এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় সিগারেট: বছরে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের বাইরে, যাচ্ছে কার পকেটে?
বাজারে প্রায় সব ব্র্যান্ডের সিগারেটই বিক্রি হচ্ছে প্যাকেটে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে। আইন অনুযায়ী এমআরপির বেশি দাম নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এ চর্চা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে সরকারের রাজস্ব বাড়ছে না; বরং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে জমা হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। শুধু নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের ক্ষেত্রেই বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব সরকারের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে তাদের হিসাব। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো পণ্যই মোড়কে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের বেশি দামে বিক্রি করা যায় না। কিন্তু সিগারেটের বাজারে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব ব্র্যান্ডের সিগারেটই এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১০ শলাকার নিম্ন স্তরের সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের ২১০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু বাজারে নিম্ন স্তরের ১০ শলাকার ডার্বি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০ টাকায়। মধ্যম স্তরের ২০ শলাকার ক্যামেলের দাম নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। উচ্চ স্তরের ১০ শলাকার গোল্ডলিফ বিক্রি হচ্ছে স্থানভেদে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। আর প্রিমিয়াম স্তরের ২০ শলাকার সিগারেটের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৩০ থেকে ৪৪০ টাকায়। ফলে প্রতি শলাকার ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। খুচরা বাজারে অধিকাংশ সিগারেটই প্যাকেট নয়, এক শলাকা হিসেবে বিক্রি হয়। এই পর্যায়েই নির্ধারিত দাম ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত দামে নিম্ন স্তরের একটি সিগারেটের মূল্য ৬ টাকা ২০ পয়সা হলেও বাজারে তা ৭ টাকায় বিক্রি হয়। একইভাবে মধ্যম স্তরের একটি সিগারেটের নির্ধারিত দাম ৯ টাকা ২০ পয়সা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকায়। স্টপ উদ্যোগের আওতায় ২০১৮ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৯ শতাংশ বিক্রেতাই প্যাকেটের বদলে এক শলাকা করে সিগারেট বিক্রি করেন। ২০২১ সালে তিন হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীর ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ ধূমপায়ী নিয়মিত এক শলাকা করে সিগারেট কেনেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার মূল কারণ মূল্য নির্ধারণের বর্তমান কাঠামো। সিগারেটের আবগারি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) নির্ধারিত হয় সরকার ঘোষিত এমআরপির ভিত্তিতে। কিন্তু বাজারে এমআরপির চেয়ে বেশি দাম নেওয়া হলেও সেই অতিরিক্ত অর্থ করের আওতায় আসে না। ফলে ভোক্তা অতিরিক্ত অর্থ দিলেও সরকার তার অংশ পায় না। পিপিআরসির হিসাব অনুযায়ী, শুধু নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেট থেকেই এভাবে বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি সম্ভাব্য রাজস্ব সরকারের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণ ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মুনাফার সুযোগ রেখে এমআরপির চেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহ করে। কিন্তু সিগারেটের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা কার্যকর নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শফিউন নাহিন শিমুল বলেন, পরিবেশকেরা কার্যত এমআরপির কাছাকাছি দামে সিগারেট কিনে থাকেন। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বৈধ মুনাফার সুযোগ থাকে না। সেই ঘাটতি পূরণ করতেই তারা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করেন। তিনি বলেন, প্যাকেটে লেখা মূল্যই ভোক্তার সর্বোচ্চ পরিশোধযোগ্য মূল্য হওয়ার কথা। কিন্তু ডিলারেরাই যদি সেই দামে পণ্য পান, তাহলে খুচরা বিক্রেতারা লাভের জন্য অতিরিক্ত দাম নিতে বাধ্য হন। একজন পাইকারি বিক্রেতার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ প্যাকেটের একটি কার্টন স্থানীয় পর্যায়ে কোম্পানি-নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭ থেকে ১০ টাকা বেশি দামে কিনতে হয়। পরে খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর আগেই কার্টনপ্রতি আরও ১৫ থেকে ২০ টাকা দাম বেড়ে যায়। বাজারের তথ্যেও একই চিত্র পাওয়া যায়। নিম্ন স্তরের ডার্বির ২০ প্যাকেটের একটি কার্টনের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি প্যাকেট ৭২ টাকা। মধ্যম স্তরের নেভি, স্টার ও ক্যামেলের কার্টনের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৮৪০ টাকা, অর্থাৎ প্রতি প্যাকেট ৯২ টাকা। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা এক শলাকা হিসেবে বিক্রি করায় নিম্ন স্তরের একটি প্যাকেট থেকে প্রায় ৮০ টাকা এবং মধ্যম স্তরের একটি প্যাকেট থেকে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। অথচ সরকার কর আদায় করে নির্ধারিত ৭২ ও ৯২ টাকার ভিত্তিতেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট নীতিমালার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্যাকেটে লেখা এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কোনো আইনি অনুমোদন নেই। প্যাকেটে যে মূল্য লেখা থাকবে, সেটিই চূড়ান্ত খুচরা মূল্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। তবে এ বিষয়ে বাজার তদারকির দায়িত্ব জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বলে জানান তিনি। ঢাকা জেলা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, সাধারণ বাজার তদারকিতে সিগারেটকে নিত্যপণ্যের তালিকায় ধরা হয় না। তবে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা প্যাকেট আকারে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সিগারেট সরবরাহ করে এবং দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে। তবে প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিবেশক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্ধারিত এমআরপিতে সিগারেট কিনতে চাইলে ভোক্তাকে ২০ প্যাকেটের পুরো একটি কার্টন কিনতে হবে। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য কার্যত পাইকারি পরিমাণে কেনাকাটার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়ে যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এমআরপি নির্ধারণ করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের সুপারিশ হলো—পাইকারি, পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ের জন্য আলাদা বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা, প্রতি শলাকার সরকারি মূল্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা, এক শলাকা বিক্রির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা। অধ্যাপক শফিউন নাহিন শিমুলের মতে, বর্তমান মূল্য কাঠামো ব্যবসার স্বাভাবিক নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এতে খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বৈধ মুনাফার কোনো কার্যকর সুযোগ রাখা হয়নি। এর ফলেই নির্ধারিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে।
