হাফ পাশ, কুয়েট ও অন্যান্য প্রসঙ্গ - বর্ণমালা টেলিভিশন

ইচ্ছা ছিল বিজয়ের মাসে আজ মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে লিখব। কিন্তু চলমান কতগুলো ঘটন-অঘটন মনকে অস্থির করে তুলেছে। তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে হচ্ছে। দৃশ্যমান উন্নয়নের চাকচিক্যে আমরা আনন্দিত-আমোদিত। অনেকেই মনে করছি উন্নয়নের রেলগাড়ি ছুটছে সামনে, আর পেছনে তাকাতে হবে না। তেমনটি হলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা সরকারের উত্থান-পতন দেখেছি আমরা।

মানতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো এমন স্বপ্নদ্রষ্টা আর দেখা যায়নি। তিনি শুধু উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি-স্বপ্নকে বাস্তবের উঠোনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন এবং অনেকটা সাফল্যও দেখাতে পেরেছেন। কিন্তু সুশাসনের অভাব থাকায়, গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এবং রাজনীতিকে সংকীর্ণ দলতন্ত্র থেকে বের করে গণসম্পৃক্ত করতে না পারায়

উঠোনজুড়ে ঘুণপোকার বসত বিস্তার শুরু হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা ক্ষমতার দাপটে তা যেন ঠিক দেখতে পাচ্ছেন না।

চকচকে ইমারত ক্রমে নোনাক্রান্ত হচ্ছে। এ ঔজ্জ্বল্য হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অশনি সংকেত দেখাচ্ছে। এ কারণে আমরা মনে করছি দেশের ক্ষমতাবান সংশ্লিষ্টদের দম্ভের অচলায়তন থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার পৃথিবীতে নেমে আসা জরুরি।

২০১৮-এর পর আবার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। বলা যায় নামতে বাধ্য হয়েছে। সড়ক অবরোধ করছে, মানববন্ধন করছে। ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচনে রক্ত ঝরছে। দ্রব্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠছে। যাপিত জীবন কষ্টের হলে তাদের কাছে পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল তেমন গুরুত্ব পাবে না। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের নেতাদের অভব্য

ব্যবহারে কষ্ট পাওয়া কুয়েটের মেধাবী শিক্ষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বিচারের দাবিতে ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন ক্যাম্পাসে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় বসলেও বোধগম্য কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এভাবে একে একে ছাইছাপা দিয়ে আগুন থামানোর চেষ্টা চলছে। এসবের কারণে সমালোচিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তদন্তের আলোকে শাস্তি দেওয়ার শক্তি পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের ৯ সদস্যকে। অর্থাৎ ছাত্রলীগের ঔদ্ধত্য প্রাথমিকভাবে আবারও প্রকাশ্যে এলো। এভাবে সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় না সরকার ও সরকারি দলের রাজনীতির সময়টা ভালো যাচ্ছে।

এ সত্য সবাই মানেন

যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করবেই। তখন ধমক দিয়ে বা কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে সবাইকে থামানো যাবে না। বরঞ্চ এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখতে হবে। আর একটি সংকট আছে আমাদের ক্ষমতাবান মানুষদের। পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে সবকিছুর পেছনে বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্রের থিউরি আওড়াতে থাকেন। নিজ রাজনৈতিক দলের মানুষ এসবে সান্ত্বনা পেলেও ভুক্তভোগী মানুষকে বিভ্রান্ত করা কঠিন হবে। এটিও ঠিক, এদেশের রাজনীতির ধরন এমন যে, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সরকার কিছুটা বিব্রত হলে সেই সুযোগ থেকে বিরোধী দল ফসল তোলার চেষ্টা করে। অনেক সময় উসকে দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চায়। সেই জায়গাটিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করার কথা সরকারি দল ও

সরকারের। তার বদলে মূল দাবিকে পাশ কাটানো ক্ষতির কারণ হিসাবে দেখা দিতে পারে।

এই যে বাসে হাফভাড়া নেওয়ার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন-একে নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যেতে সরকারের অনেক বেশি দেরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার যতটা পরিবহণ মালিকের স্বার্থ দেখে ততটা সাধারণ মানুষের নয়। একপর্যায়ে ঘোষণা এলো সরকারি বিআরটিসির বাসে হাফভাড়া চলবে। কিন্তু সরকার বেসরকারি বাসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক স্বস্তি পায়নি। কারণ তারা জানেন হাতে গোনা অল্প কিছু সরকারি বাস রাজধানীতে চলাচল করে। এ সিদ্ধান্ত তাই কাউকে স্বস্তি দিতে পারেনি। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিকরা ছাত্রদের জন্য শর্তযুক্ত করে হাফ পাশে রাজি হলেও

