মুখ ফিরিয়ে নিলো বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগীরা! ঋণ প্রতিশ্রুতিতে সায় মেলেনি, উল্টো বাড়ছে পরিশোধের চাপ
বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়ন প্রবাহে উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) কোনো নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাপান, ভারত, রাশিয়া এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি)—এই চার গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার নতুন কোনো ঋণ অনুমোদন বা প্রতিশ্রুতি দেয়নি। যদিও এসব দেশ ও সংস্থা পূর্বে অনুমোদিত প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ ছাড় অব্যাহত রেখেছে, তবুও নতুন প্রতিশ্রুতির অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি না থাকা শুধু অর্থপ্রবাহের সংকেত নয়; বরং এটি উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা, প্রকল্প প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের অবস্থান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ভারতের ঋণ সহায়তায় কার্যত স্থবিরতা ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। সেই ধারাবাহিকতা চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় এক্সিম ব্যাংকের তিনটি লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ মোট ৭৩৬ কোটি ডলার পাওয়ার কথা থাকলেও অর্থ ছাড়ের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-মে সময়ে ভারত মাত্র ২৫ কোটি ডলার ছাড় করেছে। অতীতে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি না থাকা দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার গতি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করছে। রূপপুরে অর্থ ছাড়, কিন্তু নতুন উদ্যোগে আগ্রহ নেই রাশিয়ার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর একটি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অর্থায়ন করছে রাশিয়া। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশটি নতুন কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশও নতুন কোনো প্রকল্পের জন্য রাশিয়ার কাছে অর্থায়নের প্রস্তাব পাঠায়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা রূপপুর প্রকল্পেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যদিও একই সময়ে রাশিয়া পুরোনো প্রতিশ্রুতির আওতায় ৯৩ কোটি ডলার ছাড় করেছে, নতুন বিনিয়োগ বা অর্থায়ন কাঠামোর অনুপস্থিতি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিস্তার নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। ঐতিহ্যগত উন্নয়ন অংশীদার জাপানেরও নতুন প্রতিশ্রুতি নেই দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পরিচিত জাপানও চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে কোনো নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকলেও তা এখনো প্রতিশ্রুতিতে রূপ নেয়নি। জুলাই-মে সময়ে জাপান পূর্ববর্তী ঋণ চুক্তির আওতায় ৪৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ছাড় করেছে। তবে নতুন প্রতিশ্রুতির অভাব ভবিষ্যৎ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। এআইআইবির নীরবতা, কনসোর্টিয়াম ঋণের অপেক্ষা এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকেও গত ১১ মাসে কোনো নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। যদিও সংস্থাটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বা কনসোর্টিয়াম ঋণ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে সম্ভাব্য অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তব প্রতিশ্রুতির খাতায় নতুন কোনো সংখ্যা যোগ হয়নি। সাত বড় দাতার মধ্যে চারজনের অনুপস্থিতি বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ঋণ সহায়তা প্রদানকারী সাতটি প্রধান দেশ ও সংস্থার মধ্যে চারটিই গত ১১ মাসে নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। কেবল বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং চীন থেকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতির ওপর। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে বাংলাদেশ মোট ৪২২ কোটি ডলারের নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৫৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতি কমেছে প্রায় ১২৮ কোটি ডলার বা প্রায় ২৩ শতাংশ। এই পতন বৈদেশিক উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক প্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন ঋণ কমছে, বাড়ছে পুরোনো ঋণ শোধের চাপ বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো ঋণ পরিশোধের দ্রুত বৃদ্ধি। ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বাংলাদেশকে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার কাছে মোট ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধের নতুন রেকর্ড। একই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে দেশে এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ বৈদেশিক অর্থপ্রবাহ ও ঋণ পরিশোধের ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়া এবং বিপরীতে ঋণ পরিশোধের দায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে বৈদেশিক অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যৎ কোন দিকে? ইআরডির সর্বশেষ তথ্য বলছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের অন্যতম প্রধান চার অংশীদার—জাপান, ভারত, রাশিয়া ও এআইআইবি—চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে নতুন কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতি দেয়নি। একই সময়ে মোট বৈদেশিক ঋণ প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, আর বিদেশি ঋণ পরিশোধ পৌঁছেছে রেকর্ড উচ্চতায়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বৈদেশিক অর্থায়নের ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
