নেভেনি আশার আলো, চলবে বই উৎসব

5 April 2021, 8:25 AM
বাংলাদেশ

অদ্ভুত এক বাস্তবতা। এমন বাস্তবতা কখনও পাড়ি দেয়নি অমর একুশে বইমেলা। মহামারীকে সঙ্গী করেই শনিবার পর্যন্ত চলেছে প্রাণের মেলা। এদিন বইমেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা জেগেছিল। তবে রবিবার কেটে গেছে সেই শঙ্কার ছায়া। এদিন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে মেলা চলমান রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেই সুবাদে আজ সোমবার থেকে সারাদেশে লকডাউনের অবরুদ্ধ সময়েও থামছে না বইয়ের উৎসব। করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জকে পাশকাটিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এগিয়ে যাবে দেশের সবচেয়ে বড় এই সাংস্কৃতিক উৎসব। তবে লকডাউন পরিস্থিতিতে পরিবর্তিত হয়েছে মেলার সময়সূচী। আজ সোমবার থেকে বেলা ১২টায় খুলে যাবে মেলার দুয়ার। বিকেল পাঁচটায় বন্ধ হবে দরজা। মেলা চালু রাখার এই সিদ্ধান্তে প্রাথমিকভাবে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। রবিবার বিকেলে মেলার এক ক্যানভাস সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদের সঙ্গে। মেলা সচল রাখার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এই প্রকাশক বলেন, বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এবার মেলায় তেমনভাবে পাঠক বা দর্শক আসেনি। এমন প্রেক্ষাপটে মেলাটি বন্ধ হয়ে গেলে প্রকাশকদের লোকসানের পরিমাণটা আরো বৃদ্ধি পেত। তাই মেলা সচল রাখায় আশার আলোটি একেবারে নিভে গেল না। হাতে আরও দশটি দিন পাওয়া গেল। এমন হতে পারে আগামী দিনগুলোতে তেমনভাবে পাঠক সমাগম নাও হতে পারে। কিন্তু সে কথা তো আগেই বলা যাচ্ছে না। আপাতত চালু আছে-এটাই বড় কথা। তবে মেলার নতুন সময়সূচী নিয়ে মেলার আয়োজক বাংলা একাডেমি এবারও আমাদের সঙ্গে কোন আলোচনা করেনি। তাহলে হয়তো মেলা চালু রাখার সময়সূচী নিয়েও একটা ভাল সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। তারপরও সব মিলিয়ে আমরা আশাবাদী। এদিন বিকেলে মেলা মাঠে কথা হয় তরুণ লেখক স্বকৃত নোমানের সঙ্গে। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, বইমেলা বন্ধ না হয়ে চালু থাকায় এক ধরনের স্বস্তিবোধ করছি। তাছাড়া নিউ নরমাল লাইফে করোনাকে সঙ্গী করেই আমাদের বসবাস করতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে লেখক হিসেবে প্রতিদিনই মেলায় আসছি। কম-বেশি পাঠকের সঙ্গে সংযোগ ঘটছে। এতে নিজের ভেতর একটা ভাললাগা কাজ করে। নতুন করে লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাই। এর বাইরে লকডাউনের মাঝেও যখন মেলা থাকবে কিছু মানুষ ঠিকই হাজির হবে এই উৎসব আঙ্গিনায়। ঘোরাঘুরির পরিবর্তে তারা আসবে সদস্য নতুন কিংবা আগে পড়া হয়নি এমন বইয়ের খোঁজে। ফাঁকা পরিসরে স্বাচ্ছন্দ্যে দেখে-শুনে সংগ্রহ করবে আপন মননের উপযোগী বইটি। সংখ্যায় অল্প হলেও এই গ্রন্থানুরাগীরা শামিল হবে ১৫ লাখ বর্গফুটের বিশাল প্রান্তরের বইয়ের উৎসবে। বন্ধের পরিবর্তে মেলা চালু রাখার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তালিপি প্রকাশনীর প্রকাশক তারিকুল