শুধু ঢাকাতে কার্যকর ও শর্তের বেড়াজাল থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো না। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিক সমিতি থেকে ঘোষণা আসে সব নগরীতে ছুটির দিন ছাড়া হাফভাড়া ১১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। গাড়ির মালিক এবং চুক্তিতে নেওয়া চালকদেরও সংকট আছে। তাদের নানা সমিতি আর পুলিশকে চাঁদা দিতে লভ্যাংশের অনেকটা চলে যায়। তাই হাফ ভাড়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত আসতে স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট হবে। সরকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে এ ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারত। এমন অবস্থা সৃষ্টি হলে মালিক বা চুক্তিতে গাড়ি নেওয়া চালক সবাই হাফভাড়া নেওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু সবাই জানেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা বা ক্ষমতা

কোনো সরকারের ছিল না।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের স্লোগানকে এড়িয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সরকারি দুর্বলতার প্রমাণ। প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চাপায় মৃত্যুর সংখ্যা বড় হচ্ছে। সেখানে যদি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে চালকদের শাসন না করে বলা হয় চলন্ত গাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করা মানুষ গাড়ি চাপা পড়ছে, তবে আর সান্ত্বনার জায়গা কোথায় থাকে! এই যে বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে শুরু করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্লাকার্ডেও লেখা আছে চুক্তি পদ্ধতি বাতিল করে চালক ও সহকারীদের বেতনভুক্ত চাকরিতে নিয়োগদানের মাধ্যমে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে, তাতে তো সরকার গা করছে না। অর্থাৎ মালিকদের স্বার্থের বাইরে যাওয়া যাবে না। আমরা বুঝি না এভাবে গণবিচ্ছিন্ন হওয়াকে মেনে নিচ্ছে কেন সরকার ও

সরকারি দল।

আওয়ামী লীগ তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা দল। তাদের তো জানা উচিত নতুন প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আবার পথে নামতে হয়েছে। ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে এ আন্দোলনে অভিভাবক, শিক্ষক অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সায় রয়েছে। তাই সরকারি ভূমিকায় দূরদর্শিতার ছাপ থাকা বাঞ্ছনীয়। সড়ক নিরাপদ করতে সরকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বলেই তো শিক্ষার্থীদের পথে নামতে হয়েছে, রাজনৈতিক বক্তব্য বাদ দিয়ে এসব সত্য বিবেচনায় এনে কাজ করা উচিত।

সবচেয়ে ভালো হতো এমন একটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহমত পোষণ করে নিজেদের যুক্ত করতে পারত। বিশেষ করে যেখানে আন্দোলনের দাবিগুলো সরকারবিরোধী নয়, সরকারের কাছ থেকে প্রতিকার চাওয়া। আর দাবিগুলোও শিক্ষার্থী তথা জনবান্ধব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ছাত্রলীগ এখন আর ছাত্র কল্যাণমুখী সংগঠন নয়। এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রভু হয়ে থাকতে চায়। ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ, ছাত্রলীগ কোনো পৃথক চরিত্রের প্রকাশ দেখায়নি। শিক্ষা, সংস্কৃতির জগতের কোনো কাজে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতাদের ভূমিকা রাখতে সাধারণত দেখা যায় না। তাদের পাওয়া যায় মতে না মিললে সতীর্থদের ওপর নির্যাতন করতে, ঠিকাদার থেকে শুরু করে ডাইনিংয়ের ম্যানেজারের কাছ থেকে টুপাইস কামাই করতে। শিক্ষকদের প্রতি দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে।

এরই একটি দুঃখজনক পরিণতি দেখা গেল কুয়েটে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে ছাত্রলীগ নেতাদের শাস্তি দেওয়ার কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকের সঙ্গে প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহারের ভিডিও প্রচার পাওয়ায় কুয়েটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদকে হালকা করে নেওয়ার উপায় নেই।

কুয়েট ছাত্রলীগের অনাচারের আরও তথ্য দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। কুয়েটের এক হলে ডাইনিংয়ের ম্যানেজার নিয়োগে ছাত্রলীগের ইচ্ছাপূরণ না হওয়ায় লাঞ্ছিত হতে হয়েছে শিক্ষককে। সাধারণ পাঠকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, ডাইনিংসহ হলের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ তো করবে হল প্রশাসন। তাহলে এখানে ছাত্রলীগের ছেলেরা নাক গলাচ্ছে কেন? তাদের অবগতির জন্য জানাই, আমরা যারা কাছে থেকে দেখছি-দেখে আসছি তারা জানি এখন আর সেই দিন নেই। হল প্রশাসনে থাকা শিক্ষকদের পদ এখন অনেকটা আলংকারিক পদ। হলে সিট বরাদ্দ, ডাইনিং হল, ক্যান্টিনের ক্যাটারার বা ম্যানেজার নিয়োগের কর্তৃত্ব এখন সরকারি দলের ছাত্রদেরই। এতে যে সাধারণ ছাত্রদের উপকার হয় তেমন নয়। সাধারণ ছাত্রের পয়সায় ভাগ বসিয়ে নেতাদের অনেকে ফ্রি খান। ম্যানেজারদের সঙ্গে গোপন ফয়সালা হওয়ায় ডাইনিংয়ে ডালের ঘনত্ব কমে যায়, মাংস আর মাছের টুকরো ছোট হতে থাকে।

এসব হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। পৃষ্ঠপোষক কেন্দ্রীয় নেতারা যে এসব জানেন না, তেমন নয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে লাঠিয়াল তো ঠিক রাখতে হবে। সবকিছুর পরও আমরা ভাবি, আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকরা যৌক্তিক আন্দোলনে মাঠে নামা শিক্ষার্থীদের ধমক না দিয়ে যদি দলীয় ছাত্রদের ধমক দিয়ে সুপথে আনতে পারতেন, তবে সব দিক থেকে ভালো হতো।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

ইচ্ছা ছিল বিজয়ের মাসে আজ মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে লিখব। কিন্তু চলমান কতগুলো ঘটন-অঘটন মনকে অস্থির করে তুলেছে। তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে হচ্ছে। দৃশ্যমান উন্নয়নের চাকচিক্যে আমরা আনন্দিত-আমোদিত। অনেকেই মনে করছি উন্নয়নের রেলগাড়ি ছুটছে সামনে, আর পেছনে তাকাতে হবে না। তেমনটি হলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা সরকারের উত্থান-পতন দেখেছি আমরা।

মানতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো এমন স্বপ্নদ্রষ্টা আর দেখা যায়নি। তিনি শুধু উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি-স্বপ্নকে বাস্তবের উঠোনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন এবং অনেকটা সাফল্যও দেখাতে পেরেছেন। কিন্তু সুশাসনের অভাব থাকায়, গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এবং রাজনীতিকে সংকীর্ণ দলতন্ত্র থেকে বের করে গণসম্পৃক্ত করতে না পারায়

উঠোনজুড়ে ঘুণপোকার বসত বিস্তার শুরু হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা ক্ষমতার দাপটে তা যেন ঠিক দেখতে পাচ্ছেন না।

চকচকে ইমারত ক্রমে নোনাক্রান্ত হচ্ছে। এ ঔজ্জ্বল্য হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অশনি সংকেত দেখাচ্ছে। এ কারণে আমরা মনে করছি দেশের ক্ষমতাবান সংশ্লিষ্টদের দম্ভের অচলায়তন থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার পৃথিবীতে নেমে আসা জরুরি।

২০১৮-এর পর আবার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। বলা যায় নামতে বাধ্য হয়েছে। সড়ক অবরোধ করছে, মানববন্ধন করছে। ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচনে রক্ত ঝরছে। দ্রব্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠছে। যাপিত জীবন কষ্টের হলে তাদের কাছে পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল তেমন গুরুত্ব পাবে না। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের নেতাদের অভব্য

ব্যবহারে কষ্ট পাওয়া কুয়েটের মেধাবী শিক্ষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বিচারের দাবিতে ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন ক্যাম্পাসে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় বসলেও বোধগম্য কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এভাবে একে একে ছাইছাপা দিয়ে আগুন থামানোর চেষ্টা চলছে। এসবের কারণে সমালোচিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তদন্তের আলোকে শাস্তি দেওয়ার শক্তি পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের ৯ সদস্যকে। অর্থাৎ ছাত্রলীগের ঔদ্ধত্য প্রাথমিকভাবে আবারও প্রকাশ্যে এলো। এভাবে সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় না সরকার ও সরকারি দলের রাজনীতির সময়টা ভালো যাচ্ছে।

এ সত্য সবাই মানেন

যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করবেই। তখন ধমক দিয়ে বা কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে সবাইকে থামানো যাবে না। বরঞ্চ এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখতে হবে। আর একটি সংকট আছে আমাদের ক্ষমতাবান মানুষদের। পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে সবকিছুর পেছনে বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্রের থিউরি আওড়াতে থাকেন। নিজ রাজনৈতিক দলের মানুষ এসবে সান্ত্বনা পেলেও ভুক্তভোগী মানুষকে বিভ্রান্ত করা কঠিন হবে। এটিও ঠিক, এদেশের রাজনীতির ধরন এমন যে, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সরকার কিছুটা বিব্রত হলে সেই সুযোগ থেকে বিরোধী দল ফসল তোলার চেষ্টা করে। অনেক সময় উসকে দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চায়। সেই জায়গাটিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করার কথা সরকারি দল ও

সরকারের। তার বদলে মূল দাবিকে পাশ কাটানো ক্ষতির কারণ হিসাবে দেখা দিতে পারে।

এই যে বাসে হাফভাড়া নেওয়ার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন-একে নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যেতে সরকারের অনেক বেশি দেরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার যতটা পরিবহণ মালিকের স্বার্থ দেখে ততটা সাধারণ মানুষের নয়। একপর্যায়ে ঘোষণা এলো সরকারি বিআরটিসির বাসে হাফভাড়া চলবে। কিন্তু সরকার বেসরকারি বাসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক স্বস্তি পায়নি। কারণ তারা জানেন হাতে গোনা অল্প কিছু সরকারি বাস রাজধানীতে চলাচল করে। এ সিদ্ধান্ত তাই কাউকে স্বস্তি দিতে পারেনি। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিকরা ছাত্রদের জন্য শর্তযুক্ত করে হাফ পাশে রাজি হলেও

শুধু ঢাকাতে কার্যকর ও শর্তের বেড়াজাল থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো না। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিক সমিতি থেকে ঘোষণা আসে সব নগরীতে ছুটির দিন ছাড়া হাফভাড়া ১১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। গাড়ির মালিক এবং চুক্তিতে নেওয়া চালকদেরও সংকট আছে। তাদের নানা সমিতি আর পুলিশকে চাঁদা দিতে লভ্যাংশের অনেকটা চলে যায়। তাই হাফ ভাড়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত আসতে স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট হবে। সরকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে এ ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারত। এমন অবস্থা সৃষ্টি হলে মালিক বা চুক্তিতে গাড়ি নেওয়া চালক সবাই হাফভাড়া নেওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু সবাই জানেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা বা ক্ষমতা

কোনো সরকারের ছিল না।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের স্লোগানকে এড়িয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সরকারি দুর্বলতার প্রমাণ। প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চাপায় মৃত্যুর সংখ্যা বড় হচ্ছে। সেখানে যদি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে চালকদের শাসন না করে বলা হয় চলন্ত গাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করা মানুষ গাড়ি চাপা পড়ছে, তবে আর সান্ত্বনার জায়গা কোথায় থাকে! এই যে বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে শুরু করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্লাকার্ডেও লেখা আছে চুক্তি পদ্ধতি বাতিল করে চালক ও সহকারীদের বেতনভুক্ত চাকরিতে নিয়োগদানের মাধ্যমে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে, তাতে তো সরকার গা করছে না। অর্থাৎ মালিকদের স্বার্থের বাইরে যাওয়া যাবে না। আমরা বুঝি না এভাবে গণবিচ্ছিন্ন হওয়াকে মেনে নিচ্ছে কেন সরকার ও

