তুরাগে আওয়ামী লীগের ৩ কর্মীর লাশ উদ্ধার: পরিবারের দাবি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, সরকারের ‘না’

২৯ জুন, ২০২৬ | ৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

তুরাগ নদ থেকে গত দুই দিনে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী চরম উত্তেজনা ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের ৭ নেতাকর্মী নিখোঁজের ঘটনার পরই নদ থেকে দলীয় ৩ কর্মীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে এলো। একদিকে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের অনুসন্ধানে এটিকে পুলিশ-বিএনপির যৌথ অভিযানের মুখে পড়ে সলিলসমাধি ও পরিকল্পিত ধামাচাপার ঘটনা বলে দাবি করা হচ্ছে; অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসন পুরো বিষয়টিকে ‘দুর্ঘটনা’ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছে। নিজস্ব অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেরদিন ২২শে জুন দুপুরে টঙ্গীতে মিছিল শেষে আশুলিয়ার তুরাগে সন্ধ্যায় শেষে শপথ নেন দলের কিছু নেতাকর্মী। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ওইদিন দুপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী দিয়াবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে তারা বিকেল পর্যন্ত ওই এলাকায় অবস্থান করেন। সন্ধ্যা নামলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ মিরপুর বেড়িবাঁধ ঘাট থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করে আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। নৌকার ভেতরে অবস্থানকালে তারা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান ও শপথ নেন। দীর্ঘ সময় নৌকায় তাদের এই অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর একপর্যায়ে বাইরে জানাজানি হয়ে যায়। অভিযোগ উঠেছে, নৌকাটি যখন আশুলিয়া বাজার ঘাটে এসে পৌঁছায়, তখন আশুলিয়া বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মতিউরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সেখানে অবস্থান নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও ওই অভিযানে যোগ দেন। নৌকাটি ঘাটে ভিড়তেই প্রথম দফায় নেমে যাওয়া ৭-৮ জন নেতাকর্মীকে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীরা যৌথভাবে ধরে ফেলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নৌকার মাঝিরা ঘাট থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিএনপি কর্মীরা নৌকার নোঙরের রশি টেনে ধরেন। এ সময় ঘাটে থাকা পুলিশ-বিএনপি এবং নৌকার ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন নদে পড়ে যান। যার মধ্যে সুমন, বিপ্লবসহ তিনজন ছিলেন। যারা পানিতে ডুবে মারা যান। উদ্ধারকৃত আওয়ামী লীগের কর্মীদের মরদেহ পুলিশ দাবি করেছে, নিহতরা সাঁতার জানত না। এ বিষয়ে নিহত সুমনের খালু বাবু বলেন, সুমন ছাত্রলীগ করতো এটা জানতাম না। ২২ তারিখ রাতে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় বলে আমাকে ফোন করা হয়। তারপর আমরা জানতে পারি আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামতে গেলে পুলিশ-বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার মুখে অনেকে পড়ে, সেখানে সুমন নদে পড়ে যায়। ওইদিন পুলিশ যে ৭ জনকে আটক করে, তারমধ্যে সুমন ছিল না। তিনি আরও বলেন, আমরা ২৩ তারিখ রাত থেকেই তুরাগে সুমনকে খুঁজছিলাম তবে ২৪ তারিখে দুইজনের লাশ পাই, পরে শুনি এরা সুমনের সাথে ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পরে ২৫ তারিখে পুলিশ ফোন করে জানায় আশুলিয়া ব্রিজের কাছে একটা লাশ পাওয়া গেছে, আমরা পরে পুলিশের কাছে গিয়ে দেখি সেটা সুমনের। ধামাচাপা ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে যে, নদীতে মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর জানার পর থেকেই স্থানীয় পুলিশ পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। নিহতদের পরিবারকে চাপ দিয়ে একে ‘পিকনিকের দুর্ঘটনা’ হিসেবে জাহির করতে বাধ্যতামূলক সংবাদ সম্মেলন করানোর চেষ্টা করা হয়। পুলিশের এই চাপের মুখে ভয়ে পরিবারগুলোর সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। নিহত সুমনের রানাভোলার বাসায় আশুলিয়া বাজার ফাঁড়ির এএসআই মতিউর গিয়ে তল্লাশি চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। সুমনের মোবাইল ফোন থেকে মিছিল-মিটিংয়ের সমস্ত রাজনৈতিক ছবি ও ভিডিও ডিলিট করে দেওয়া হয় এবং ঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি ও গ্রেফতারের ভয়ে সুমনের বাবা গত দুই দিন ধরে পলাতক রয়েছেন। একইভাবে, নিহত অপর তরুণ বিপ্লবের পরিবারও এলাকায় একাকী থাকার কারণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং গত তিন দিন ধরে তার বাবা-মায়ের কোনো খোঁজ মিলছে না। গণমাধ্যমের ভূমিকার সমালোচনা করে ভুক্তভোগী পক্ষ জানায়, প্রথম দিকে পুলিশি ভীতির কারণে মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো পরিবারের বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরতে পারেনি। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ আংশিক বক্তব্য প্রকাশ করলেও মূল ঘটনাটি এড়িয়ে কেবল পুলিশের বরাতেই খবর প্রচার করা হচ্ছে। পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও অপমৃত্যুর মামলা এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে বাংলাদেশ পুলিশ সদরদপ্তর এবং আশুলিয়া থানা পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তুরাগ নদে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের ৭ নেতাকর্মীর মরদেহ ভাসছে—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব। তবে পুলিশ সদরদপ্তর ৭ নেতাকর্মী নিঁখোজের তথ্য গুজব বলে জানালেও আশুলিয়া ও দারুস সালাম থানা পুলিশ ৩ নেতাকর্মীর লাশ পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা সুমনকে শনাক্ত করেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, পরিবার তাদের জানিয়েছে যে সুমন ২২শে জুন বন্ধুদের সাথে পিকনিকে গিয়ে সাঁতার না জানার কারণে ট্রলার থেকে পড়ে ডুবে যান।