রাজধানীর ৪০ ভাগ খুনের নেপথ্যেই রাজনীতি
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের তেজতুরী বাজারে স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। আঁতকে ওঠেন এলাকাবাসী। মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবকের ছোড়া গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বির। গত ৭ জানুয়ারি রাত সোয়া ৮টার ঘটনা এটি। রাজনৈতিক কোন্দলে ওই হামলা বলে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এর আগে গত বছরের ২৫ মে রাতে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় চায়ের দোকানে বসে ছিলেন বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধন। ওই সময় হঠাৎ মুখে মাস্ক পরা দুজন এসে তাকে লক্ষ করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। এই ঘটনার নেপথ্যেও ছিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়; রাজধানীতে একের পর এক ঘটছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। আধিপত্য বিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির জেরে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার চরম পথ বেছে নিচ্ছে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, গত ১৫ মাসে রাজধানীতে সংঘটিত ৪৭৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ১৯৩টি বা প্রায় ৪০ শতাংশেরই নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক কারণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ডিএমপির ওয়ারী, গুলশান ও উত্তরা বিভাগে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক এই অস্থিরতার পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় ভূমিকা পালন করে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি বা এলাকার প্রভাব ধরে রাখার লড়াইয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। তবে এই পুরো পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে নেতিবাচক ভূমিকা রাখে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়, তখন তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিরতা এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই একটি বড় কারণ। অনেক সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে গিয়েও এ ধরনের সংঘাত হচ্ছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী পরিস্থিতি ঘোলাটে করার জন্য বা নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ঘটায়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক সময় কোনো হত্যাকাণ্ডের সঠিক কূলকিনারা করতে না পারলে পুলিশ সেটিকে ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ হিসাবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে করে পুলিশের ওপর থেকে চাপ কমে যায়। যখন কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়, তখন জনমনে ওই মামলা নিয়ে আগ্রহ কমে যায়। সাধারণ মানুষ মনে করে এটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, তাই তারা আর সেভাবে উচ্চবাচ্য করে না। এর ফলে পুলিশের ওপর দায়বদ্ধতার চাপ কমে যায়। তিনি আরও বলেন, সাগর-রুনী হত্যা মামলার মতো অনেক বড় মামলার তদন্তে যে ধীরগতি, তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই ইঙ্গিত করে। মূলত তদন্তের জটিলতা এড়াতে বা মামলাকে ‘হালকা’ করতে এই ‘রাজনৈতিক কারণ’ শব্দটি অনেক সময় ঢাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে মোট ৪৭৯টি হত্যাকাণ্ড হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটে ওয়ারী বিভাগে ১১০টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিরপুর বিভাগ, এখানে ৮০টি হত্যা হয়। এছাড়া তেজগাঁও বিভাগে ৬১টি, গুলশান বিভাগে ৫৬টি, উত্তরা বিভাগে ৫৪টি, মতিঝিলে ৪৮টি, লালবাগে ৪২টি ও রমনায় ২৮টি হত্যা হয়। আর মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে, গত পনেরো মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটেছে গত বছরের জুলাইয়ে ৭৫টি। একই বছরের জুনে হয় ৪৯টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩৮টি। এদিকে মোট ৪৭৯ হত্যার মধ্যে শুধু রাজনৈতিক কারণেই ১৯৩টি হত্যাকাণ্ড, যা শতকরা হিসাবে ৪০.২৯। রাজনৈতিক কারণে সবচেয়ে বেশি হত্যা হয় ওয়ারী বিভাগে ৫৮টি। শতকরা হিসাবে মোট রাজনৈতিক হত্যার ৩০ ভাগই ওয়ারীতে। এরপরই রয়েছে গুলশান বিভাগের অবস্থান। এ বিভাগে ২৮টি রাজনৈতিক হত্যা হয়েছে, যা মোট রাজনৈতিক হত্যার ১৫ ভাগ। এছাড়া উত্তরা বিভাগে ২৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এসএন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, কোনো হত্যাকাণ্ডই কাম্য নয়। রাজনৈতিক কারণে যদি কোনো হত্যা হয় সেক্ষেত্রে ড্রাস্টিক অ্যাকশন (কঠোর পদক্ষেপ) নিতে হবে। এ ধরনের হত্যা ঠেকাতে রাজনৈতিক ব্যক্তি, সোশ্যাল লিডার, বিভিন্ন ধর্মীয় বক্তা-সবারই অবদান রাখতে হবে। পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ক্রিমিনোলজিতে অপরাধ দমনের একটি উপায় হলো প্রিভেন্টিভ মেজার (প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা)। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আগাম তথ্য না থাকলে এই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ খুব কম থাকে। তবে কেউ যদি জিডি করে বা কোনো বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করে, তবে পুলিশ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, অপরাধ ঘটার পর দ্রুত আসামিদের গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত যদি নিখুঁত হয় এবং অপরাধীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পায়, তবে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসাবে কাজ করবে। এলাকায় পুলিশের দৃশ্যমানতা ও টহল বাড়াতে হবে। বিট পুলিশিং ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। কেউ কোনো অভিযোগ করলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক হত্যা কমাতে রাজনৈতিক দলগুলোর করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একটি শক্তিশালী মনিটরিং সিস্টেম থাকা উচিত। শুধু মুখে নির্দেশনা দিলেই হবে না, দলের অভ্যন্তরে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকতে হবে।
