রয়টার্সের প্রতিবেদন: মহাবিতর্ক নিয়ে যেভাবে সেমি’তে ‘ভার্জেন্টিনা’, ফুটবল সমর্থকদের আস্থাহীনতা

১৫ জুলাই, ২০২৬ | ৫:১৬ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে মাঠের বাইরের বিতর্কই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা। একের পর এক বিতর্কিত রেফারিং এবং ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর বা VAR) প্রযুক্তির সুবিধা পেয়ে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে উঠেছে বলে অভিযোগ প্রতিপক্ষ দলগুলোর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল সমর্থকেরা তো আলবিসেলেস্তেদের নতুন নামই দিয়ে দিয়েছেন— ‘ভার্জেন্টিনা’ (VARgentina)। সম্প্রতি ফিফার নতুন রেফারিং প্রোটোকল এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে। ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে ম্যাচগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম আস্থাহীনতা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ও এমবোলোর লাল কার্ড বিতর্কের পারদ চূড়ান্তে পৌঁছায় গত শনিবার আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে। কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (ডাইভিং বা সিমুলেশনের অভিযোগে) দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। রেফারি জোয়াও পিনহেইরো ভিএআর রিভিউয়ের পর তাকে লাল কার্ড দেখান। সুইস কোচ মুরাত ইয়াকিন ফিফার এই ভিএআর সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। নতুন প্রোটোকল ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুম এবং বিশ্বকাপে ভিএআর হস্তক্ষেপের নতুন নিয়ম বা প্রোটোকল চালু করা হয়েছে, যা আগে ব্যাপকভাবে পরীক্ষিত ছিল না। সাবেক ফিফা রেফারি এবং ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম আইটিভি (ITV)-এর নিয়ম বিশ্লেষক ক্রিস্টিনা আঙ্কেল এই নতুন প্রোটোকলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্রিস্টিনা বলেন: ‘আমার মনে হয় না এই প্রোটোকলটি প্রথমত প্রয়োগ করা উচিত ছিল। এটি বড্ড বেশি বিস্তৃত। আমার আপত্তি হচ্ছে, আমরা শুধু কার্ড কে পাচ্ছে তা পরিবর্তন করছি না, আমরা মূল সিদ্ধান্তটিই বদলে দিচ্ছি। একটি ফ্রি-কিক এক দলের পাওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকে সিদ্ধান্ত পুরো ঘুরিয়ে অন্য দলকে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তিটাই বদলে ফেলছি।’ তার মতে, ভিএআর-এর মূল কাজ ছিল রেফারিকে সাহায্য করা, ম্যাচ পুনরায় পরিচালনা (‘re-refereeing’) করা নয়। কিন্তু এই প্রোটোকল রেফারিদের সেই ‘re-refereeing’ এর দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। এই নতুন নিয়ম আর্জেন্টিনা দলের পক্ষে যাওয়ায় সমর্থকদের ক্ষোভ আরও উসকে গেছে। আঙ্কেল আরও বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া এই প্রোটোকলের সম্প্রসারণ যেন একটা বারুদের স্তূপের মতো। আমি শুধু শেষ বিস্ফোরণটির অপেক্ষা করছি।’ গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু হওয়া বিতর্কের ধারাবাহিকতা আর্জেন্টিনাকে ঘিরে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ কিন্তু এক ম্যাচে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রুপ পর্ব থেকেই এই বিতর্ক ডালপালা মেলতে শুরু করে: আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ: প্রথমার্ধে আলজেরিয়ার অধিনায়ক আইসা মান্দির পায়ে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি আঘাত করার পরও তাকে লাল কার্ড দেখানো হয়নি। পরে সেই ম্যাচেই মেসি হ্যাটট্রিক করেন। আলজেরিয়া এই ম্যাচ শেষে বাজে রেফারিংয়ের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ: অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচেও ঘটে প্রশ্নবিদ্ধ রেফারিং। লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার প্রথম গোল করার আগে বিল্ডআপে অস্ট্রিয়ার প্লেয়ারকে ফেলে দিয়েছিলেন ম্যাক আলিস্টার। নিয়ম অনুযায়ী গোল বাতিলের কথা থাকলেও ভিএআর এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেনি। অস্ট্রিয়ার অভিযোগ আমলে নেননি, ম্যাচ শেষে এই দলও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়ে যায়। মিশরের বিপক্ষে শেষ ১৬-র ম্যাচ: ম্যাচের ৬২ মিনিটে মিশর একটি গোল করলেও ভিএআর চেক করে সেটি বাতিল করা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, গোলটি তৈরির বিল্ড-আপে ফাউল হয়েছিল। ম্যাচের শেষ দিকে মিশরের পেনাল্টির আবেদন নাকচ হয়ে যায় এবং ৯২ মিনিটে আর্জেন্টিনা জয়সূচক গোলটি পায়। মিশরের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে, রেফারিদের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফিফার রেফারি প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা অবশ্য মিশরের সঙ্গে ম্যাচে কোনো পক্ষপাতের দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও ক্রিস্টিনা আঙ্কেল মনে করেন, আলজেরিয়া বা মিশরের বিপক্ষে ম্যাচে রেফারিংয়ে বড় কোনো ভুল চোখে পড়েনি। তবে তার মতে, মাঠের বাইরের কিছু সিদ্ধান্ত সমর্থকদের মনে ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। সমর্থকদের চরম আস্থাহীনতা সম্প্রতি ফিফার কিছু সিদ্ধান্ত সমর্থকদের অবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যেমন, মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা শেষ মুহূর্তে তুলে নেওয়া হয়, অথচ ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেল কুয়ানসাকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ইউএসএল উইমেনস লিগের দল ট্যাম্পা বে সান এফসির প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা আঙ্কেল সমর্থকদের এই ক্ষোভ নিয়ে বলেন: ‘আমার মনে হয় সমর্থকদের আস্থা এখন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। একজন রেফারি এবং বিশ্লেষক হিসেবে আমি অনেক বড় টুর্নামেন্ট কাভার করেছি, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মাঠের বাইরে রেফারিদের নিয়ে মানুষের মনে এত ক্ষোভ এবং আলোচনা আমি আগে কখনও দেখিনি।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালের আগে রেফারিং নিয়ে এই বিতর্ক এবং সমর্থকদের আস্থাহীনতা ফিফা ও ম্যাচ অফিশিয়ালদের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে।