৭৭ শতাংশ বেড়েছে সরকারের ব্যাংকঋণ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা বেশি

৬ আগস্ট, ২০২৬ | ৫:২০ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি, ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তি ব্যয় এবং সঞ্চয়পত্রে নেতিবাচক প্রবণতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরজুড়ে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৭ শতাংশ বেশি। রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থনীতিবিষয়ক সামগ্রিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে সরকারের ঋণগ্রহণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের অতিরিক্ত ঋণের প্রায় পুরো অংশই এসেছে তফসিলি বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। অর্থবছরে এসব ব্যাংক থেকে সরকার নিট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা ঋণ নিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সরকারের নিট দায় ৪ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা কমেছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন অর্থ সৃষ্টির পরিবর্তে বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের ওপরই নির্ভর করেছে সরকার। অন্যদিকে, ব্যাংকের বাইরের উৎস থেকে সরকারের ঋণগ্রহণে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যেখানে এসব উৎস থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ৩৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে হয়েছে ঋণাত্মক ৫৬৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন ঋণ নেওয়ার চেয়ে সরকার পরিশোধ করেছে বেশি। এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে দুর্বল বিক্রির বিষয়টি উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৩ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন করে সঞ্চয়পত্র কেনার তুলনায় নগদায়ন বা ভাঙানোর পরিমাণ ছিল বেশি। সরকারকে ব্যাংকমুখী হওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করলেও তা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৮১ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকা, ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়তি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি—এই তিনটি কারণ সরকারি ঋণ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। এদিকে সরকারি ঋণ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধীরগতি অব্যাহত রয়েছে। মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে, বিপরীতে একই সময়ে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে ব্যাংক আমানত ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ব্রড মানি ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থনীতিতে মিশ্র চিত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রবণতাই উঠে এসেছে। একদিকে প্রবাসী আয় ৩০ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, চলতি হিসাবের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক পরিশোধ ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে দুর্বলতা স্পষ্ট। জুলাই-এপ্রিল সময়ে বড় শিল্প উৎপাদন ১ দশমিক ৪২ শতাংশ কমেছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে কমে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, ব্যাংকিং খাতের তারল্য, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক খাতের বিভিন্ন সূচকে উন্নতি হলেও উৎপাদন, রপ্তানি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরেনি। ফলে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র এখনো মিশ্রই রয়ে গেছে।