প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর কভার করতে গিয়ে ৮ বাংলাদেশি সাংবাদিক আটক, মুচলেকায় ছাড়ালো দূতাবাস
তারেক রহমান–এর চীন সফর কভার করতে গিয়ে বেইজিংয়ে ৮ বাংলাদেশি সাংবাদিক স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন। চীনের স্থানীয় আইন ও জনপরিসরে সম্প্রচারসংক্রান্ত বিধিনিষেধ লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের আটক করা হয়। পরে বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস–এর কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর কভার করতে শতাধিক বাংলাদেশি সাংবাদিক বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন। সফরের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন এবং সফরসঙ্গী প্রতিনিধিদলের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার ও সংবাদ সংগ্রহে তারা কাজ করছেন। এদের মধ্যে টেলিভিশন সাংবাদিকদের একটি দল গত ২৩শে জুন বেইজিংয়ের একটি ব্যস্ত সড়কে লাইভ সম্প্রচারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিপাকে পড়ে। সূত্র জানায়, ৮ সাংবাদিকের ওই দলটি নির্ধারিত মিডিয়া জোনের বাইরে একটি উন্মুক্ত সড়কে ক্যামেরা সেটআপ করে লাইভে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চীনে অনেক জনপরিসরে সম্প্রচার, চিত্রধারণ কিংবা সরাসরি সম্প্রচারের জন্য পূর্বানুমতি প্রয়োজন হয়। স্থানীয় আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কিছু এলাকায় ভিডিও সম্প্রচার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল এই বিধিনিষেধ অমান্য করা। আটক হওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছেন— স্টার নিউজের জাকারিয়া, চ্যানেল ওয়ানের রাহি, একাত্তর টিভির শফিকুল হক, যমুনা টিভির আরেফিন শাকিল এবং ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন–এর জাহানারা পারভীনসহ আরও কয়েকজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আটক হওয়া এক সাংবাদিক বিডি ডাইজেস্ট–কে জানান, প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর তার অবস্থানস্থল হোটেলের সামনে থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল লাইভ সম্প্রচার শুরু করে। এ সময় তারা কয়েকজন সাংবাদিক আলাদা হয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে ফুটেজ সংগ্রহ ও বিকল্প লোকেশন থেকে লাইভ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা বেইজিংয়ের একটি সড়কে দাঁড়িয়ে লাইভের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। তখন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা আমাদের কাছে এসে চীনা ভাষায় কিছু বলতে থাকেন। ভাষা না বোঝায় আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিইনি। আমরা ধারণা করেছিলাম তারা কৌতূহলবশত কথা বলছেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশের একটি গাড়ি এসে পৌঁছায়।” তিনি আরও জানান, পুলিশের সদস্যরা এসে প্রথমে তাদের কাগজপত্র ও পরিচয় যাচাই করেন। পরে লাইভ সেটআপ বন্ধ করতে বলেন। সাংবাদিকদের কেউ কেউ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ে। একপর্যায়ে লাইভ প্রস্তুতিতে সক্রিয় তিনজন সাংবাদিককে পিঠমোড়া দিয়ে বেঁধে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয় এবং বাকিদেরও গাড়িতে তোলা হয়। আটক সাংবাদিকদের স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তাদের পেশাগত পরিচয়, সফরের উদ্দেশ্য, মিডিয়া অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই করা হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের দূতাবাস দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। দূতাবাসের কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে সাংবাদিকদের পরিচয় নিশ্চিত করেন এবং ভবিষ্যতে স্থানীয় আইন মেনে চলার অঙ্গীকারনামা (মুচলেকা) জমা দেন। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ঘটনাটি বড় ধরনের আইনি জটিলতায় না গড়ালেও এটি সফরসঙ্গী গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিদেশে সরকারি সফর কাভারের সময় স্থানীয় আইন, গণমাধ্যম নীতিমালা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা সম্পর্কে আরও সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের জন্য আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশের মিডিয়া আইন, নিষিদ্ধ এলাকা এবং সম্প্রচারবিধি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্রিফিং থাকা জরুরি। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক সফরে শুধু সংবাদ সংগ্রহ করাই নয়, স্বাগতিক দেশের আইন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোও পেশাগত দায়িত্বের অংশ। অন্যথায় ছোটখাটো অসতর্কতাও বড় কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
