হেমন্ত ঋতু, সুন্দরের কথা - বর্ণমালা টেলিভিশন

প্রকৃতিতে এখন হেমন্ত ঋতু। মধ্যদুপুরের রোদের তেজ কমে ধীর পায়ের বিকেল নামছে এখানে। সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা। উত্তর বায় থেকে ঝিরিঝিরি আসছে বাতাস। বাতাসে হিমের ছোঁয়া। টানটান শরীরে চটচট অনুভূতি। ঠোঁট ফাটার চিনচিন টান। সন্ধ্যার পরেই একটা নেতানো কালো জেঁকে বসছে। পাতায় জমা ধুলোর মতো চারপাশটা মলিন বদনে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে। ভেজা ভেজা একটা কুয়াশা-চাদর মুড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। পথের মানুষ কাজের ফিরিস্তি সেরে চায়ের দোকানে আড্ডায় বসছে। গভীর গ্রামে কৃষাণীরা ভারী কাপড় গায়ে জড়িয়ে গৃহকাজে মন দিচ্ছে। দিনের আলো সংক্ষেপিত হওয়ায় জাগ্রতরা প্রাকরাতে সেরে নিচ্ছে আরও কিছু হাতের কাজ। বালক-বালিকারা হাতাকাটা গেঞ্জি ছেড়ে নামাচ্ছে ফুলহাতা জামা। রাত ঘনাবার সাথে সাথে

বৃক্ষের পাতা বেয়ে টিনের চালে টুপটুপ করে পড়ছে শিশিরের ছ্টো ফোঁটা। শিশির জমছে মাঠের ঘাসে। শীতের আবহ ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

হেমন্ত ঋতু শীতঋতুর পূর্ব ঋতু। হেমন্তে শীতের পূর্বলক্ষণ দেখা দেবে, এটাই সত্য। সে স্বাভাবিকতায় প্রকৃতিজুড়ে, হেমন্তে শুকনো একটা রূপ উঁকি দেয় বিভিন্ন রূপে। যে রূপ শরতের নেই, যে রূপ বর্ষার নেই, যে রূপ গ্রীষ্মের নেই, যে রূপ বসন্তের নেই, যে রূপ শীতের নেই; সে অসম্ভব সুন্দর রূপ হেমন্তের; বিচিত্র ও বৈচিত্র্যময় এক অপরূপ। দীর্ঘ তাপদাহের পর এ রূপ প্রশান্তির। ভাদ্রের কাঠফাটা রোদের অতিষ্ঠতার পর শান্তির। এই রূপকে কাগজে লিখে, মুখে বলে, ছবির ফ্রেমে দেখিয়ে, চিত্রের পটে এঁকে, নাট্যের বর্ণনায় ব্যাখা

করে বোঝানো যায় না; এর প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না। কি সিনেমায়, কি নাটকে, কি উপন্যাসে, কি গল্পে, কি কবিতায় তুলে আনা যায় না হেমন্তের সেই ধানের জমির সৌকর্য, সেদ্ধ ধানের প্রথম ভাতের মৌ মৌ গন্ধের তীর্যকতা। হেমন্তের সুন্দর শরীর দেখতে হলে কাঁচা মাটির দেশে যেতে হয়। পাড়াগাঁয়ে যেতে হয়। যেখানে এখনো ইটের ছোঁয়া লেগেছে, পিচের ছোঁয়া লাগেনি। আজানেরও আগে ঘুম ভেঙে বিস্তীর্ণ মাঠে নামলে, খালি পায়ে চললে, হাতের কাছেই কুয়াশার দেয়াল দেখা যায়, দেখা যায় ঘাসের মাথায় বড় ফোঁটা, পা পিছলে যায়, অনেক সময় বোঝা যায় না এ কি শীত না হেমন্ত। এমনই এক পারত্রিক মৌলিকতা হেমন্তজুড়ে। যে