সরকারি দল।

আওয়ামী লীগ তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা দল। তাদের তো জানা উচিত নতুন প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আবার পথে নামতে হয়েছে। ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে এ আন্দোলনে অভিভাবক, শিক্ষক অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সায় রয়েছে। তাই সরকারি ভূমিকায় দূরদর্শিতার ছাপ থাকা বাঞ্ছনীয়। সড়ক নিরাপদ করতে সরকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বলেই তো শিক্ষার্থীদের পথে নামতে হয়েছে, রাজনৈতিক বক্তব্য বাদ দিয়ে এসব সত্য বিবেচনায় এনে কাজ করা উচিত।

সবচেয়ে ভালো হতো এমন একটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহমত পোষণ করে নিজেদের যুক্ত করতে পারত। বিশেষ করে যেখানে আন্দোলনের দাবিগুলো সরকারবিরোধী নয়, সরকারের কাছ থেকে প্রতিকার চাওয়া। আর দাবিগুলোও শিক্ষার্থী তথা জনবান্ধব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ছাত্রলীগ এখন আর ছাত্র কল্যাণমুখী সংগঠন নয়। এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রভু হয়ে থাকতে চায়। ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ, ছাত্রলীগ কোনো পৃথক চরিত্রের প্রকাশ দেখায়নি। শিক্ষা, সংস্কৃতির জগতের কোনো কাজে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতাদের ভূমিকা রাখতে সাধারণত দেখা যায় না। তাদের পাওয়া যায় মতে না মিললে সতীর্থদের ওপর নির্যাতন করতে, ঠিকাদার থেকে শুরু করে ডাইনিংয়ের ম্যানেজারের কাছ থেকে টুপাইস কামাই করতে। শিক্ষকদের প্রতি দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে।

এরই একটি দুঃখজনক পরিণতি দেখা গেল কুয়েটে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে ছাত্রলীগ নেতাদের শাস্তি দেওয়ার কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকের সঙ্গে প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহারের ভিডিও প্রচার পাওয়ায় কুয়েটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদকে হালকা করে নেওয়ার উপায় নেই।

কুয়েট ছাত্রলীগের অনাচারের আরও তথ্য দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। কুয়েটের এক হলে ডাইনিংয়ের ম্যানেজার নিয়োগে ছাত্রলীগের ইচ্ছাপূরণ না হওয়ায় লাঞ্ছিত হতে হয়েছে শিক্ষককে। সাধারণ পাঠকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, ডাইনিংসহ হলের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ তো করবে হল প্রশাসন। তাহলে এখানে ছাত্রলীগের ছেলেরা নাক গলাচ্ছে কেন? তাদের অবগতির জন্য জানাই, আমরা যারা কাছে থেকে দেখছি-দেখে আসছি তারা জানি এখন আর সেই দিন নেই। হল প্রশাসনে থাকা শিক্ষকদের পদ এখন অনেকটা আলংকারিক পদ। হলে সিট বরাদ্দ, ডাইনিং হল, ক্যান্টিনের ক্যাটারার বা ম্যানেজার নিয়োগের কর্তৃত্ব এখন সরকারি দলের ছাত্রদেরই। এতে যে সাধারণ ছাত্রদের উপকার হয় তেমন নয়। সাধারণ ছাত্রের পয়সায় ভাগ বসিয়ে নেতাদের অনেকে ফ্রি খান। ম্যানেজারদের সঙ্গে গোপন ফয়সালা হওয়ায় ডাইনিংয়ে ডালের ঘনত্ব কমে যায়, মাংস আর মাছের টুকরো ছোট হতে থাকে।

এসব হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। পৃষ্ঠপোষক কেন্দ্রীয় নেতারা যে এসব জানেন না, তেমন নয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে লাঠিয়াল তো ঠিক রাখতে হবে। সবকিছুর পরও আমরা ভাবি, আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকরা যৌক্তিক আন্দোলনে মাঠে নামা শিক্ষার্থীদের ধমক না দিয়ে যদি দলীয় ছাত্রদের ধমক দিয়ে সুপথে আনতে পারতেন, তবে সব দিক থেকে ভালো হতো।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

