উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ল পৌনে ৩ কোটি টাকার সড়ক, বাঁশ-বালুর বস্তায় ঠেকা!
সাভারের ধামসোনা ইউনিয়নের নলাম এলাকায় প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি এইচবিবি সড়ক আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই বিভিন্ন স্থানে ধসে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে চলা নির্মাণকাজ সম্প্রতি শেষ হলেও অল্প সময়ের ব্যবধানেই রাস্তার একাধিক জায়গায় ফাটল, ধস এবং ব্লক সরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে নির্মাণমান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিআরএমআইপি) আওতায় জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে মুকেন্দ্র হাউস থেকে করিমের পাড়া ব্রিজ পর্যন্ত ১ হাজার ২৭৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৩ মিটার প্রশস্ত এই সড়কটি নির্মাণ করা হয়। একই প্রকল্পের আওতায় তিনটি ছোট কালভার্টও নির্মিত হয়েছে। চলতি বছরের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশে ধস দেখা দেয়। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, রাস্তার একাধিক স্থানে মাটি দেবে গিয়ে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, বহু জায়গায় এইচবিবি ব্লক সরে গেছে এবং রাস্তার কিনারা ভেঙে পড়েছে। যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোতে অস্থায়ীভাবে বাঁশের বেড়া ও বালুর বস্তা বসানো হয়েছে। তবে প্রতিদিন বহু মানুষ ও যানবাহন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মো. মকবুল বলেন, “কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা করা হয়েছে। কিন্তু এখন গাড়ি চলা তো দূরের কথা, মানুষ হেঁটে চলতেও ভয় পাচ্ছে। গাইডওয়াল ঠিকমত না দেওয়ায় মাটি ধসে গেছে।” আরেক বাসিন্দা ফয়সাল হোসেন বলেন, “পুরো সড়কের কাজেই অনিয়ম হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই রাস্তা ভেঙে পড়ছে।” শিল্পী আক্তার নামে একজন বলেন, “কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই সড়ক ভাঙতে শুরু করে। এখন ভাঙা জায়গায় বাঁশ দিয়ে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে।” এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় মান বজায় রাখা হয়নি এবং রাস্তার পাশ সুরক্ষায় শক্তিশালী গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়নি। পাশাপাশি নদী থেকে আনা মাটি ব্যবহারের কারণে ভারী বর্ষণে সেই মাটি ধুয়ে গিয়ে রাস্তার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তাদের দাবি। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হলে এত দ্রুত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা নয় বলেও মনে করছেন তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্পের অধিকাংশ বিল ইতোমধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উত্তোলন করে নিয়েছে। তবে শেষ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আবেদন করা হলেও সড়কের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে সেই বিল আপাতত স্থগিত রেখেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি সিরাজুল ইসলাম সুমন জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক কারণে রাস্তার পাশের মাটি ধসে গেছে। ব্যবহৃত মাটি নদী এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কার করে যথাযথভাবে প্রকল্প বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সাভার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. ফাইজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের কিছু কাজ মানসম্মত হয়নি, তাই চূড়ান্ত বিল আটকে রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ও কালভার্টের পিলার সংস্কারে নতুন করে কাজ করতে হবে এবং সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, প্রকল্পটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি। ঠিকাদারকে সব ত্রুটি দূর করে নতুন নকশা অনুযায়ী ভাঙা অংশ সংস্কার করতে হবে এবং কাজ সন্তোষজনকভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বকেয়া বিল পরিশোধ করা হবে না বলে জানান তিনি। স্থানীয়দের দাবি, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত উন্নয়ন প্রকল্পের এমন পরিণতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা নির্মাণকাজের গুণগত মান তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে সড়কটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