কাচের শার্সিতে ঘেরা শহরে জন্ম নিল, পাকা রাস্তায় বেড়ে বড় হলো, সে জানে না হেমন্তে কী বিভা খেলা করে অলৌকিক ভঙ্গিমায়। যদিও বঙ্গমৌলিকতা তার জন্য পথ চায় না। ঋতু বসে থাকে না কারও জন্য। সে তার নিজের নিয়মমতো আসে এবং যায়।

আদিপাঠ মতে, কাত্তিকা তারার নামে কার্তিক, আর্দ্রা তারার নামে অগ্রহায়ণ; এই দুই মাসে হেমন্ত ঋতুর বসবাস বিধায় প্রকৃতির নিয়ম ধারায় এই দুই মাসে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক চিত্র ভেসে ওঠে। হেমন্ত ঋতুকে মূলত ধানের ঋতু হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাম-বাংলার জনপদে ধানের মৌসুম হিসেবেই একে ধরে নেওয়া হয় আজও, একালেও। আউশ-আমন ধান এ ঋতুর প্রধান ফসল। কার্তিকে এ ধানে সোনার রং

লাগে, অগ্রহায়ণে কেটে বাড়ি তোলা হয়। অঞ্চলভেদে কিছুটা আগ-পিছ হলেও এ সময়েই ঘরে তোলা হয় নতুন ধান। উঠানে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে হেমন্তে বসে নবান্ন। উৎসবে মেতে ওঠে সারা বাংলা। পিঠা পায়েশ, মিঠা মণ্ডা ইত্যাদিতে ভরে ওঠে হাটবাজার, ঘর-গেরস্থালি। নাইয়্যর হয়। জামাই-আদরে প্রতিটি ঘর জমে ওঠে অতিথি আপ্যায়নে। ঘরে ঘরে বয় আনন্দযজ্ঞ।

ধানের ঋতু, সে নয় একমাত্র পরিচয়। ফুল-ফলেও হেমন্ত অন্য ঋতুর চেয়ে আরেককাঠি শৈলীতে সাজে। তার রয়েছে আপন বৈশিষ্ট্য। ঋতুভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, যা অন্যের থেকে অন্যরকম। যা হেমন্তকে চিহ্নিত করে নিজস্বতায়। বকফুল, ছাতিম, রাজ অশোক, শিউলি, কামিনী, মল্লিকাসহ আরও কত যে নাম নাজানা সতেজ ফুলের গন্ধে ভরে

হেমন্ত তা উনুচ্চারিত। ফলে তাকে চেনা যায় তার মতো করে। সজীব ফসলে ভরে ওঠে মাঠ। টাটকা সবজিতে সবুজ হাসি হাসে খোলা প্রান্তর। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই শুদ্ধতার পরিবেশ। দীর্ঘ বেঁচে থাকার অমিত আহ্বান। বিপরীত দিকও যে তার নেই, তা নয় মোটেও। জীর্ণতার আদল দেখা যায় এই ঋতুতে। শীর্ণতা দানা বাঁধে একটু একটু করে। পাতারা ঝরবে বলে প্রস্তুতি নেয়। প্রকৃতির সতেজতায় মৃত্যুগন্ধা হাওয়া ভাসে। নগরে হেমন্ত ভিন্ন। নগরায়নে এ ঋতু শুধু নয়, কোনো ঋতুর চিত্রই ধরা পরে না পুরোটা। মাঝেমধ্যে কিছুটা আঁচ করা যায় মাত্র। যাঁরা ঋতু-আগ্রহী, তাঁরা টের পান ভোরে হাঁটার সময়, বাতাসের দিক বদলে। আকাশের দিকে

