কোনো মামলা ছাড়াই রাতে তুলে নিয়ে গেল ডিবি, ৫ ঘণ্টা পর মিলল ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা থেকে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে আটকের প্রায় ৫ ঘণ্টা পর ইশতিয়াক আহম্মেদ প্রান্ত (২৮) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত প্রান্ত মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত এস্কেন্দার হায়দারের ছেলে। তিনি ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। ২০শে জুন, শনিবার গভীর রাতে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা প্রান্ত মির্জাকে তার নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে অজ্ঞাত মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আজ ২১শে জুন, রোববার সকালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। স্বজনরা জানান, আটকের সময় প্রান্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। পরে পুলিশি নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, প্রান্ত ‘হঠাৎ’ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসানের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া এভাবে সুস্থ একজন মানুষকে গ্রেপ্তার এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পুলিশ হেফাজতে তার মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। নিহতের চাচা ও সাবেক কাউন্সিলর মির্জা আবু জাফর বলেন, কাল গভীর রাতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাদের বাড়ি থেকে প্রান্তকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে আজ সকালে তারা জানতে পারেন, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে ছুটে যান। পরিবারের দাবি, আটকের আগে প্রান্তের কোনো শারীরিক অসুস্থতা ছিল না। প্রান্তের পরিবার ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, গতকাল রাতে ডিবি পুলিশ আকস্মিকভাবে প্রান্তর বাসায় হানা দেয়। পরিবারের সদস্যরা গ্রেপ্তারের কারণ এবং কোনো মামলা আছে কি না জানতে চাইলে পুলিশ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। সকালে ফরিদপুর মেডিকেলে প্রান্তর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালে এবং মধুখালীতে শত শত ক্ষুব্ধ মানুষ জড়ো হন। এক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ”কোনো মামলা নেই, কোনো অভিযোগ নেই। একটা সুস্থ মানুষকে রাতে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল ডিবি। আর সকালে আমাদের দেখতে হলো তার লাশ! এই অত্যাচার আর অবিচারের শেষ কোথায়? পুলিশ কি এখন যাকে-তাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলার লাইসেন্স পেয়ে গেছে?” কোনো মামলা ছাড়া কেন তাকে মাঝরাতে গ্রেপ্তার করা হলো এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একজন সুস্থ মানুষের কীভাবে মৃত্যু হলো—তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, রাত ২টার দিকে গোন্দারদিয়া এলাকায় প্রান্তের বাড়ির উত্তর পাশে একটি ফাঁকা স্থানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় প্রান্তর কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে গ্রেপ্তার করা হয় বলে দাবি পুলিশের। পুলিশ জানায়, পরে তাকে ফরিদপুরে এনে আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য জেলা গোয়েন্দা শাখার হাজতে রাখা হয়। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তবে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রান্তর রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতে বর্বর নির্যাতনের কারণেই প্রান্তর মৃত্যু হয়েছে। তারা একে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করছেন এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার জোর দাবি তুলেছেন। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মাহমুদুল হাসান দাবি করেন, মধুখালী এলাকা থেকে গাঁজাসহ আটক এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি মারা যান। তিনি বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, মাদকসহ আটকের পর ওই ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। পুলিশ সুপার দাবি করেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা ব্রেন স্ট্রোকের কারণে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পুলিশের পক্ষ থেকে তার ওপর কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। এই ঘটনার পর থেকে মধুখালী উপজেলা ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্বজনরা গাঁজা উদ্ধার প্রসঙ্গে পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে একে ‘সাজানো নাটক’ আখ্যায়িত করে বলেন, আটকের সময় প্রান্ত সুস্থ ছিলেন। হেফাজতে নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হওয়ায় ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সাধারণ জনগণের মাঝে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতা অনতিবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী ডিবি কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
