৫০ বছরে বাস্তুভিটা হারাবেন উপকূলের ত্রিশ লাখ মানুষ – বর্ণমালা টেলিভিশন

কুয়াকাটায় ‘উপকূলীয় নদী সম্মেলন’

৫০ বছরে বাস্তুভিটা হারাবেন উপকূলের ত্রিশ লাখ মানুষ

উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় * মানচিত্র থেকে উধাও ৫১৪টি নদ-নদী

ডেস্ক নিউজ
আপডেটঃ ৩০ জানুয়ারি, ২০২২ | ১:৪৭ 48 ভিউ
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলের বহু এলাকা বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকছে। একইসঙ্গে দখল-দূষণের কবলে একের পর এক নদ-নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। শত শত বছর ধরে প্রকৃতির ওপর নানাভাবে অত্যাচার করায় এমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় ধারাবাহিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। ঝড়-ঝঞ্ঝা জলোচ্ছ্বাসে দেশের ১৯টি উপকূলীয় এলাকা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর হার বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৭ গুণ বাড়বে। আগামী ৫০ বছরে বাস্তুভিটা হারাবে সাগরপাড়ের ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ। শনিবার পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় অনুষ্ঠিত ‘উপকূলীয় নদী সম্মেলনে’ এসব তথ্য জানান নদী বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে ভার্চুয়ালি যোগ দেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী সেশনে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া, ওয়াটার কিপার বাংলাদেশের সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল এবং রিভার এ ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মুহাম্মদ মনির হোসেন শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। মূল আলোচক ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মনির হোসেন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ আন্দোলন বাগেরহাট জেলার আহ্বায়ক নূর আলম শেখ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কলাপাড়ার সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মান্নু, বাপা তালতলীর সমন্বয়ক আরিফুর রহমান, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) রোমান ইমতিয়াজ তুষার এবং পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচএম সুমন। নদীর ভয়াবহ পরিস্থিতির উল্লেখ করে সম্মেলনে বক্তারা জানান, এখনই নদী রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া না হলে নদী মাতৃক বাংলাদেশে একপর্যায়ে নদী বলে আর কিছুই থাকবে না। এক্ষেত্রে মরুকরণের মতো পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে আমাদের এ সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা মাতৃভূমি। বাংলাদেশের নদী বিপর্যয়ের নানা ভয়াবহ তথ্যও আলোচনায় উঠে আসে। স্যাটেইলাইট ইমেজে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, ৫০ বছর আগে (১৯৭১ সালে) দেশে নদীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৭৪টি। অথচ এখন দেশে কত নদী আছে- এর কোনো সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে-বর্তমানে দেশে মোট নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। আবার জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হিসাবে ৭৬০টির কিছু বেশি নদ-নদীর অস্তিত্ব রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবকে সঠিক ধরলেও এ সময়ে দেশের মানচিত্র থেকে ৫১৪টি নদ-নদী হারিয়ে গেছে। যেগুলোর স্রোতধারা বেঁচে আছে, দখল-দূষণে সেগুলোও এখন মৃতপ্রায়। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী- দেশে নাব্য নৌ-পথ ছিল ২৫ হাজার ১৪০ কিলোমিটার। বর্তমানে তা মাত্র ৪ হাজার ২০০ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। দেশের ১৯টি উপকূলীয় এলাকার কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর মধ্যে ১৬টি জেলা প্রত্যক্ষভাবে উপকূলবর্তী। এগুলো হলো- পূর্ব-উপকূলের ছয় জেলা কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর; মধ্য-উপকূলের সাত জেলা ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা ও শরীয়তপুর এবং পশ্চিম-উপকূলের তিন জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এছাড়া যশোর, নড়াইল ও গোপালগঞ্জকেও উপকূলীয় এলাকা হিসাবে ধরা হয়। টেকনাফের নাফ নদের মোহনা থেকে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল-কালিন্দী পর্যন্ত উপকূল অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ৭১০ কিলোমিটার। বিশাল এ উপকূলীয় অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য দারুণ এক সম্ভাবনার ভাণ্ডার। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ সম্ভাবনাকে আমরা নিজেরাই গলাটিপে হত্যা করছি। নদী রক্ষা কমিশনের হিসাবে ৫৬ হাজার অবৈধ দখলদার গিলে খাচ্ছে আমাদের ৭৬০টি নদী। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের খাল বিলগুলোও দখল হয়ে যাচ্ছে। নদ-নদীর স্বাভাবিক গতি পথে বাঁধ দিয়ে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে জোয়ার-ভাটা। নদী হয়ে পলিমাটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করায় নাব্য হারিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। এরসঙ্গে উজানে পানি প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা না ভেবে অপরিকল্পিতভাবে বিশাল দীর্ঘ সেতু নির্মাণের মাধ্যমে নদ-নদীগুলোকে হত্যা করছি আমরা। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ কেটে অবাধে লবণাক্ত পানি ঢোকানো হচ্ছে। একদিকে এভাবে আমরা ধ্বংস করছি প্রাকৃতিক জলাধার অন্যদিকে উন্নত বিশ্বে শিল্প কারখানায় উৎপাদনের নামে চলছে বন ধ্বংস এবং কার্বন নিঃসরণ। ফলে গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ায় তাপমাত্রার ভারসাম্য হারিয়ে আশঙ্কাজনকহারে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলছে। এ বরফ গলা পানিতে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। নদ-নদীগুলোও ধারণ করতে পারছে না বাড়তি পানি। সব মিলিয়ে একদিকে আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস। অন্যদিকে একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় এলাকা। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে বর্তমানের তুলনায় দু-তিনগুণ করে বাড়তে থাকবে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা। এক্ষেত্রে আগামী ৫০ বছরে ঘরবাড়ি হারাবেন উপকূলের ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা সম্মেলনের উদ্বোধনী ও একাডেমিক সেশনে এসব সমস্যার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় আগামী ১০০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে পাঁচজনের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তাদের মধ্যে মূল আলোচনায় ছিলেন জেপিসি, বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডসের প্রিন্সিপাল স্পেশালিস্ট মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র স্পেশালিস্ট ড. ফারহানা আহমেদ, অ্যাসোসিয়েটস স্পেশালিস্ট কেএইচ রাজিবুল করিম, রিসার্স কনসালট্যান্ট এটিএম সাইদুল কবির ও রিসার্স কনসালট্যান্ট চম্পা রানী সাহা। ভার্চুয়াল বক্তব্যে প্রধান অতিথি সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, দেশের প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় রক্ষা করতে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। আগামী ১০০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে অনেকটাই সফল হবে। প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, উপকূলীয় নদীর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ হলেও নির্বিচারে চিংড়ি ঘের আর দখল-দূষণে সেই নদীকেই ধ্বংস করা হচ্ছে। সামুদ্রিক জীব-বৈচিত্র্যের প্রজনন ক্ষেত্র উপকূলীয় নদী এবং উপকূল রক্ষা করতে হবে। পরে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মুনির হোসেন বলেন, বিদ্যমান নদ-নদীগুলো বাঁচানো এবং হারিয়ে যাওয়া নদ-নদী পুনরুদ্ধার করা না গেলে দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এ ব্যাপারে সম্মেলনে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আলোচকরা। এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে সুপারিশমালা তৈরি করে সরকারকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাতে সরকার সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নদ-নদী রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:



