shahnawaz7b@gmail.com

হাফ পাশ, কুয়েট ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
আপডেটঃ ৮ ডিসেম্বর, ২০২১ | ৭:৪৩ 110 ভিউ
ইচ্ছা ছিল বিজয়ের মাসে আজ মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে লিখব। কিন্তু চলমান কতগুলো ঘটন-অঘটন মনকে অস্থির করে তুলেছে। তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে হচ্ছে। দৃশ্যমান উন্নয়নের চাকচিক্যে আমরা আনন্দিত-আমোদিত। অনেকেই মনে করছি উন্নয়নের রেলগাড়ি ছুটছে সামনে, আর পেছনে তাকাতে হবে না। তেমনটি হলে এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা সরকারের উত্থান-পতন দেখেছি আমরা। মানতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো এমন স্বপ্নদ্রষ্টা আর দেখা যায়নি। তিনি শুধু উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখেননি-স্বপ্নকে বাস্তবের উঠোনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন এবং অনেকটা সাফল্যও দেখাতে পেরেছেন। কিন্তু সুশাসনের অভাব থাকায়, গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এবং রাজনীতিকে সংকীর্ণ দলতন্ত্র থেকে বের করে গণসম্পৃক্ত করতে না পারায়

উঠোনজুড়ে ঘুণপোকার বসত বিস্তার শুরু হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা ক্ষমতার দাপটে তা যেন ঠিক দেখতে পাচ্ছেন না। চকচকে ইমারত ক্রমে নোনাক্রান্ত হচ্ছে। এ ঔজ্জ্বল্য হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অশনি সংকেত দেখাচ্ছে। এ কারণে আমরা মনে করছি দেশের ক্ষমতাবান সংশ্লিষ্টদের দম্ভের অচলায়তন থেকে বেরিয়ে বাস্তবতার পৃথিবীতে নেমে আসা জরুরি। ২০১৮-এর পর আবার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছে। বলা যায় নামতে বাধ্য হয়েছে। সড়ক অবরোধ করছে, মানববন্ধন করছে। ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচনে রক্ত ঝরছে। দ্রব্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তেরও নাভিশ্বাস উঠছে। যাপিত জীবন কষ্টের হলে তাদের কাছে পদ্মা সেতু আর মেট্রোরেল তেমন গুরুত্ব পাবে না। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের নেতাদের অভব্য

ব্যবহারে কষ্ট পাওয়া কুয়েটের মেধাবী শিক্ষক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বিচারের দাবিতে ছাত্র-শিক্ষকরা প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন ক্যাম্পাসে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় বসলেও বোধগম্য কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এভাবে একে একে ছাইছাপা দিয়ে আগুন থামানোর চেষ্টা চলছে। এসবের কারণে সমালোচিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তদন্তের আলোকে শাস্তি দেওয়ার শক্তি পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের ৯ সদস্যকে। অর্থাৎ ছাত্রলীগের ঔদ্ধত্য প্রাথমিকভাবে আবারও প্রকাশ্যে এলো। এভাবে সার্বিক পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় না সরকার ও সরকারি দলের রাজনীতির সময়টা ভালো যাচ্ছে। এ সত্য সবাই মানেন

যে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করবেই। তখন ধমক দিয়ে বা কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে সবাইকে থামানো যাবে না। বরঞ্চ এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াই দেখতে হবে। আর একটি সংকট আছে আমাদের ক্ষমতাবান মানুষদের। পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে সবকিছুর পেছনে বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্রের থিউরি আওড়াতে থাকেন। নিজ রাজনৈতিক দলের মানুষ এসবে সান্ত্বনা পেলেও ভুক্তভোগী মানুষকে বিভ্রান্ত করা কঠিন হবে। এটিও ঠিক, এদেশের রাজনীতির ধরন এমন যে, স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সরকার কিছুটা বিব্রত হলে সেই সুযোগ থেকে বিরোধী দল ফসল তোলার চেষ্টা করে। অনেক সময় উসকে দিয়ে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে চায়। সেই জায়গাটিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করার কথা সরকারি দল ও

সরকারের। তার বদলে মূল দাবিকে পাশ কাটানো ক্ষতির কারণ হিসাবে দেখা দিতে পারে। এই যে বাসে হাফভাড়া নেওয়ার দাবিতে ছাত্র আন্দোলন-একে নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যেতে সরকারের অনেক বেশি দেরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করেন, ব্যবসায়ীবান্ধব সরকার যতটা পরিবহণ মালিকের স্বার্থ দেখে ততটা সাধারণ মানুষের নয়। একপর্যায়ে ঘোষণা এলো সরকারি বিআরটিসির বাসে হাফভাড়া চলবে। কিন্তু সরকার বেসরকারি বাসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক স্বস্তি পায়নি। কারণ তারা জানেন হাতে গোনা অল্প কিছু সরকারি বাস রাজধানীতে চলাচল করে। এ সিদ্ধান্ত তাই কাউকে স্বস্তি দিতে পারেনি। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিকরা ছাত্রদের জন্য শর্তযুক্ত করে হাফ পাশে রাজি হলেও