তাকিয়েও তাঁরা বলে দিতে পারেন এটা হেমন্তকাল।

প্রকৃতি বিনাশের নিষ্ঠুর এ সময়ে, যান্ত্রিক এ কালে, স্যাটেলাইট আধুনিকতায় ঋতুকে এখন আর আগের মতো ছলছল মনে হয় না। ঋতু তার মৌলিকতা নিয়ে জেগে উঠতে পারে না। ক্রমে ঋতু হারিয়ে ফেলছে তার বৈশিষ্ট্য। হেমন্ত ঋতুও তার থেকে বাদ পড়ে না। বিশ্বায়নের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ও মহাকাশ সভ্যতার আবর্তে ঋতুরা যদি একদিন বিদায় নেয় প্রকৃতি থেকে, তবে হয়তো আমাদের আশ্চর্য হতে হবে না, কেননা আমরাই তো ঋতুর সৌন্দর্য লুটের প্রধান দস্যু। আমরাই তো প্রকৃতির লাবণ্য চুরি করে অতি সুন্দর সাজতে গিয়ে ধ্বংস করছি আমাদের ষড়ঋতুর শালীনতা, হেমন্তের হৈমন্তী অলংকার।

প্রকৃতিতে এখন হেমন্ত ঋতু। মধ্যদুপুরের রোদের তেজ কমে ধীর পায়ের বিকেল নামছে এখানে। সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা। উত্তর বায় থেকে ঝিরিঝিরি আসছে বাতাস। বাতাসে হিমের ছোঁয়া। টানটান শরীরে চটচট অনুভূতি। ঠোঁট ফাটার চিনচিন টান। সন্ধ্যার পরেই একটা নেতানো কালো জেঁকে বসছে। পাতায় জমা ধুলোর মতো চারপাশটা মলিন বদনে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে। ভেজা ভেজা একটা কুয়াশা-চাদর মুড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। পথের মানুষ কাজের ফিরিস্তি সেরে চায়ের দোকানে আড্ডায় বসছে। গভীর গ্রামে কৃষাণীরা ভারী কাপড় গায়ে জড়িয়ে গৃহকাজে মন দিচ্ছে। দিনের আলো সংক্ষেপিত হওয়ায় জাগ্রতরা প্রাকরাতে সেরে নিচ্ছে আরও কিছু হাতের কাজ। বালক-বালিকারা হাতাকাটা গেঞ্জি ছেড়ে নামাচ্ছে ফুলহাতা জামা। রাত ঘনাবার সাথে সাথে

বৃক্ষের পাতা বেয়ে টিনের চালে টুপটুপ করে পড়ছে শিশিরের ছ্টো ফোঁটা। শিশির জমছে মাঠের ঘাসে। শীতের আবহ ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে।

হেমন্ত ঋতু শীতঋতুর পূর্ব ঋতু। হেমন্তে শীতের পূর্বলক্ষণ দেখা দেবে, এটাই সত্য। সে স্বাভাবিকতায় প্রকৃতিজুড়ে, হেমন্তে শুকনো একটা রূপ উঁকি দেয় বিভিন্ন রূপে। যে রূপ শরতের নেই, যে রূপ বর্ষার নেই, যে রূপ গ্রীষ্মের নেই, যে রূপ বসন্তের নেই, যে রূপ শীতের নেই; সে অসম্ভব সুন্দর রূপ হেমন্তের; বিচিত্র ও বৈচিত্র্যময় এক অপরূপ। দীর্ঘ তাপদাহের পর এ রূপ প্রশান্তির। ভাদ্রের কাঠফাটা রোদের অতিষ্ঠতার পর শান্তির। এই রূপকে কাগজে লিখে, মুখে বলে, ছবির ফ্রেমে দেখিয়ে, চিত্রের পটে এঁকে, নাট্যের বর্ণনায় ব্যাখা

করে বোঝানো যায় না; এর প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না। কি সিনেমায়, কি নাটকে, কি উপন্যাসে, কি গল্পে, কি কবিতায় তুলে আনা যায় না হেমন্তের সেই ধানের জমির সৌকর্য, সেদ্ধ ধানের প্রথম ভাতের মৌ মৌ গন্ধের তীর্যকতা। হেমন্তের সুন্দর শরীর দেখতে হলে কাঁচা মাটির দেশে যেতে হয়। পাড়াগাঁয়ে যেতে হয়। যেখানে এখনো ইটের ছোঁয়া লেগেছে, পিচের ছোঁয়া লাগেনি। আজানেরও আগে ঘুম ভেঙে বিস্তীর্ণ মাঠে নামলে, খালি পায়ে চললে, হাতের কাছেই কুয়াশার দেয়াল দেখা যায়, দেখা যায় ঘাসের মাথায় বড় ফোঁটা, পা পিছলে যায়, অনেক সময় বোঝা যায় না এ কি শীত না হেমন্ত। এমনই এক পারত্রিক মৌলিকতা হেমন্তজুড়ে। যে

