বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমল
মধ্যপ্রাচ্যে নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। টানা তিন দিনের ঊর্ধ্বগতির পর এ দরপতন দেখা যায়। খবর রয়টার্স। বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ সময় ১২টা ৩০ মিনিটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১০৬ দশমিক ৩০ ডলারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১০০ দশমিক ৭৭ ডলারে নেমে আসে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে এবং তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশিরভাগ সময়ই ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের আশপাশে বা তার ওপরে অবস্থান করছে। ফিলিপ নোভার জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেভা বলেন, ‘সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে অনিশ্চয়তা তেলের দামকে সমর্থন দিচ্ছে। তবে বাজার এখনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা খুঁজে পাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অঞ্চলটির প্রতিটি নতুন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। ফলে তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কোনো হুমকি বা উত্তেজনা দেখা দিলে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—দুই ক্ষেত্রেই আবার শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ধারা ফিরে আসতে পারে।’ মঙ্গলবার তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ায় এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়ার আশা কমে যাওয়ায় বাজারে উদ্বেগ বেড়ে যায়। বিশ্বে মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেন, ইরান যুদ্ধ বন্ধে চীনের সহায়তার প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন না। যদিও স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপ সত্ত্বেও চীন এখনো ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এ অবস্থায় ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপ এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘সরবরাহ বিঘ্নের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং ইতোমধ্যে ১ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল সরবরাহ ঘাটতির কারণে চলতি বছরের বাকি সময়জুড়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের ওপরে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।’ ইরান যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জ্বালানির দাম বাড়ায় ভোক্তা ব্যয়ও বেড়েছে। এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ভোক্তা মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ অবস্থায় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও কিছু সময় অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে বাজারে প্রত্যাশা জোরদার হয়েছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকস এক নোটে জানিয়েছে, উন্নত অর্থনীতিগুলোতে মূল্যস্ফীতির তীব্র বৃদ্ধি এখনো সরাসরি ভোগ ব্যয়ে বড় ধস নামায়নি। তবে ভোক্তাদের আস্থা ও নিয়োগ প্রবণতার ব্যাপক পতন ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। উচ্চ সুদের হার ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত তেলের চাহিদায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই গত সপ্তাহে টানা চতুর্থবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত কমেছে। পাশাপাশি ডিজেল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির মজুতও হ্রাস পেয়েছে বলে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের তথ্যের বরাতে জানিয়েছে বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