শুধু ঢাকাতে কার্যকর ও শর্তের বেড়াজাল থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলো না। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বাসমালিক সমিতি থেকে ঘোষণা আসে সব নগরীতে ছুটির দিন ছাড়া হাফভাড়া ১১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। গাড়ির মালিক এবং চুক্তিতে নেওয়া চালকদেরও সংকট আছে। তাদের নানা সমিতি আর পুলিশকে চাঁদা দিতে লভ্যাংশের অনেকটা চলে যায়। তাই হাফ ভাড়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত আসতে স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট হবে। সরকার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে এ ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারত। এমন অবস্থা সৃষ্টি হলে মালিক বা চুক্তিতে গাড়ি নেওয়া চালক সবাই হাফভাড়া নেওয়ার ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন। কিন্তু সবাই জানেন, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইচ্ছা বা ক্ষমতা

কোনো সরকারের ছিল না। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদের স্লোগানকে এড়িয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সরকারি দুর্বলতার প্রমাণ। প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চাপায় মৃত্যুর সংখ্যা বড় হচ্ছে। সেখানে যদি দায়িত্বশীল জায়গা থেকে চালকদের শাসন না করে বলা হয় চলন্ত গাড়ির সামনে হাঁটাহাঁটি করা মানুষ গাড়ি চাপা পড়ছে, তবে আর সান্ত্বনার জায়গা কোথায় থাকে! এই যে বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে শুরু করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্লাকার্ডেও লেখা আছে চুক্তি পদ্ধতি বাতিল করে চালক ও সহকারীদের বেতনভুক্ত চাকরিতে নিয়োগদানের মাধ্যমে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে, তাতে তো সরকার গা করছে না। অর্থাৎ মালিকদের স্বার্থের বাইরে যাওয়া যাবে না। আমরা বুঝি না এভাবে গণবিচ্ছিন্ন হওয়াকে মেনে নিচ্ছে কেন সরকার ও