ইসলাম রনি। কথোপকথনে এই প্রকাশক বলেন, সোমবার থেকে মেলাটি বন্ধ হয়ে গেলে প্রকাশকদের বিপদের সীমা থাকতো না। কারণ, এই লকডাউনের মাঝে বিশাল আকৃতির প্যাভিলিয়ন থেকে ছোট-বড় স্টলগুলো সরানো সম্ভব হতো না। পাঁচ শতাধিক স্টলের প্রতিটি কাঠামো খুলে সেগুলোকে সরানো সহজ কাজ নয়। সেই বিবেচনায় লকডাউনেও মেলা চালু থাকায় এই দুশ্চিন্তা থাকছে না। পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতেও অল্প হলেও বই তো বিক্রি হবে। কারণ, এবার কোন প্রকাশনীরই লোকসানের পরিবর্তে মুনাফা উঠি নিয়ে আসার সুযোগ নেই। সেই বিবেচনায় বই বিক্রির সময় বাড়লে কমবে ক্ষতির পরিমাণ। এদিকে লকডাউনের আগের দিন রবিবার সন্ধ্যায় পাঠকের আনাগোনায় সরব ছিল বইমেলা। প্যাভিলিয়ন থেকে কম-বেশি দেখা গেছে বইপ্রেমীদের পদচারণা। এদিন দর্শনার্থীর চেয়ে পাঠকের সংখ্যাই ছিল। হাতে হাতে ঘুরেছে গল্প-উপন্যাস কিংবা কাব্যগ্রন্থে ভরা বইয়ের ব্যাগ। তাসনিম রহমান নামের এক বইপ্রেমী কথা প্রসঙ্গে বলেন, উপচেপড়া ভিড় না থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে বই সংগ্রহের সুযোগ পেলাম। মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও মোশতাক আহমেদের সায়েন্স ফিকশনের বই কিনেছি। এছাড়া তালিকা অনুযায়ী, হরিশংকর জলদাসসহ আরো কিছু লেখকের বই কিনবো। নতুন বই : বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার মেলার ১৮তম দিনে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, রাজনীতি, গবেষণাসহ বিবিধ বিষয়ের নতুন বই এসেছে ৪৮টি। এদিন পর্যন্ত মেলায় নতুন বই এসেছে ২ হাজার ১৬১টি। বরাবরের মতো এবারও প্রকাশনায় এগিয়ে থাকলেও বিক্রিতে পিছিয়ে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ। রবিবার প্রকাশিত বিষয়ভিত্তিক বইয়ের মধ্যে গল্পের বই ১০, উপন্যাস ৮টি, কবিতা ১৬টি, গবেষণা ১টি, ছড়া ২টি, জীবনী ১টি, রচনাবলী ১টি, মুক্তিযুদ্ধ ২টি, ভ্রমণ ১টি, বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ১টি, ধর্মীয় ১টি, সায়েন্সফিকশন ১টি ও অন্যান ৩টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের চারুলিপি থেকে এসেছে সন্্জীদা খাতুনের দুই বই ‘বালক রবির কীর্তিকা-’ এবং ‘কিশোরসমগ্র’। পাঞ্জেরী থেকে এসেছে সঙ্গীতা ইমামের গল্পগ্রন্থ ‘স্বাধীনতা ও আত্মজর গল্প’। সময় থেকে বেরিয়েছে ‘যেটুকু টুনটুনি সেটুকু ছোটাচ্চু’। মিজান পাবলিশার্স এনেছে সুরমা জাহিদের ‘মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শিশুরাজ্য এনেছে দিলীপ কুমার অধিকারীর ‘সূর্যিমামা চাঁদমামা’। কবিতাচর্চা এনেছে অনিমেষ বড়ালের ‘নির্জন প্রান্তরে’। সময় প্রকাশনী এনেছে স ম শামসুল আলমের ‘বহুরূপী দেবশিশু’। অনন্যা এনেছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাব্যগ্রন্থ ‘লোকে বলে এত রাতে রাস্তায় হেঁটে যায় কে’ এবং জাহানারা পারভীনের কাব্যগ্রন্থ ‘সেলাই করা ঠোঁট’। রাইটার্স গিল্ড এনেছে শারমীন সাথীর কাব্যগ্রন্থ ‘একদিন ঠিক দেখা হবে’, ফেরদৌস হাসানের উপন্যাস ‘পা’। চন্দ্রছাপ থেকে বেরিয়েছে আবুল হাশিম সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা ‘৭১ এর রণাঙ্গনে পুরুষ’।


Logo