চট্টগ্রামে চলমান কোরিয়ান প্রকল্প শিখতে ওয়াসার কর্মকর্তাদের চীনে বিলাসী সফর!

২৬ জুন, ২০২৬ | ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

চট্টগ্রাম নগরের লাখ লাখ বাসিন্দা যখন এক ফোঁটা সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছেন, তখন ‘পানির ব্যবহার ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা’র জ্ঞান অর্জন করতে চীন সফরে গেছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। শেখ হাসিনার সরকারের সময় গৃহীত ৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকার যে মেগা স্যুয়ারেজ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন, তার মূল কাজ করছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অথচ কোরিয়ান প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিতে কর্মকর্তারা উড়াল দিয়েছেন চীনে! আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই সফরে স্যুয়ারেজ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো প্রকৌশলীকেই রাখা হয়নি। ওয়াসার ভেতরের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই ১৪ দিনের সফরকে স্রেফ সরকারি কর্মকর্তাদের ‘বিলাস ভ্রমণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চলতি বছরের ৭ই মে ও সংশোধিত ৯ই মে’র অফিস আদেশ অনুযায়ী, গত ১১ই জুন থেকে ২৪শে জুন পর্যন্ত চীনের ফুজয়ান প্রদেশের ফুজু সিটিতে ‘সেমিনার অন আরবান ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যানিটেশন সিস্টেম টেকনোলোজি ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রশিক্ষণে অংশ নেন চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম এবং কর্ণফুলী পানি শোধনাগার প্রকল্প-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম রবিউল হোসেন। চীন সরকারের সহায়তায় আয়োজিত এই সফরে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সম্পৃক্ততা না থাকলেও, ট্রানজিটসহ পুরো সময়টিকে ‘অন ডিউটি’ বা দায়িত্ব পালন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোরিয়ান কোম্পানি ‘তায়ং ইঞ্জিনিয়ারিং’ যে প্রকল্পের কাজ করছে, তার গভীর ও অগভীর পাইপলাইন স্থাপন এবং ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করতে কেন চীন সফরে যেতে হলো? এবং কেনই বা মূল স্যুয়ারেজ প্রকৌশলীদের ডেস্কে বসিয়ে রেখে পানি শোধনাগারের প্রকৌশলীদের পাঠানো হলো? বর্তমানে হালিশহরের পয়োঃশোধনাগার ও ফিক্যাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ চলমান রয়েছে, যার সামগ্রিক অগ্রগতি মাত্র ৬৯ শতাংশ। এখনো প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি থাকা অবস্থায় শীর্ষ কর্মকর্তাদের এমন অনুপস্থিতি প্রকল্পের গতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ বিষয়ে জানতে কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা যখন চীনের ফুজু সিটিতে স্যানিটেশন প্রযুক্তি দেখছেন, তখন চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলীর সরাইপাড়া, হালিশহরসহ বিস্তর এলাকায় চলছে পানির তীব্র সংকট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে সপ্তাহে দুই-তিন দিন পানি পাওয়া গেলেও এখন অনেক এলাকায় টানা আট দিন ধরে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। ওয়াসার নিজস্ব তথ্য মতেই, চট্টগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ১১ কোটি লিটার সুপেয় পানির ঘাটতি রয়েছে। গ্রীষ্মের এই খরতাপে যেখানে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ কোটি লিটার থাকার কথা, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪৫ থেকে ৪৬ কোটি লিটার। চট্টগ্রাম ওয়াসার নবনিযুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানে আলম এই বিতর্কের দায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, “আমি দায়িত্ব গ্রহণ করার অনেক আগেই এই প্রশিক্ষণের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছিল। ফলে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই সফর বাতিল করার আইনি বা প্রশাসনিক সুযোগ আমার হাতে ছিল না।” নগরবাসীর একাংশের মতে, একদিকে সুপেয় পানির তীব্র সংকট, অন্যদিকে মেগা প্রকল্পের নামে এমন সমন্বয়হীন বিদেশ ভ্রমণ আদতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে এক ধরনের তামাশা।