কাচের শার্সিতে ঘেরা শহরে জন্ম নিল, পাকা রাস্তায় বেড়ে বড় হলো, সে জানে না হেমন্তে কী বিভা খেলা করে অলৌকিক ভঙ্গিমায়। যদিও বঙ্গমৌলিকতা তার জন্য পথ চায় না। ঋতু বসে থাকে না কারও জন্য। সে তার নিজের নিয়মমতো আসে এবং যায়।

আদিপাঠ মতে, কাত্তিকা তারার নামে কার্তিক, আর্দ্রা তারার নামে অগ্রহায়ণ; এই দুই মাসে হেমন্ত ঋতুর বসবাস বিধায় প্রকৃতির নিয়ম ধারায় এই দুই মাসে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক চিত্র ভেসে ওঠে। হেমন্ত ঋতুকে মূলত ধানের ঋতু হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাম-বাংলার জনপদে ধানের মৌসুম হিসেবেই একে ধরে নেওয়া হয় আজও, একালেও। আউশ-আমন ধান এ ঋতুর প্রধান ফসল। কার্তিকে এ ধানে সোনার রং

লাগে, অগ্রহায়ণে কেটে বাড়ি তোলা হয়। অঞ্চলভেদে কিছুটা আগ-পিছ হলেও এ সময়েই ঘরে তোলা হয় নতুন ধান। উঠানে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে হেমন্তে বসে নবান্ন। উৎসবে মেতে ওঠে সারা বাংলা। পিঠা পায়েশ, মিঠা মণ্ডা ইত্যাদিতে ভরে ওঠে হাটবাজার, ঘর-গেরস্থালি। নাইয়্যর হয়। জামাই-আদরে প্রতিটি ঘর জমে ওঠে অতিথি আপ্যায়নে। ঘরে ঘরে বয় আনন্দযজ্ঞ।

ধানের ঋতু, সে নয় একমাত্র পরিচয়। ফুল-ফলেও হেমন্ত অন্য ঋতুর চেয়ে আরেককাঠি শৈলীতে সাজে। তার রয়েছে আপন বৈশিষ্ট্য। ঋতুভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, যা অন্যের থেকে অন্যরকম। যা হেমন্তকে চিহ্নিত করে নিজস্বতায়। বকফুল, ছাতিম, রাজ অশোক, শিউলি, কামিনী, মল্লিকাসহ আরও কত যে নাম নাজানা সতেজ ফুলের গন্ধে ভরে

হেমন্ত তা উনুচ্চারিত। ফলে তাকে চেনা যায় তার মতো করে। সজীব ফসলে ভরে ওঠে মাঠ। টাটকা সবজিতে সবুজ হাসি হাসে খোলা প্রান্তর। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই শুদ্ধতার পরিবেশ। দীর্ঘ বেঁচে থাকার অমিত আহ্বান। বিপরীত দিকও যে তার নেই, তা নয় মোটেও। জীর্ণতার আদল দেখা যায় এই ঋতুতে। শীর্ণতা দানা বাঁধে একটু একটু করে। পাতারা ঝরবে বলে প্রস্তুতি নেয়। প্রকৃতির সতেজতায় মৃত্যুগন্ধা হাওয়া ভাসে। নগরে হেমন্ত ভিন্ন। নগরায়নে এ ঋতু শুধু নয়, কোনো ঋতুর চিত্রই ধরা পরে না পুরোটা। মাঝেমধ্যে কিছুটা আঁচ করা যায় মাত্র। যাঁরা ঋতু-আগ্রহী, তাঁরা টের পান ভোরে হাঁটার সময়, বাতাসের দিক বদলে। আকাশের দিকে

