একই গ্রাহকের একই ব্যবহারে প্রি-পেইড মিটারে জুনে বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ-তিন গুণ!
বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতো থাকলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করছেন, জুন মাসে তাদের বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশেষ করে প্রি-পেইড মিটারে রিচার্জের টাকা অস্বাভাবিক দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া এবং পোস্ট-পেইড মিটারে প্রকৃত ব্যবহারের চেয়ে বেশি ইউনিট দেখিয়ে বিল করার অভিযোগ উঠেছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তীব্র আর্থিক চাপে পড়েছে। এই অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিকে নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পাশাপাশি ভুক্তভোগী গ্রাহকদের স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস অথবা নির্ধারিত হটলাইনে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রি-পেইড মিটারকে তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থা হিসেবে ধরা হলেও এবার সেই গ্রাহকরাও অভিযোগ তুলেছেন। অনেকের অভিযোগ, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ প্রি-পেইড মিটার দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করা হচ্ছে না, ফলে প্রকৃত ব্যবহারের তুলনায় বেশি টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম মন্ডল বলেন, “গত তিন-চার মাসে কখনো আমাকে তিন হাজার টাকার বেশি রিচার্জ করতে হয়নি। কিন্তু জুন মাসে আমার প্রায় পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা ব্যয় হয়েছে।” একই ধরনের অভিযোগ করেন মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা নয়ন আক্তার। তিনি বলেন, “গত মে মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা রিচার্জে এক মাস চলা গেলেও জুন মাসে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকার মতো।” এ বিষয়ে ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) প্রধান প্রকৌশলী (নেটওয়ার্ক অপারেশন) মঞ্জুরুল হক বলেন, “বিদ্যুতের ট্যারিফ ও স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণে বেশি ইউনিট ব্যবহারে বিল দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরমে এসি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াও বিল বৃদ্ধির একটি কারণ। এ কারণে অনেকের বিল আগের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এটিকে ‘ভূতুড়ে বিল’ বলা ঠিক নয়। ভূতুড়ে বিল বলতে বোঝায় যেখানে ৫ হাজার টাকার বিল হঠাৎ ৫০ হাজার টাকা হয়ে যায়। তবে কোনো মিটারে অস্বাভাবিক সমস্যা বা অভিযোগ পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।” পোস্ট-পেইড গ্রাহকদের অভিযোগ বেশি দেশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন। বাকি বিপুলসংখ্যক গ্রাহক এখনো পোস্ট-পেইড মিটারের ওপর নির্ভরশীল। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি এই পোস্ট-পেইড গ্রাহকদের ক্ষেত্রেই। অনেক এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয় না—কোথাও একসঙ্গে দুই মাসের রিডিং নেওয়া হয়, আবার কোথাও অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা হয়। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের বড় ধরনের অমিল দেখা দেয়। অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উঠছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ বিদ্যুৎ লাইন, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে সিস্টেম লস তুলনামূলক বেশি হয়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বা আয়-ব্যয়ের সমন্বয়ের জন্য অনেক সময় অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ ওঠে। গ্রাহকদের অভিযোগ, গ্রামের মানুষ তুলনামূলক কম অভিযোগ করেন, ফলে তাদের ক্ষেত্রেই অনিয়মের সুযোগ বেশি তৈরি হয়। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন প্রায় ৭২ হাজার গ্রাহক ‘ভূতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। তাদের দাবি, মাঠ পর্যায়ে প্রকৃত মিটার রিডিং সংগ্রহ না করে অনুমাননির্ভর বিল তৈরি করায় তারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঈশ্বরগঞ্জ জোনাল অফিসে সেবা নিতে আসা মো. আশরাফ, শরিফুল হাসান, ইদ্রিস আলী, সাজেদা খাতুন, হোসনেআরা, পিপুল দাসসহ কয়েকজন গ্রাহক জানান, অফিসের ইচ্ছামতো বিল তৈরি করা হচ্ছে এবং দুই মাস ধরে অনেক গ্রাহকের স্বাভাবিক বিলের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি বিল এসেছে। শুধু আবাসিক নয়, বাণিজ্যিক গ্রাহকরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। উপজেলার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, দোকানপাটের বিদ্যুৎ বিল কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাঠ পর্যায়ের মিটার রিডারদের তথ্য অনুযায়ী বিল করা হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিলিং সেকশনের দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার লুৎফা বেগম বলেন, “মাঠের তথ্য অনুযায়ীও বিল করা হয়, আবার ডিজিএম স্যারের নির্দেশনাও অনুসরণ করা হয়।” জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার পাঠানপাড়া এলাকার পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহক পিয়াস করিম বলেন, “সাধারণত আমার বিদ্যুৎ বিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু গত মে মাসে বিল এসেছে এক হাজার টাকার বেশি। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে কর্মচারীরা বলেন, বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে, যার কারণে বিল বেশি হয়েছে।” হাজরাবাড়ি পৌরসভার বাসিন্দা আবুল ফজল বলেন, “আমার বাড়িতে পল্লী বিদ্যুতের দুটি মিটার রয়েছে। একটি মিটারে আগে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বিল আসত, কিন্তু মে মাসে এসেছে ৯০০ টাকা। অন্য মিটারটিতে আগে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিল এলেও এবার বিল এসেছে ১ হাজার ৯০০ টাকা।” বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অর্থবছরের শেষ সময়ে রাজস্ব আয় ও হিসাব সমন্বয়ের চাপ থাকে। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল তৈরির অলিখিত চাপ দেওয়া হয়। পরে তা সমন্বয় করা হলেও অতিরিক্ত ইউনিটের কারণে গ্রাহক উচ্চতর ট্যারিফ স্ল্যাবে চলে গেলে সেই অতিরিক্ত অর্থ আর ফেরত পান না। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ ইতিমধ্যে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও জানিয়েছেন, প্রতিটি বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, সিস্টেম লস কমানোর নামে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহি বাড়াতে মিটার রিডিং ও বিলিং ব্যবস্থাকে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে এবং মিটার রিডিংয়ের ছবি সংরক্ষণ, অনলাইনে যাচাইয়ের সুযোগ ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