সরকারি দল। আওয়ামী লীগ তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে বেড়ে ওঠা দল। তাদের তো জানা উচিত নতুন প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের আবার পথে নামতে হয়েছে। ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে এ আন্দোলনে অভিভাবক, শিক্ষক অর্থাৎ সাধারণ মানুষের সায় রয়েছে। তাই সরকারি ভূমিকায় দূরদর্শিতার ছাপ থাকা বাঞ্ছনীয়। সড়ক নিরাপদ করতে সরকারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে বলেই তো শিক্ষার্থীদের পথে নামতে হয়েছে, রাজনৈতিক বক্তব্য বাদ দিয়ে এসব সত্য বিবেচনায় এনে কাজ করা উচিত। সবচেয়ে ভালো হতো এমন একটি আন্দোলনে ছাত্রলীগ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহমত পোষণ করে নিজেদের যুক্ত করতে পারত। বিশেষ করে যেখানে আন্দোলনের দাবিগুলো সরকারবিরোধী নয়, সরকারের কাছ থেকে প্রতিকার চাওয়া। আর দাবিগুলোও শিক্ষার্থী তথা জনবান্ধব। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ছাত্রলীগ এখন আর ছাত্র কল্যাণমুখী সংগঠন নয়। এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রভু হয়ে থাকতে চায়। ছাত্রদল, ছাত্রসমাজ, ছাত্রলীগ কোনো পৃথক চরিত্রের প্রকাশ দেখায়নি। শিক্ষা, সংস্কৃতির জগতের কোনো কাজে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতাদের ভূমিকা রাখতে সাধারণত দেখা যায় না। তাদের পাওয়া যায় মতে না মিললে সতীর্থদের ওপর নির্যাতন করতে, ঠিকাদার থেকে শুরু করে ডাইনিংয়ের ম্যানেজারের কাছ থেকে টুপাইস কামাই করতে। শিক্ষকদের প্রতি দুর্ব্যবহার ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে। এরই একটি দুঃখজনক পরিণতি দেখা গেল কুয়েটে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের আলোকে ছাত্রলীগ নেতাদের শাস্তি দেওয়ার কথা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষকের সঙ্গে প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহারের ভিডিও প্রচার পাওয়ায় কুয়েটের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতিবাদকে হালকা করে নেওয়ার উপায় নেই। কুয়েট ছাত্রলীগের অনাচারের আরও তথ্য দিন দিন উন্মোচিত হচ্ছে। কুয়েটের এক হলে ডাইনিংয়ের ম্যানেজার নিয়োগে ছাত্রলীগের ইচ্ছাপূরণ না হওয়ায় লাঞ্ছিত হতে হয়েছে শিক্ষককে। সাধারণ পাঠকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে, ডাইনিংসহ হলের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ তো করবে হল প্রশাসন। তাহলে এখানে ছাত্রলীগের ছেলেরা নাক গলাচ্ছে কেন? তাদের অবগতির জন্য জানাই, আমরা যারা কাছে থেকে দেখছি-দেখে আসছি তারা জানি এখন আর সেই দিন নেই। হল প্রশাসনে থাকা শিক্ষকদের পদ এখন অনেকটা আলংকারিক পদ। হলে সিট বরাদ্দ, ডাইনিং হল, ক্যান্টিনের ক্যাটারার বা ম্যানেজার নিয়োগের কর্তৃত্ব এখন সরকারি দলের ছাত্রদেরই। এতে যে সাধারণ ছাত্রদের উপকার হয় তেমন নয়। সাধারণ ছাত্রের পয়সায় ভাগ বসিয়ে নেতাদের অনেকে ফ্রি খান। ম্যানেজারদের সঙ্গে গোপন ফয়সালা হওয়ায় ডাইনিংয়ে ডালের ঘনত্ব কমে যায়, মাংস আর মাছের টুকরো ছোট হতে থাকে। এসব হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। পৃষ্ঠপোষক কেন্দ্রীয় নেতারা যে এসব জানেন না, তেমন নয়। কিন্তু ক্যাম্পাসে লাঠিয়াল তো ঠিক রাখতে হবে। সবকিছুর পরও আমরা ভাবি, আমাদের সম্মানিত রাজনীতিকরা যৌক্তিক আন্দোলনে মাঠে নামা শিক্ষার্থীদের ধমক না দিয়ে যদি দলীয় ছাত্রদের ধমক দিয়ে সুপথে আনতে পারতেন, তবে সব দিক থেকে ভালো হতো। ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় shahnawaz7b@gmail.com

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:


































শীর্ষ সংবাদ:
নিয়োগে দুর্নীতি: জীবন বীমার এমডির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা মিহির ঘোষসহ নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবীতে গাইবান্ধায় সিপিবির বিক্ষোভ গাইবান্ধায় সেনাবাহিনীর ভূয়া ক্যাপ্টেন গ্রেফতার জগন্নাথপুরে সড়ক নির্মানের অভিযোগ এক ঠিকাদারের বিরুদ্ধে তারাকান্দায় অসহায় ও দুস্থদের মাঝে ছাত্রদলের খাবার বিতরণ দেবহাটায় অস্ত্র-গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার আটক -১ রামগড়ে স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বাগমারায় ভেদুর মোড় হতে নরদাশ পর্যন্ত পাকা রাস্তার শুভ উদ্বোধন সরকারি বিধিনিষেধ না মানায় শার্শায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা আদায় মধুখালীতে তিন মাসে ৪৩ টি গরু চুরি গাইবান্ধায় বঙ্গবন্ধু জেলা ভলিবল প্রতিযোগিতার উদ্বোধন গাইবান্ধায় শীতবস্ত্র বিতরণ রাজশাহীতে পুত্রের হাতে পিতা খুন বাগমারায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী গ্রেপ্তার রামগড়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার শীতবস্ত্র বিতরণ করেন ইউএনও ভাঃ উম্মে হাবিবা মজুমদার জগন্নাথপুরে জুয়ার আসরে পুলিশ দেখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ এক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় সিপিবি নেতা মিহির ঘোষসহ ৬ জন কারাগারে পিআইও’র মানহানির মামলায় গাইবান্ধার ৪ সাংবাদিকসহ ৫ জনের জামিন গাইবান্ধায় প্রগতিশীল ছাত্র জোটের মানববন্ধন চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনালী ব্যাংক লি. গোমস্তাপুর শাখায় শীতবস্ত্র বিতরণ