তাকিয়েও তাঁরা বলে দিতে পারেন এটা হেমন্তকাল।

প্রকৃতি বিনাশের নিষ্ঠুর এ সময়ে, যান্ত্রিক এ কালে, স্যাটেলাইট আধুনিকতায় ঋতুকে এখন আর আগের মতো ছলছল মনে হয় না। ঋতু তার মৌলিকতা নিয়ে জেগে উঠতে পারে না। ক্রমে ঋতু হারিয়ে ফেলছে তার বৈশিষ্ট্য। হেমন্ত ঋতুও তার থেকে বাদ পড়ে না। বিশ্বায়নের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ও মহাকাশ সভ্যতার আবর্তে ঋতুরা যদি একদিন বিদায় নেয় প্রকৃতি থেকে, তবে হয়তো আমাদের আশ্চর্য হতে হবে না, কেননা আমরাই তো ঋতুর সৌন্দর্য লুটের প্রধান দস্যু। আমরাই তো প্রকৃতির লাবণ্য চুরি করে অতি সুন্দর সাজতে গিয়ে ধ্বংস করছি আমাদের ষড়ঋতুর শালীনতা, হেমন্তের হৈমন্তী অলংকার।

জোবায়ের মিলন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১
৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ
106 ভিউ

হেমন্ত ঋতু, সুন্দরের কথা

জোবায়ের মিলন
আপডেটঃ ১৮ নভেম্বর, ২০২১ | ৮:৪৫ 106 ভিউ
প্রকৃতিতে এখন হেমন্ত ঋতু। মধ্যদুপুরের রোদের তেজ কমে ধীর পায়ের বিকেল নামছে এখানে। সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যা। উত্তর বায় থেকে ঝিরিঝিরি আসছে বাতাস। বাতাসে হিমের ছোঁয়া। টানটান শরীরে চটচট অনুভূতি। ঠোঁট ফাটার চিনচিন টান। সন্ধ্যার পরেই একটা নেতানো কালো জেঁকে বসছে। পাতায় জমা ধুলোর মতো চারপাশটা মলিন বদনে ঘরের কোণে আশ্রয় নিচ্ছে। ভেজা ভেজা একটা কুয়াশা-চাদর মুড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে। পথের মানুষ কাজের ফিরিস্তি সেরে চায়ের দোকানে আড্ডায় বসছে। গভীর গ্রামে কৃষাণীরা ভারী কাপড় গায়ে জড়িয়ে গৃহকাজে মন দিচ্ছে। দিনের আলো সংক্ষেপিত হওয়ায় জাগ্রতরা প্রাকরাতে সেরে নিচ্ছে আরও কিছু হাতের কাজ। বালক-বালিকারা হাতাকাটা গেঞ্জি ছেড়ে নামাচ্ছে ফুলহাতা জামা। রাত ঘনাবার সাথে সাথে

বৃক্ষের পাতা বেয়ে টিনের চালে টুপটুপ করে পড়ছে শিশিরের ছ্টো ফোঁটা। শিশির জমছে মাঠের ঘাসে। শীতের আবহ ঘনিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। হেমন্ত ঋতু শীতঋতুর পূর্ব ঋতু। হেমন্তে শীতের পূর্বলক্ষণ দেখা দেবে, এটাই সত্য। সে স্বাভাবিকতায় প্রকৃতিজুড়ে, হেমন্তে শুকনো একটা রূপ উঁকি দেয় বিভিন্ন রূপে। যে রূপ শরতের নেই, যে রূপ বর্ষার নেই, যে রূপ গ্রীষ্মের নেই, যে রূপ বসন্তের নেই, যে রূপ শীতের নেই; সে অসম্ভব সুন্দর রূপ হেমন্তের; বিচিত্র ও বৈচিত্র্যময় এক অপরূপ। দীর্ঘ তাপদাহের পর এ রূপ প্রশান্তির। ভাদ্রের কাঠফাটা রোদের অতিষ্ঠতার পর শান্তির। এই রূপকে কাগজে লিখে, মুখে বলে, ছবির ফ্রেমে দেখিয়ে, চিত্রের পটে এঁকে, নাট্যের বর্ণনায় ব্যাখা

