জামায়াতের সদস্যদের লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষকতার নির্দেশ: মহিলা মাদ্রাসায় ধর্ষণ ঠেকানোই কি উদ্দেশ্য, নাকি নতুন কোনো কূটকৌশল?
২৩ জুলাই, ২০২৬ | ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশন ও নির্বাহী বৈঠকে নেওয়া এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত ঘিরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর নিষেধাজ্ঞা ও চিঠি
গত ২২ জুন ২০২৬-এ ওই বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১২ জুলাই দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি জেলা ও মহানগরী আমিরদের কাছে পাঠানো হয়। সংযুক্ত ওই চিঠি ইতিমধ্যে দলীয় অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
চিঠিতে জামায়াতে ইসলামীর রোকনদের মধ্যে নারী সদস্যদের বয়েজ স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় এবং পুরুষ সদস্যদের গার্লস স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় শিক্ষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে যেসব নারী সদস্য ছেলেদের স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় এবং যেসব পুরুষ সদস্য মেয়েদের স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় কর্মরত আছেন, তাদের সদস্যপদ মুলতবি করা হবে। শুধু সহশিক্ষা বা কো-এডুকেশন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের জন্য এই নির্দেশনা কার্যকর হবে না।
সিদ্ধান্তটির বাস্তব প্রতিফলনও ইতিমধ্যে দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সুজাউদ্দিন জোয়ার্দারকে গার্লস কলেজে শিক্ষকতা করার কারণে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের ফেসবুক পেজে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কোনো রোকন পুরুষ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
মাদ্রাসায় ধর্ষণের ঘটনা ও এর প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনায় মহিলা মাদ্রাসায় নিয়োজিত শিক্ষক ও অধ্যক্ষ কর্তৃক মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিশু মেয়ে, বালিকা ও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। যেসব এলাকায় এসব মাদ্রাসা অবস্থিত, সেখানকার এলাকাবাসীর হাতেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কন্যাশিশু ও বালিকা ধর্ষণের বিষয়টি ধরা পড়ে। উত্তেজিত এলাকাবাসী অভিযুক্ত ধর্ষককে প্রচণ্ড পিটুনি দেয়, গ্রামবাসী সামাজিক ভাবে নিগৃহীত করে এবং কিছু এলাকায় ভাঙচুর করে মহিলা মাদ্রাসা উচ্ছেদ করে দেয়। এরপর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে মহিলা মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক নিয়োগ কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কিছুদিন আগে ৯ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাপড়ুয়া কন্যাশিশু মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক জোরপূর্বক ধর্ষিত ও অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, যা সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ছাড়া সোনাগাজীর মাদ্রাসায় ধর্ষিত এক কিশোরীর মুখ বন্ধ করতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও ছাত্রদের সহায়তায় আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনা আজও বাংলাদেশের মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। এই সব ঘটনার পাশাপাশি মহিলা মাদ্রাসায় ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু, বালিকা ও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় জনমনে বাড়তে থাকা ক্ষোভ থেকেই “সৎ লোকের শাসন” খ্যাত জামায়াত তাদের পুরুষ সদস্যদের রক্ষা করতে এই লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষকতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। সমাজ সচেতন ব্যক্তিবর্গ ও মাদ্রাসায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী সমাজসেবক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা মনে করছেন, মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষক-অধ্যক্ষ কর্তৃক কোমলমতি কন্যাশিশু, বালিকা ও কিশোরী ধর্ষণের ঘটনাগুলো ক্রমেই বেশি প্রকাশ্যে আসার কারণেই জামায়াতে ইসলামী সদস্যদের শিক্ষকতা বিষয়ে এই বাধ্যবাধকতা জারি করেছে।সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
নারী-শিশুর অধিকারের দাবিতে সোচ্চার অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট কিশোয়ার লোচান জামায়াতের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বলেন,“এটা খুবই হাস্যকর। জামায়াতের নারী সদস্যরা তো কোনো ব্যভিচার বা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নন, তাহলে তাদের ওপর কেন এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিল জামায়াত?”জামায়াতে ইসলামীর এহেন সিদ্ধান্তের কারন ব্যখা করে তিনি বলেন,
“এর কারণ একটাই— কেউ যেন বুঝতে না পারে যে মহিলা মাদ্রাসায় ধর্ষণ ঠেকাতেই জামায়াতে ইসলামী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই সেটা আড়াল করতে নারী-পুরুষ উভয় সদস্যের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বিষয়টিকে লিঙ্গবৈষম্যহীন একটা আবরণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।”ড. নওরিন বলেন, জামায়াত আসলে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। মেয়েদের স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় শিশু/বালিকা/কিশোরী ধর্ষনের দায়ে অভিযুক্ত পুরুষ সদস্যদের উপর থেকে দেশবাসীর সন্দেহ ও প্রশ্ন দূর করতে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি জামায়াতের নারী সদস্যদের ওপরও ছেলেদের স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় শিক্ষকতার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নারী ও পুরুষ সদস্যরা এ ধরনের অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াকে ‘অমানবিক’ আচরণ বলে মনে করছেন। দেশজুড়ে হাজারো জামায়াত নেতা-কর্মী বর্তমানে গার্লস স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। অন্যদিকে অনেক নারী নেত্রী-কর্মী রয়েছেন যারা বয়েজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াচ্ছেন। শুধু দলীয় আদর্শ ধারণ ও নির্দেশনা মেনে চলার জন্য যদি নিজেদের চাকরি ও জীবিকার পথ পরিবর্তন করতেই হয়, তাহলে তা সম্পূর্ণ অন্যায় ও অযৌক্তিক হবে বলে তারা মনে করছেন। ইতিমধ্যে যেসব পুরুষ সদস্য (রোকন) গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজ বা মহিলা মাদ্রাসায় কর্মরত, তাদের সদস্যপদ (রুকনিয়াত) মুলতবি ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেক জেলা শহরে নেতা-কর্মীদের ‘চাকরি ছাড়ুন, নয়তো দল ছাড়ুন’—এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে ফেলা হচ্ছে। একই অবস্থা নারী সদস্যদেরও; যারা বয়েজ স্কুল/কলেজ/মাদ্রাসায় কর্মরত, তারাও একই সংকটে পড়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
