প্রোফাইল লাল করা নিয়ে জুলাই-আগস্টের রাজনীতি এবং বর্তমান বাস্তবতা
– ঈমাম হোসেইন একটা বিষয় আমাদের খুব ঠান্ডা মাথায় বুঝতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনায় যারা রাস্তায় নেমেছিল, তারা সবাই এক রকম ছিল না। একই ভিড়ে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য, ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা এবং ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মানুষ ছিল। এই বাস্তবতা অস্বীকার করলে আমরা সত্যের কাছাকাছি যেতে পারব না। শুরুটা হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিতে। এরপর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়। অনেকের কাছে এটি ছিল একটি ছাত্র আন্দোলন, আবার অনেকের মতে এটি সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ নেয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও মতপার্থক্য আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো একটি আন্দোলনের ভেতরে থাকা প্রতিটি মানুষকে একই উদ্দেশ্যের মানুষ ধরে নেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মেলে না। আমি নিজে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। নিজের চোখে এমন অনেক কিছু দেখেছি, যেগুলো বাইরে থেকে বোঝা যায় না। সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল লাল করা যেন এক ধরনের সামাজিক চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনেকেই বিশ্বাস থেকে করেছেন, আবার অনেকেই করেছেন পরিস্থিতির চাপে। কেউ কেউ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে করেছেন, আবার কেউ শুধুমাত্র বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে করেছেন। এমনও দেখেছি, যারা শুরুতে প্রোফাইল লাল করেছিলেন, পরে নিজেরাই বলেছেন তারা বিষয়টি পুরোপুরি বুঝে করেননি। শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বন্ধুদের কাছ থেকেও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। অনেকের ভাষ্য ছিল, যদি কেউ প্রোফাইল লাল না করত, তাহলে তাকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো, সামাজিকভাবে আলাদা করে দেখা হতো,ক্লাস থেকে বয়কটের ভয়ও দেখানো হতো। ফলে অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশ না করেও পরিস্থিতির কারণে সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আজও সেই মানুষগুলোর সবাইকে একই চোখে দেখব? আমার উত্তর হলো, না। কারণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার আছে। কেউ একটি আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেন, কেউ বিরোধিতা করতে পারেন, আবার কেউ নিরপেক্ষও থাকতে পারেন। শুধুমাত্র একটি প্রতীক ব্যবহার করা বা কোনো একটি সময়ে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে একজন মানুষকে চিরদিনের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে বেঁধে দেওয়াকে আমি যুক্তিসংগত মনে করিনা। তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। যারা কেবল মত প্রকাশ করেছেন, আর যারা পরিকল্পিতভাবে হ’ত্যা, সহিংসতা, ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ, হামলা, ভাঙচুর, রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি, সাধারণ মানুষের জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন ; এই দুই শ্রেণিকে এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। যদি কেউ কোনো অপরাধ করে থাকে, যদি কারও বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ বা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ থাকে, তাহলে হিসাব আলাদা। কিন্তু শুধুমাত্র কোনো সময়ে সামাজিক চাপের মধ্যে একটি প্রতীক ব্যবহার করেছিলেন এমন মানুষদের সবাইকে একইভাবে বিচার করা সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেয় না। আমাদের এটাও বুঝতে হবে, রাজনীতি সবার জীবনের কেন্দ্র নয়। যারা সক্রিয় রাজনীতি করেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক দৃঢ় হয়। তারা একটি বিষয়কে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন, মতাদর্শ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ সেইভাবে রাজনীতি অনুসরণ করেন না। তারা অনেক সময় বন্ধুদের প্রভাবে, আবেগে, সামাজিক চাপে কিংবা মুহূর্তের সিদ্ধান্তে কিছু করেন। পরে বাস্তবতা বুঝে নিজেদের অবস্থানও পরিবর্তন করেন। এই বাস্তবতাকে এডমিট না করে রাজনীতি করা কঠিন। তাই এটাকে এডমিট করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে একটি বড় রাজনৈতিক দল যদি দীর্ঘমেয়াদে জনগণের দল হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তাহলে তাকে মানুষের মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে। সবাইকে এক রঙে রাঙিয়ে দেখলে সমাজে বিভাজন আরও বাড়বে। কিন্তু কে কেবল পরিস্থিতির সঙ্গে গিয়েছিল আর কে পরিকল্পিতভাবে ক্ষতি করেছে এই পার্থক্য বুঝে সামনে এগোতে পারলে সামনের দিনে দারুণ সুযোগ তৈরি হবে। আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে হলে এসব রাজনীতি নয়, বরং দায়বদ্ধতা ও পুনর্মিলনের রাজনীতি বেশি প্রয়োজন। যারা ভুল বুঝে, আবেগে বা সামাজিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিন্তু পরে বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন তাদের জন্য সমাজে ফিরে আসার দরজা খোলা থাকা উচিত। অন্যদিকে, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা, নাশকতা বা মানুষ হ’ত্যা এবং ক্ষতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে সময়ে আইনের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এই দুই বিষয়কে এক করে ফেললে বিচারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাজনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো বহুমতের দেশে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার রাজনীতি ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মতের অমিল থাকবে, রাজনৈতিক বিভাজন থাকবে, তর্ক থাকবে। কিন্তু একজন মানুষের একটি প্রতীক, একটি ছবি বা একটি সময়ের সিদ্ধান্ত দিয়ে তার পুরো জীবনকে বিচার করা উচিত নয়। আমাদের বিচার হওয়া উচিত কাজের ভিত্তিতে, অপরাধের ভিত্তিতে বাট মত প্রকাশ করছে তাই একদম ডিমিনিশ করার মানসিকতা রাখা ঠিক হবেনা। কারণ ইতিহাস প্রমাণ করে, আবেগ দিয়ে সমাজকে দীর্ঘদিন চালানো যায় না। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে ন্যায়বিচার, বাস্তবতা এবং মানুষের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। আজ তাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রোফাইল লাল করা সব মানুষকে এক কাতারে না ফেলে, কে শুধুই পরিস্থিতির সঙ্গে গিয়েছিল আর কে সত্যিই ক্ষতির সঙ্গে জড়িত ছিল, সেই পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা। এই পার্থক্য বুঝতে পারলেই বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের হয়ে একটি আরও পরিণত, আরও দায়িত্বশীল এবং আরও মানবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