করে বোঝানো যায় না; এর প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা যায় না। কি সিনেমায়, কি নাটকে, কি উপন্যাসে, কি গল্পে, কি কবিতায় তুলে আনা যায় না হেমন্তের সেই ধানের জমির সৌকর্য, সেদ্ধ ধানের প্রথম ভাতের মৌ মৌ গন্ধের তীর্যকতা। হেমন্তের সুন্দর শরীর দেখতে হলে কাঁচা মাটির দেশে যেতে হয়। পাড়াগাঁয়ে যেতে হয়। যেখানে এখনো ইটের ছোঁয়া লেগেছে, পিচের ছোঁয়া লাগেনি। আজানেরও আগে ঘুম ভেঙে বিস্তীর্ণ মাঠে নামলে, খালি পায়ে চললে, হাতের কাছেই কুয়াশার দেয়াল দেখা যায়, দেখা যায় ঘাসের মাথায় বড় ফোঁটা, পা পিছলে যায়, অনেক সময় বোঝা যায় না এ কি শীত না হেমন্ত। এমনই এক পারত্রিক মৌলিকতা হেমন্তজুড়ে। যে

কাচের শার্সিতে ঘেরা শহরে জন্ম নিল, পাকা রাস্তায় বেড়ে বড় হলো, সে জানে না হেমন্তে কী বিভা খেলা করে অলৌকিক ভঙ্গিমায়। যদিও বঙ্গমৌলিকতা তার জন্য পথ চায় না। ঋতু বসে থাকে না কারও জন্য। সে তার নিজের নিয়মমতো আসে এবং যায়। আদিপাঠ মতে, কাত্তিকা তারার নামে কার্তিক, আর্দ্রা তারার নামে অগ্রহায়ণ; এই দুই মাসে হেমন্ত ঋতুর বসবাস বিধায় প্রকৃতির নিয়ম ধারায় এই দুই মাসে ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক চিত্র ভেসে ওঠে। হেমন্ত ঋতুকে মূলত ধানের ঋতু হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রাম-বাংলার জনপদে ধানের মৌসুম হিসেবেই একে ধরে নেওয়া হয় আজও, একালেও। আউশ-আমন ধান এ ঋতুর প্রধান ফসল। কার্তিকে এ ধানে সোনার রং

লাগে, অগ্রহায়ণে কেটে বাড়ি তোলা হয়। অঞ্চলভেদে কিছুটা আগ-পিছ হলেও এ সময়েই ঘরে তোলা হয় নতুন ধান। উঠানে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে ভাত রান্নাকে কেন্দ্র করে হেমন্তে বসে নবান্ন। উৎসবে মেতে ওঠে সারা বাংলা। পিঠা পায়েশ, মিঠা মণ্ডা ইত্যাদিতে ভরে ওঠে হাটবাজার, ঘর-গেরস্থালি। নাইয়্যর হয়। জামাই-আদরে প্রতিটি ঘর জমে ওঠে অতিথি আপ্যায়নে। ঘরে ঘরে বয় আনন্দযজ্ঞ। ধানের ঋতু, সে নয় একমাত্র পরিচয়। ফুল-ফলেও হেমন্ত অন্য ঋতুর চেয়ে আরেককাঠি শৈলীতে সাজে। তার রয়েছে আপন বৈশিষ্ট্য। ঋতুভিত্তিক বৈশিষ্ট্য, যা অন্যের থেকে অন্যরকম। যা হেমন্তকে চিহ্নিত করে নিজস্বতায়। বকফুল, ছাতিম, রাজ অশোক, শিউলি, কামিনী, মল্লিকাসহ আরও কত যে নাম নাজানা সতেজ ফুলের গন্ধে ভরে

