টেলিটক ও নগদ ‘কিনতে’ চায় বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন!
এ সিদ্ধান্তে তারা এতটা দৃঢ় যে, বছরের পর বছর গেলেও হাল ছাড়েনি তারা। এজন্য নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নানা স্তরে ক্রমাগত দেনদরবার করে চলেছে কোম্পানিটি।নগদ কিনতে তারা ১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং ২০২৪ সালের জুনে এ বিষয়ে এমওইউও হয়েছিল দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে (এই তথ্য নগদের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, আবার বাংলালিংক কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেনি)। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সঙ্গে পার্টনারশিপ বা মার্জার করতে চায় ভিওন। চায় বিটিসিএলের সঙ্গেও অংশীদারিত্ব। সর্বশেষ নতুন সরকারের টেলিকম খাতে বিনিয়োগবান্ধব সংস্কারের উদ্যোগের ঘোষণার সঙ্গে এসব উদ্যোগে গতি বাড়িয়েছে ভিওন।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সম্প্রতি বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার সারাংশ উল্লেখ করে চিঠি দিয়েছে ভিওন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করে তারা প্রস্তাবগুলো দিতে চায়।এরমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গে আলোচনাও করেছে তারা। আলোচনার আগে তাঁর কাছে দেয়া চিঠিতে বাংলালিংক একইভাবে বাংলাদেশে এসব বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গেও এই বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করেছে অপারেটরটি। বাংলালিংক-ভিওন প্রতিনিধিরা বিডার চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে ভিওন উল্লেখ করেছে, সরকার যখন দেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলোর ভবিষ্যত নিয়ে মূল্যায়ন করছে, তখন জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নেওয়ার সুযোগকে স্বাগত জানায় ভিওন। প্রতিষ্ঠানটি লিখেছে, এ ধরনের সহযোগিতার আওতায় রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় এবং বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কাছ থেকে ‘নগদ’ অধিগ্রহণের মতো সম্ভাবনাও আলোচনায় থাকতে পারে।ভিওন সেখানে উল্লেখ করে, তাদের ডিজিটাল-ফার্স্ট পরিচালন মডেল, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং শক্তিশালী মূলধনভিত্তি বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবার মানোন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণ এবং খাতটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে সহায়ক হতে পারে। চিঠিতে তারা শুরুতে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা জানিয়েছে। বাংলালিংকের সিইও ইওহান বুসে টেকশহর ডটকমকে জানান, ’আমরা এখনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিইনি তবে কানেক্টিভিটি ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে আমাদের আগ্রহ রয়েছে। আমাদের প্যারেন্ট কোম্পানি ভিওন এবং বাংলালিংক বাংলাদেশে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং দেশের ডিজিটাল রূপান্তর যাত্রাকে সহায়তা করতে পারে, এমন কৌশলগত বিনিয়োগের সুযোগের জন্য উন্মুক্ত।‘‘গত ২১ বছরে আমরা যে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছি, তার ধারাবাহিকতায় একটি অনুকূল নিয়ন্ত্রক পরিবেশ থাকলে স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এফডিআই বিনিয়োগ করতে আমরা আগ্রহী।” উল্লেখ করেন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভিওনের লেখা চিঠিতে নগদ অধিগ্রহণের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া রেহান আসিফ আসাদের কাছে বাংলালিংকের দেয়া চিঠিতে বাংলালিংক সিইও নগদে ভিওনের অংশীদারিত্ব বা বড় অংকের বিনিয়োগের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স রয়েছে। বাংলালিংক-ভিওন ডিজিটাল ব্যাংকসহই নগদের বিষয়ে আগ্রহী। যদিও বাংলালিংক ‘নোভা’ নামে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে রেখেছে স্কয়ারের সঙ্গে মিলে। ফিনটেকসহ দীর্ঘ সময় ধরে টেলিযোগাযোগ খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) সংকটের মধ্যে বাংলালিংক-ভিওনের এই আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, ‘আইসিটি এবং টেলিকম সেক্টর একটি থ্রাস্ট সেক্টর। ফান্ডামেন্টালি আমরা তা বিশ্বাস করি এবং আগামী পাঁচ বছরে আমরা এই সেক্টরের সত্যিকারের কন্ট্রিবিউশন দেখতে পাব। গত কয়েকমাসে এই সেক্টর নিয়ে কাজ করে এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমি দেখেছি, এই সেক্টরের কন্ট্রিবিউশন ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। হ্যাঁ, সেখানে চ্যালেঞ্জ আছে, পলিসি ডিসকাশন আছে এবং একটি সাপোর্টিভ ইকোসিস্টেম ডেভেলপ করার প্রয়োজন আছে, কিন্তু এই সেক্টর থেকে জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান আসার কোনো কারণ নেই। ’নগদ নিয়ে বাংলালিংক চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ভিওনের অংশীদারিত্ব বা বড় অংকের বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে উন্নত বৈশ্বিক প্রযুক্তি, বিশ্বমানের ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এবং টেলিকম সেবার সাথে আর্থিক সেবার এক গভীর ইন্টিগ্রেশন ঘটবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারের বিদ্যমান নীতিমালার সামঞ্জস্যতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার (রেগুলেটরি) অনুমোদনের সাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে।ভিওন ২০২৪ সালে নগদের সঙ্গে যে আলোচনা শুরু কথা স্বীকার করেছেন নগদের সাবেক এমডি তানভীর এ মিশুক। তিনি টেকশহর ডটকমকে নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘ওই আলোচনা অনেকটা এগিয়ে গেলেও পরিবর্তীত পরিস্থিতির কারণে আলোচনা তখন আর পরিনতি পায়নি। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা করছি। ’তানভীর এ মিশুক সরাসরি কারও নাম না বললেও ইঙ্গিত দেন যে, বাংলালিংকের মূল কোম্পানি ভিওন ছাড়াও আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ফিনটেক প্রতিষ্ঠান নগদে বিনিয়োগ বিষয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। নগদ পরিচালনায় যুক্তরা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে চলে যায়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই বছরই ২১ আগস্ট প্রশাসক নিয়োগ দেয় প্রতিষ্ঠানটিতে। নানা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও নগদের বিশাল গ্রাহকভিত্তি রয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় গ্রাহক রয়েছে ৪ কোটি। যেখানে গড়ে দৈনিক লেনদেন দেড় হাজার কোটি টাকা।