শীর্ষ সংবাদ:
বেনাপোল সীমান্তে সচল পিস্তলসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রেফতার নির্মাণসামগ্রীর দাম চড়া, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি কলম্বোতে কারফিউ জারি টিকে থাকার লড়াইয়ে ছক্কা হাকাতে পারবেন ইমরান খান? করোনায় আজও মৃত্যুশূন্য দেশ, শনাক্ত কমেছে ‘ততক্ষণ খেলব যতক্ষণ না আমার চেয়ে ভালো কাউকে দেখব’ এবার ইয়েমেনে পাল্টা হামলা চালাল সৌদি জোট স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালিতে যুবলীগ নেতার মৃত্যু সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র রপ্তানি করেছে মোদি সরকার বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে ফুল দেওয়া নিয়ে আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, এলাকা রণক্ষেত্র ইউক্রেনকে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও মেশিনগান দিয়েছে জার্মানি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে নারীকে ধর্ষণ, অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৩ ইউরো-বাংলা প্রেসক্লাবের ‘লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বজুড়ে আনবে একতা‘-শীর্ষক সভা বঙ্গবন্ধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নওগাঁর নওহাঁটায় স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন । ভূরুঙ্গামারীতে ব্যাপরোয়া অটোরিকশা কেরে নিল শিশুর ফাহিম এর প্রাণ ভূরুঙ্গামারী কিশোর গ‍্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আহত যশোরিয়ান ব্লাড ফাউন্ডেশন এর ৬ তম রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন বেনাপোলে পৃথক অভিযানে ৫২ বোতল ফেনসিডিল সহ আটক-২ বেনাপোল স্থলপথে স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমন নিষেধ গেরিলা যোদ্ধা অপূর্ব