হেমন্ত তা উনুচ্চারিত। ফলে তাকে চেনা যায় তার মতো করে। সজীব ফসলে ভরে ওঠে মাঠ। টাটকা সবজিতে সবুজ হাসি হাসে খোলা প্রান্তর। যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই শুদ্ধতার পরিবেশ। দীর্ঘ বেঁচে থাকার অমিত আহ্বান। বিপরীত দিকও যে তার নেই, তা নয় মোটেও। জীর্ণতার আদল দেখা যায় এই ঋতুতে। শীর্ণতা দানা বাঁধে একটু একটু করে। পাতারা ঝরবে বলে প্রস্তুতি নেয়। প্রকৃতির সতেজতায় মৃত্যুগন্ধা হাওয়া ভাসে। নগরে হেমন্ত ভিন্ন। নগরায়নে এ ঋতু শুধু নয়, কোনো ঋতুর চিত্রই ধরা পরে না পুরোটা। মাঝেমধ্যে কিছুটা আঁচ করা যায় মাত্র। যাঁরা ঋতু-আগ্রহী, তাঁরা টের পান ভোরে হাঁটার সময়, বাতাসের দিক বদলে। আকাশের দিকে

তাকিয়েও তাঁরা বলে দিতে পারেন এটা হেমন্তকাল। প্রকৃতি বিনাশের নিষ্ঠুর এ সময়ে, যান্ত্রিক এ কালে, স্যাটেলাইট আধুনিকতায় ঋতুকে এখন আর আগের মতো ছলছল মনে হয় না। ঋতু তার মৌলিকতা নিয়ে জেগে উঠতে পারে না। ক্রমে ঋতু হারিয়ে ফেলছে তার বৈশিষ্ট্য। হেমন্ত ঋতুও তার থেকে বাদ পড়ে না। বিশ্বায়নের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ও মহাকাশ সভ্যতার আবর্তে ঋতুরা যদি একদিন বিদায় নেয় প্রকৃতি থেকে, তবে হয়তো আমাদের আশ্চর্য হতে হবে না, কেননা আমরাই তো ঋতুর সৌন্দর্য লুটের প্রধান দস্যু। আমরাই তো প্রকৃতির লাবণ্য চুরি করে অতি সুন্দর সাজতে গিয়ে ধ্বংস করছি আমাদের ষড়ঋতুর শালীনতা, হেমন্তের হৈমন্তী অলংকার।

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


































শীর্ষ সংবাদ:
নিয়োগে দুর্নীতি: জীবন বীমার এমডির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা মিহির ঘোষসহ নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবীতে গাইবান্ধায় সিপিবির বিক্ষোভ গাইবান্ধায় সেনাবাহিনীর ভূয়া ক্যাপ্টেন গ্রেফতার জগন্নাথপুরে সড়ক নির্মানের অভিযোগ এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তারাকান্দায় অসহায় ও দুস্থদের মাঝে ছাত্রদলের খাবার বিতরণ দেবহাটায় অস্ত্র-গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার আটক -১ রামগড়ে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাগমারায় ভেদুর মোড় হতে নরদাশ পর্যন্ত পাকা রাস্তার শুভ উদ্বোধন সরকারি বিধিনিষেধ না মানায় শার্শায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা আদায় মধুখালীতে তিন মাসে ৪৩ টি গরু চুরি গাইবান্ধায় বঙ্গবন্ধু জেলা ভলিবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন গাইবান্ধায় শীতবস্ত্র বিতরণ রাজশাহীতে পুত্রের হাতে পিতা খুন বাগমারায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার রামগড়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার শীতবস্ত্র বিতরণ করেন ইউএনও ভাঃ উম্মে হাবিবা মজুমদার জগন্নাথপুরে জুয়ার আসরে পুলিশ দেখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ এক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সিপিবি নেতা মিহির ঘোষসহ ৬ জন কারাগারে পিআইও’র মানহানির মামলায় গাইবান্ধার ৪ সাংবাদিকসহ ৫ জনের জামিন গাইবান্ধায় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মানববন্ধন চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনালী ব্যাংক লি. গোমস্তাপুর শাখায় শীতবস্ত্র বিতরণ