বাংলাদেশে আইনজীবীদের ওপর নিপীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ, বিশ্বের ১৬টি আইনজীবী সংস্থার নিন্দা-উদ্বেগ
বিশ্বের ১৬টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী পরিষদ ও ল’ সোসাইটি এক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশে আইনজীবী সমাজের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বাধা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর থেকে আওয়ামী লীগ-সমর্থক বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পরিচিত আইনজীবীদের দেশজুড়ে বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে ব্যাপকভাবে বিরত রাখা হচ্ছে বলে বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (JMBF)-এর স্বাধীন যাচাই এবং বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্তত ২৩টি বার অ্যাসোসিয়েশনে ৩০০-রও বেশি আইনজীবীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, দিনাজপুর, নওগাঁ, ঝালকাঠি, পঞ্চগড়, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও ঠাকুরগাঁও জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন। বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনগুলো মনোনয়নপত্র ইস্যু করতে অস্বীকৃতি জানানো, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানে বাধা সৃষ্টি, স্বেচ্ছাচারীভাবে মনোনয়ন বাতিল, শারীরিক নির্যাতন, হুমকি, সহিংসতা, পুলিশি হয়রানি, জবরদস্তি এবং আইনজীবীদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ তৈরির মতো ঘটনা ঘটেছে। বিবৃতিতে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ৪২ জন আইনজীবীকে “ফ্যাসিবাদের দোসর” আখ্যা দিয়ে তাদের মনোনয়ন বাতিল করেছে। একইভাবে ময়মনসিংহ জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন ১৬ জন এবং মুন্সিগঞ্জ জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন ১১ জন আইনজীবীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে বলে অভিযোগ। ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের ২৩টি নির্বাহী পদ, চট্টগ্রাম বার অ্যাসোসিয়েশনের ২১টি পদ এবং শরীয়তপুর, বরিশাল ও জামালপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের ১৫টি পদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বা স্বতন্ত্র কোনো আইনজীবীকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানানো হয়েছে। গাজীপুরে ১৬টি নির্বাহী পদের জন্য ৩৯ জন আইনজীবী মনোনয়নপত্র চাইলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার তা প্রত্যাখ্যান করেন। চট্টগ্রামে ২১টি নির্বাহী পদের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহে ইচ্ছুক আইনজীবীদের রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী বাধা দেয়, ফলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নাকি তার কার্যালয়ের দরজা বন্ধ করে দেন। ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনের আগের রাতে পুলিশ কর্মকর্তারা এক সভাপতি প্রার্থীর বাসভবনে গিয়ে তাকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শরীয়তপুরে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় এক আইনজীবী শারীরিকভাবে আক্রান্ত হন। কুমিল্লায় স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া গেলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করেন বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী, খুলনা, নওগাঁ, ঝালকাঠি, মানিকগঞ্জ, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, শেরপুর, টাঙ্গাইল, মেহেরপুর, পটুয়াখালী ও চাঁদপুরে স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার, ফৌজদারি মামলার হুমকি, দলবদ্ধ সহিংসতার হুমকিসহ নানা ধরনের ভয়ভীতির পরিবেশ বিরাজ করছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ও স্বতন্ত্র উভয় ধরনের আইনজীবীদের অবাধে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রেখেছে। বার কাউন্সিলে অ্যাডহক কমিটি গঠন নিয়ে উদ্বেগ বিবৃতিতে আরও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে গত ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়ে, যেখানে ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০শে জুন ২০২৭ মেয়াদের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালনার লক্ষ্যে সম্পূর্ণভাবে বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীদের সমন্বয়ে ১৫ সদস্যের একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল দেশের আইন পেশা নিয়ন্ত্রণকারী সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্ত পেশাদার সংস্থা পরিচালনার গণতান্ত্রিক নীতিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং আইন পেশার স্বাধীনতা ও প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রকে ক্ষুণ্ণ করে, যা পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহীত একই অগণতান্ত্রিক চর্চার পুনরাবৃত্তি বলে অভিহিত করা হয়েছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স ৮৪৯ জন আইনজীবীকে প্রভাবিত করা ২৬৮টি দমন-পীড়নের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন—যা জাতিসংঘের আইনজীবীদের ভূমিকা সংক্রান্ত মৌলিক নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে। স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলো বলেছে, এই ঘটনাগুলো নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম বা রাজনৈতিক বিরোধের চেয়ে অনেক বেশি কিছু; এগুলো আইন পেশার স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি স্বরূপ সাংবিধানিক নীতিমালার ওপর একটি পদ্ধতিগত আক্রমণ। আটটি দাবি উত্থাপন যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশ সরকার, আইন পেশার সংশ্লিষ্ট মহল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি নিম্নলিখিত আহ্বান জানানো হয়েছে: ১. বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অ্যাডহক কমিটি গঠনের আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং ত্রুটিপূর্ণ, অনিয়মিত ও বৈষম্যমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ও সকল জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি বাতিল করা; ২. বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার ১৯৭২, সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সংবিধান ও বিধি এবং জাতিসংঘের আইনজীবীদের ভূমিকা সংক্রান্ত মৌলিক নীতিমালা অনুসারে অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অ-বৈষম্যমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা; ৩. অবৈধভাবে বাতিল হওয়া সকল প্রার্থিতা পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক মতামত বা পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক যোগ্য আইনজীবীর মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা; ৪. আইনজীবীদের বিরুদ্ধে সকল প্রকার ভয়ভীতি প্রদর্শন, হয়রানি, স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা, নজরদারি, জবরদস্তি ও সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা; ৫. নির্বাচনী অনিয়ম ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সকল অভিযোগের দ্রুত, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা এবং দায়ীদের আইন অনুযায়ী জবাবদিহিতার আওতায় আনা; ৬. বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ও সকল জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসন, পরিচালনা বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না করে আইন পেশার স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা; ৭. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বার অ্যাসোসিয়েশন, ল’ সোসাইটি এবং আইনি প্রতিষ্ঠানসমূহকে বাংলাদেশে আইন পেশার স্বাধীনতা সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্ত আইনজীবীদের প্রতি সংহতি প্রকাশের আহ্বান; ৮. জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থা, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়, বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক ও জরুরি সম্পৃক্ততার আহ্বান। স্বাক্ষরকারী ১৬টি সংগঠন এই যৌথ বিবৃতিতে যেসব আন্তর্জাতিক সংগঠন স্বাক্ষর করেছে, সেগুলো হলো— ১. কাউন্সিল অব বার্স অ্যান্ড ল’ সোসাইটিজ অব ইউরোপ (CCBE), ব্রাসেলস, বেলজিয়াম ২. জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (JMBF), প্যারিস, ফ্রান্স ৩. ইন্টারন্যাশনাল অবজারভেটরি অব লইয়ার্স অ্যাট রিস্ক (OIAD), প্যারিস, ফ্রান্স ৪. ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল বার কাউন্সিল (CNB), প্যারিস, ফ্রান্স ৫. জার্মান ফেডারেল বার (BRAK), বার্লিন, জার্মানি ৬. ইতালীয় ন্যাশনাল বার কাউন্সিল (CNF), রোম, ইতালি ৭. ফাউন্ডেশন ডে অব দ্য এনডেঞ্জার্ড লইয়ার, দ্য হেগ, নেদারল্যান্ডস ৮. জেনেভা বার অ্যাসোসিয়েশন, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড ৯. জার্মান বার অ্যাসোসিয়েশন (DAV), ব্রাসেলস, বেলজিয়াম ১০. প্যারিস বার, প্যারিস, ফ্রান্স ১১. ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পিপলস লইয়ার্স (IAPL), বোর্দো, ফ্রান্স ১২. ইন্টারন্যাশনাল লিগ এগেইনস্ট আরবিট্রারি ডিটেনশন (ILAAD), প্যারিস, ফ্রান্স ১৩. ল’ অ্যাসোসিয়েশন ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (LAWASIA), ক্যানবেরা, অস্ট্রেলিয়া ১৪. পিপলস ভিজিল্যান্স কমিটি অন হিউম্যান রাইটস (PVCHR), বারাণসী, ভারত ১৫. বেলারুশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব হিউম্যান রাইটস লইয়ার্স, ভিলনিয়াস, লিথুয়ানিয়া ১৬. পাবলিক অ্যাসোসিয়েশন “ডিগনিটি”, আস্তানা, কাজাখস্তান বিবৃতির শেষে স্বাক্ষরকারী সংগঠনগুলো বাংলাদেশের সেইসব আইনজীবীর প্রতি সংহতি জানিয়েছে, যারা কোনো বৈষম্য ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে ও সাহসিকতার সঙ্গে আইনের শাসন ও আইন পেশার স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের পেশাগত ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে চলেছেন।
