করোনা ভ্যাকসিন প্রথম কারা পাবেন?

8 January 2021, 10:14 AM
বাংলাদেশ

টানা দুদিনের নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার পর চুক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন পাওয়া এখন নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। ভ্যাকসিন এলে প্রথম কারা পাবেন, কোন প্রক্রিয়াতে প্রয়োগ করা হবে সে বিষয়টি এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে মহামারীর সম্মুখ ভাগে যারা রয়েছেন অর্থাৎ ফ্রন্ট লাইনার তাদের সবার আগে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হবে একই সঙ্গে দেশের ৬০ বছরের উর্ধে যেসব নাগরিক রয়েছেন তাদেরও ভ্যাকসিনের আওতায় আনা হবে। এই প্রক্রিয়াগুলো এক সঙ্গে চালানো হবে। এতে করে সকলভাগে বিভক্ত নাগরিক একই সঙ্গে ভ্যাকসিন পেতে শুরু করবেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্র বলছে সব মিলিয়ে দেশের এসব নাগরিকের জন্য ৪২ লাখ ভ্যাকসিন প্রয়োজন হতে পারে। খসড়া অগ্রাধিকার তালিকাতে ২০ লাখ ৮২ হাজার মানুষকে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে দেশে মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন দুই লাখ ১০ হাজার, পুলিশ বাহিনীর সদস্য দুই লাখ সদস্য প্রথম ধাপে টিকা পাবেন, সরকারী চিকিৎসক, নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন তিন লাখ, বেসরকারী কর্মী রয়েছেন সাত লাখ, স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন এমন দেড় লাখ এনজিও কর্মী রয়েছেন, গণমাধ্যম কর্মী রয়েছেন ৫০ হাজার। জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাঁচ হাজার কর্মকর্তা রয়েছেন তালিকাতে, ক্যান্সার, যক্ষ্মা আর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী ধরা হয়েছে এক লাখ দুই হাজার জন এবং সেনাবাহিনীর তিন লাখ সদস্য ছাড়াও সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধি মিলিয়ে ৭০ হাজার জন রয়েছেন। তবে এই তালিকাটি চূড়ান্ত নয়। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন প্রত্যেককে দুই ডোজ করে নিতে হবে। প্রথম ডোজের চার থেকে ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োজন হবে। যারা ইতোমধ্যে করোনা আক্রান্ত থেকে সেরে ওঠেছেন তারা ভ্যাকসিন পাবেন কিনা অথবা পেলেও ভ্যাকসিন গ্রহণ নিরাপদ হবে কিনা এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। সাধারণভাবে মনে করা হয় করোনা থেকে সেরে ওঠার পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (এন্টিবডি) তৈরি হয়। এই এন্টিবডি থাকা অবস্থাতে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা সঠিক সিদ্ধান্ত কিনা এ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। জানতে চাইলে ভ্যাকসিন সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্য বিএসএমএমইউ-এর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন, ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে কারও এন্টিবডি পরীক্ষা করা হবে না। কারও মধ্যে আগে থেকে এন্টিবডি থাকলে ভ্যাকসিন গ্রহণে তা আরও বৃদ্ধি পাবে, কোন ক্ষতি হবে না। ইতোমধ্যে প্রশ্ন ওঠেছে একবার ভ্যাকসিন নিলে তা কত দিন কার্যকর থাকবে? সুনির্দিষ্টভাবে এখন পর্যন্ত কোন কোম্পানিই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে একবার ভ্যাকসিন নিলে আবার কতদিন পর নিতে হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এখনও কোন কোম্পানিই সুনির্দিষ্ট করে বিষয়টি বলতে পারছে না। কোন কোম্পানি বলছে তিন মাস কার্যকারিতা থাকবে আবার কোন কোম্পানি বলছে ছয় মাস থাকবে। একবার নিলে আর ভ্যাকসিন নেয়া লাগবে না এটি নির্দিষ্ট করে এখনও কেউ বলতে পারেনি। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ফাস্ট জেনারেশন ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে এটা বলা খুব কঠিন। সাধারণত এ ধরনের ভ্যাকসিন আমরা ব্যবহার করি না। কিন্তু মহামারী থেকে বাঁচতে সারা বিশে^র মানুষের সামনে আর কোন বিকল্পও নেই। বাজারে যে ভ্যাকসিনগুলো এসেছে সেগুলো খুব বেশি কার্যকর এমনটি কেউ দাবিও করেনি। ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে যে ধরনের গবেষণা হওয়া প্রয়োজন তা এখনও হয়নি। আমাদের দেশে আমরা সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচীতে যেসব ভ্যাকসিন ব্যবহার করি সেগুলো ১০/১৫ বছর কিংবা তারও বেশি সময় আগে থেকে বাজারে এসেছে। ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে প্রতি বছর গবেষণা হচ্ছে সেগুলোর নানা দিক সংস্কারও করা হচ্ছে। ফলে সেগুলো ফাস্ট জেনারেশন ভ্যাকসিনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং নিরাপদ। সেরাম ইনস্টিটিউট-এর পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠান প্রধান আদর পুনেওয়ালা বলেছেন ভ্যাকসিন রফতানিতে তাদের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। অর্থাৎ চুক্তি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন পাবে সরকার। সরকারের তরফ থেকে মধ্য জানুয়ারিতে ভ্যাকসিন পাওয়ার বিষয়টি আগে নিশ্চিত করা হয়েছিল। তবে সেরামের বিশেষ পরিবেশক বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল বলছে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর যে দিন ভ্যাকসিন অনুমোদন দেবে সেই দিন থেকে এক মাস পর সেরাম ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশে ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দেয় ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর। তাহলে সব বিষয় ঠিক থাকলে ৪ ফেব্রুয়ারি দেশে ভ্যাকসিন আসার কথা। ভারত সেরামের ভ্যাকসিন অনুমোদনের পর তার প্রয়োগ শুরু করেছে। বাংলাদেশে এখন ভ্যাকসিন প্রয়োগের অগ্রাধিকার তালিকা ঠিক করছে। ইতোমধ্যে ভ্যাকসিন সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটি অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর বিষয়টি যাচাই বাছাই করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের নেতৃত্বে একটি কমিটি অগ্রাধিকার তালিকা চূড়ান্ত করছে। প্রাথমিক তালিকার হিসাব অনুযায়ী দেশে ঝুঁকিপূর্ণ বা ফ্রন্ট লাইনারদের যে তালিকা করা হয়েছে তাতে প্রত্যেকের দুই ডোজ করে ৪২ লাখের মতো ভ্যাকসিন প্রয়োজন। সরকার শুরুতেই ৫০ লাখ ভ্যাকসিন আনছে। ফলে এতে ফ্রন্ট লাইনারের সকলে ভ্যাকসিন পাবেন। দেশের ফ্রন্ট লাইনারের সঙ্গে ক্যান্সার, যক্ষ্মা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরাও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে দেশের ১০ ধরনের নাগরিকদের প্রথম তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরা হলেন মুক্তিযোদ্ধা, করোনা মোকাবেলায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, সম্মুখসারির কর্মী, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন জনগোষ্ঠী, বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠী, দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠী, শিক্ষা কর্মী, গণপরিবহন কর্মী। তবে ১৮ বছরের কম বয়সী, গর্ভবতী নারী, বিদেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশীদের টিকা প্রদানের হিসেবের বাইরে রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সম্প্রতি বলেছেন, জরুরী ভিত্তিতে এই টিকা দেয়া শুরু হবে দেশের ৬৩৬টি টিকা প্রদান কেন্দ্রের ১৪৫টিতে। প্রথম ধাপে টিকা পাবেন স্বাস্থ্যকর্মী ও ৬০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়স্ক নাগরিকরা। টিকা কিভাবে বিতরণ করা হবে তা নিয়েও চিন্তা করা হচ্ছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে ভ্যাকসিনটি অনলাইনের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। ইতোমধ্যে টিকা গ্রহণকারী নির্বাচনের জন্য একটি এ্যাপ তৈরি করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এই এ্যাপের মাধ্যমে টিকা নেয়ার জন্য নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংরক্ষণ করে গ্রহীতার সম্পর্কে যাচাই বাছাই করা হবে। খুব শীঘ্রই এ্যাপটি হাতে পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এখন করোনা টেস্টের জন্যও অনলাইনে নিবন্ধন করা যায়। এছাড়া করোনার সব তথ্যই সরকার অনলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করে। ভারতে যেভাবে ভ্যাকসিন প্রয়োগে মহড়া দেয়া হচ্ছে একইভাবে দেশেও মহড়ার ব্যবস্থার চিন্তাও করছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।


Logo