাত ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সুলতান মোহাম্মদ রোহানের ভাষ্যমতে, যুবদল নেতা আসাদুজ্জামান নবীন ও আল আমিনসহ ৮-১০ জন কয়েকটি মোটরসাইকেল নিয়ে কলপা গ্রামে যান আধিপত্য বিস্তার করতে। সেখানে আগে থেকেই ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। আন্দোলনে উপস্থিত থাকা ‘আকাশ’ (নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না) নামের এক কর্মী জানান, সেখানে যুবলীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর গ্রামবাসী একজোট হয়ে মসজিদে মাইকিং করে “ডাকাত পড়েছে” বলে রটিয়ে দেয়। এতে নারী-শিশুসহ পুরো গ্রামবাসী তাদের ঘিরে ফেলে। ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে পালাতে গিয়ে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়ে গেলে গ্রামবাসী আল আমিনকে ধরে ফেলে। তখন ডাকাত ভেবে তার ওপর হামলা চালায় এবং তার হাত কেটে ফেলে। ময়মনসিংহ জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক গকুল সূত্রধর মানিক এখন আল আমিনের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, ১৯শে জুলাই রেদোয়ান হোসেন সাগরের নিহত হওয়ার ঘটনাসহ আন্দোলনের কোনো পর্যায়েই আল আমিনকে দেখা যায়নি। হঠাৎ করে তিনি কীভাবে গেজেটভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ তালিকায় নাম লেখালেন, নিয়মিত ভাতা তুলছেন, এককালীন আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিলেন, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষার্থীরা।
