পাঁচতারকা বারে মদ্যপান শেষে এনসিপির পদপ্রত্যাশী নারী নেত্রীকে কেন্দ্রীয় নেতার যৌন হয়রানি

২০ জুন, ২০২৬ | ৯:১১ পূর্বাহ্ণ
ডেস্ক নিউজ , দৈনিক গণঅধিকার

যৌন হয়রানির কাজে কেন্দ্রীয় নেতাকে সহযোগিতা করেন আরেক নারী নেত্রী রাজনীতিতে পদ-পদবি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন, পাঁচ তারকা হোটেলের মদের বারে ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব এবং পরবর্তীতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো এক গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিনের বিরুদ্ধে। একই সাথে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার তীর উঠেছে দলটির চট্টগ্রাম মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিনের দিকেও। আজ ১৯শে জুন, শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ির একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী ওই তরুণী নিজেই এই বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন। জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী পরিচয় দিয়ে এবং এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর ‘নারীশক্তি’র পদপ্রত্যাশী দাবি করে ওই তরুণী রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান এই নোংরা সংস্কৃতির পর্দা উন্মোচন করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, তরুণী চট্টগ্রাম নগরীর ডবলমুরিং থানার সিডিএ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রামে এনসিপির সক্রিয় কর্মী। সুজা উদ্দীন বান্দরবান থেকে পার্বত্য আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন। সাদিয়া আফরিন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে এনসিপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ওই তরুণী জানান, গত ১৪ই জুন দলটির সাংগঠনিক ও ‘নারীশক্তি’র কমিটি নিয়ে আলোচনার কথা বলে তাকে নগরীর অভিজাত পেনিনসুলা হোটেলে ডেকে নেন এনসিপির মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিন। এনসিপি নেত্রী সাদিয়া আফরিন তবে সেখানে যাওয়ার পর তরুণী আবিষ্কার করেন, বৈঠকের জায়গাটি কোনো সাধারণ কক্ষ নয়, বরং হোটেলের রুফটপ বার। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন। সুজাকে এ সময় মদ্যপ মনে হয়েছে। আমাকে ড্রিংকস অফার করা হয়েছে। কী ড্রিংকস আমি নেব, সেটা জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তরুণীর অভিযোগ, সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধূমপান ও মদ্যপানে উৎসাহিত করা হয়, যা তাকে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ফেলে। তরুণীর ভাষ্যমতে, তিনি এই পরিবেশ নিয়ে আপত্তি জানালে মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিন তাকে ধমক না দিয়ে উল্টো পরিস্থিতির সঙ্গে “মানিয়ে নেওয়ার” পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যে সাদিয়া চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে উঠে যান। এরপর সুজা কয়েকবার আমাকে তার পাশে গিয়ে বসার জন্য বলেছেন। তার তাকানো এবং অঙ্গভঙ্গি ছিল যথেষ্ট আপত্তিকর, অশালীন ও যৌন হয়রানিমূলক। অভিযোগ, সুজা উদ্দিন ওই তরুণীর প্রতি চরম আপত্তিকর আচরণ, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য এবং কুপ্রস্তাব দেন। অস্বস্তির মধ্যে তরুণী সেখান থেকে উঠে যান বলে জানান। তিনি বলেন, আমি যখন প্রস্তাবে সাড়া দেইনি, তখন সুজা আমাকে বলেন— ডিল অর ডেথ। রাজনৈতিক সুবিধা, পদ-পদবি এবং আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার কথা বলে আমাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। ভীতিকর এই অভিজ্ঞতার পর তরুণী বিষয়টি নিয়ে পুনরায় সাদিয়ার সাথে যোগাযোগ করলে সাদিয়ার উত্তর ছিল আরও ভয়াবহ। সাদিয়া তাকে বলেন, “রাজনীতিতে যদি টিকে থাকতে চাও এবং এগিয়ে যেতে চাও, তবে প্রভাবশালী নেতাদের এভাবে ব্যক্তিগত সময় দিতেই হবে।” প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় পরবর্তীতে ওই তরুণীকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলেও তিনি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন। তিনি জানান, ঘটনার প্রতিবাদ জানালে অভিযুক্তরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকিসহ বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখান। ঘটনার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে ভুক্তভোগী থানায় জিডির আবেদন করেন গত ১৭ই জুন, বুধবার। নগরীর চকবাজার থানায় আবু সাঈদ মোহাম্মদ সুজা উদ্দিন ও সাদিয়া আফরিনের নাম উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী। এ বিষয়ে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “অভিযোগের প্রেক্ষিতে একটি জিডি নথিভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছে।” এ বিষয়ে পেনিনসুলা হোটেলের ব্যবস্থাপক (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) কামাল হোসেন জানান, হোটেলের ১৫ তলায় রুফটপটি বার হিসেবে ব্যবহার হয়। তবে সেখানে এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘটিত কোনো ঘটনার বিষয়ে তিনি জানেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশ বারে গিয়ে ঘটনার তদন্ত করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করেছে। আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জানতে ফোনে কল দিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় সুজা উদ্দীন ও সাদিয়া আফরিনের সঙ্গে। তারা কল রিসিভ না করায় হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তা দেখেও তারা কোনো জবাব দেননি। পরে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ইতোমধ্যে ঘটনাটি নিয়ে দলের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।