কোরআনের দৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত যারা
পবিত্র কোরআনে যেখানে ‘ক্ষতি’ (খুসরান)-এর কথা এসেছে, তা মূলত দ্বিনের ক্ষতিকেই বোঝায়। আর কোরআনের ভাষায় ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ তারাই, যারা নিজেদের আখিরাত হারিয়েছে। কোরআনের চোখে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে আলোচনা করা হলো— যারা কুফরিতে নিমজ্জিত: আল্লাহ তাআলার প্রতি কুফরই সর্ববৃহৎ ক্ষতি। কারণ এটি এমন এক ক্ষতি, যা চিরস্থায়ী এবং মানুষকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা মিথ্যায় বিশ্বাস করেছে এবং আল্লাহকে অস্বীকার করেছে, তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা : আল-আনকাবুত, আয়াত : ৫২) সম্পদ ও সন্তান কিছু মানুষের ক্ষতির কারণ : নুহ (আ.) তাঁর জাতির কাফেরদের সম্পর্কে বলেছিলেন, তারা আমার অবাধ্য হয়েছে এবং এমন লোকদের অনুসরণ করেছে, যাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তাদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করেছে। (সুরা : নুহ, আয়াত : ২১) আল্লাহর সৃষ্টিগত নিদর্শন থেকে শিক্ষা না নেওয়া : যে কুফর মানুষকে ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়, তার মধ্যে অন্যতম হলো আল্লাহর সৃষ্টিগত নিদর্শন এবং শরিয়তের বিধানসমূহ অস্বীকার করা। আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা : আয-যুমার, আয়াত : ৬৩) মনগড়া কাজ করা ও আত্মমুগ্ধ হওয়া: কিছু মানুষ এমন অনেক কাজ করে, যেগুলোকে তারা সৎকর্ম বলে মনে করে। কিন্তু তাদের সেই পরিশ্রম দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকে, আখিরাতে তা তাদের কোনো উপকারে আসে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, বলুন, আমি কি তোমাদের এমন লোকদের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হলো সেইসব মানুষ, যাদের সমস্ত প্রচেষ্টা দুনিয়ার জীবনেই ব্যর্থ হয়েছে, অথচ তারা মনে করে যে তারা খুব ভালো কাজ করছে। (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ১০৩-১০৪) দুনিয়ার স্বার্থে ঈমান আনা: মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যার ঈমান শুধু দুনিয়ার স্বার্থের জন্য। ঈমানের মাধ্যমে যদি সে ধন-সম্পদ, মর্যাদা বা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ করে, তবে সে দ্বিনের ওপর অটল থাকে। কিন্তু ঈমানের কারণে যদি কোনো পরীক্ষা বা কষ্ট আসে, তবে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরা সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। কারণ তারা ঈমানকে দুনিয়া অর্জনের উপায় বানিয়েছে, অথচ দুনিয়াকে ঈমানের সেবায় নিয়োজিত করেনি। আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ এমন আছে, যারা দ্বিধাগ্রস্তভাবে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোনো কল্যাণ হয়, তবে সে তাতেই সন্তুষ্ট থাকে; আর যদি কোনো পরীক্ষায় পড়ে, তবে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়ই হারায়। এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সুরা : হজ, আয়াত : ১১) কোরআনে আরো কিছু কাজকে বিশেষভাবে ক্ষতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে মানুষ সেগুলো থেকে সতর্ক থাকে। এর মধ্যে আছে- অন্যায়ভাবে নিরপরাধ মানুষ হত্যা: আল্লাহ বলেন, সে নিজের ভাইকে হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। (সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৩০) দারিদ্র্য বা লজ্জার ভয়ে সন্তান হত্যা: আল্লাহ বলেন, নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা নির্বুদ্ধিতাবশত ও অজ্ঞতার কারণে নিজেদের সন্তানদের হত্যা করেছে। (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১৪০) আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করা: আল্লাহ বলেন, তারাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ২৭) আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করা: আল্লাহ বলেন, আল্লাহর কৌশল থেকে শুধু ক্ষতিগ্রস্তরাই নিজেদের নিরাপদ মনে করে। (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৯৯) আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন হয়ে পড়া: আল্লাহ বলেন, হে মুমিনরা! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে। আর যে এমন করবে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা : আল-মুনাফিকুন, আয়াত : ৯) আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা পোষণ করা: আল্লাহ বলেন, তোমাদের প্রতিপালক সম্পর্কে তোমাদের এই কুধারণাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছ। (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ২৩) কাফেরদের এমনভাবে অনুসরণ করা: আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদাররা! যদি তোমরা কাফেরদের আনুগত্য করো, তবে তারা তোমাদের পিছিয়ে দেবে, আর তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসবে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৯) আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, সেই সকল লোক, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি পরিপক্ব করার পরও ভেঙে ফেলে এবং যেই সম্পর্ক রক্ষা করতে তিনি আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি বিস্তার করে; বস্তুত এমন সব লোক অতি ক্ষতিগ্রস্ত। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭) এখানে আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার বলতে মানুষ সৃষ্টির বহু আগে সব রুহ একত্র করে যে অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছিল তা বোঝানো হয়েছে। সুরা আরাফের ১৭২ নম্বর আয়াতে তার বিশদ বর্ণনা রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, (হে রাসুল! মানুষকে সেই সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও) যখন তোমার রব আদম সন্তানদের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করেছিলেন এবং তাদের নিজেদের সম্পর্কে সাক্ষী বানিয়েছিলেন। (আর জিজ্ঞেস করেছিলেন যে) আমি কি তোমাদের রব নই? সবাই জবাব দিয়েছিল, কেন নয়? আমরা সবাই সাক্ষ্য দিচ্ছি। (এবং এই স্বীকারোক্তি আমি এ জন্য নিয়েছিলাম,) যাতে কেয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো যে আমরা তো এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম। (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭২) এভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর আগেই তাদের থেকে তাঁর আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন। এভাবেই কোরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে প্রকৃত ক্ষতি ধন-সম্পদ, পদমর্যাদা বা পার্থিব সুযোগ-সুবিধা হারানো নয় বরং ঈমান, দ্বিন ও আখিরাত হারিয়ে ফেলা। আর প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে আখিরাতে মুক্তি লাভ করা।
