ঢাকা, Sunday 24 October 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সঙ্কটের শেষ নেই নগর জীবনে

প্রকাশিত : 09:23 AM, 13 March 2021 Saturday
50 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

বসন্ত শেষে চৈত্রের খরতাপ হাতছানি দিচ্ছে প্রকৃতি। বাড়ছে গরমের তীব্রতা। প্রকৃতি বদলের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিক সঙ্কটও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এখন অন্তত ১১ ধরনের সঙ্কটের মুখোমুখি নগরীর প্রায় দুই কোটি মানুষ। সবচেয়ে বড় সমস্যা ধুলো আর বায়ু দূষণ। রাজধানীর ৫০ ভাগ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া। দিন দিন এর ভয়াবহতা মাত্রা ছাড়াচ্ছে। অনুপযোগী করে তুলছে বসবাসের পরিবেশ। ধূলি দূষণের পাশাপাশি শব্দ ও বায়ু দূষণে বিশ্বে শীর্ষ ৪০০ বছরের বেশি পুরনো এই নগরের অবস্থান।

বছরজুড়ে উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়িতে চরম দুর্ভোগ এখন নিত্যসঙ্গী। ভাঙ্গাচোরার পাশাপাশি দখলে সড়ক আর ফুটপাথ। নতুন উপদ্রব হয়ে যুক্ত হয়েছে মশার যন্ত্রণা। নানা

রকম উন্নয়ন প্রকল্প হলেও গাড়ি ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না হওয়ায় যানজট যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে। সড়কে বিশৃঙ্খলা আগের মতোই। রাজধানীর অনেক এলাকায় এখনও চলছে গ্যাস সঙ্কট। দিনের অনেক সময় গ্যাসের চাপ কম থাকে। গরম যত বাড়বে দৃশ্যমান হবে পানি সমস্যার। এর বাইরে যেখানে সেখানে ময়লা, আবর্জনা তো আছেই। নগরীর ড্রেনগুলোও যেন ময়লার ভাগাড়। দুর্গন্ধ অথচ সৌন্দর্যবর্ধনে রাজধানীতে চলছে নানা প্রকল্প। বাস্তবে সৌন্দর্যের বদলে সঙ্কটের চিত্রগুলোই বেশি চোখে পড়ার মতো।

তবে চলমান এসব সঙ্কটের কথা স্বীকার করেছেন সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও। তারা বলছেন, ৪০০ বছরের পুরনো এই শহরটি একেবারেই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। কোন সরকারই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকাকে সাজানোর চিন্তা

করেনি। যার প্রেক্ষিতে সঙ্কট দিন দিন বাড়ছে। কখনও কখনও অসহনীয় করে তুলছে। সমাধানে যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে অনেকের মতে তাও যথার্থ নয়। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, আপৎকালীন সব সঙ্কটের ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। স্থায়ীভাবে কোনটির প্রতিকার মিলছে না। ফলে কোনটিই পরিপূর্ণ নিরসন হচ্ছে না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নগর বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, রাজধানীর মানুষের জীবন চলায় সঙ্কটের কোন শেষ নেই। যেসব সমস্যার প্রতিদিন মুখোমুখি হতে হচ্ছে সেগুলোও নিরসন করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ কোন সমস্যা ধরে একেবারে নিরসনের উদ্যোগ নেই। ঢাকামুখী মানুষের স্রোত কমানো ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণসহ প্রতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ না করে একের

পর এক যানজট নিরসনে প্রকল্প নিলে কোনদিনই ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। তেমনি অন্যান্য সমস্যার ক্ষেত্রে একই ফলাফল আসবে।

নগর বিশ্লেষক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকা সিটিকে উন্নত সিটি কিংবা সিঙ্গাপুরের পর্যায়ে নিয়ে যেতে আমার দৃষ্টিতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে। তবে সবার আগে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। সবার জন্য সমান হতে হবে আইন। নগর সরকারের অধীনে ৪৫টি সেবা সংস্থাকে নিয়ে আসতে হবে। এক ছাতায় রাখতে হবে তাদের।

৫০ ভাগ বাতাস দূষণ করছে কালো ধোঁয়া ॥ যানবাহনের কালো ধোঁয়া যে পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে তা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু

এ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক গবেষণা আরও ভয়াবহ কিছু সামনে এনেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ ইউনিটের গবেষণার গত বছরের জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০ শতাংশ বায়ু দূষণের জন্য দায়ী যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া। মূলত তরল জ্বালানি পোড়ানোর মাধ্যমে তৈরি হওয়া ধোঁয়া এর জন্য দায়ী। গত এক যুগ ধরে ঢাকার বায়ু দূষণের প্রধান উৎস হিসেবে ইটভাঁটিকে মনে করা হতো অথচ মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হলে তা জরিমানাসহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু রাজধানীর সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কালো ধোঁয়া ছড়ানো যানবাহন। একসময় কালো ধোঁয়া বন্ধে নিয়মিত অভিযান চলত।

গত বছরের মার্চে করোনার সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে অভিযান খুব একটা হচ্ছে না কিন্তু যানবাহন যে অবাধে কালো ধোঁয়া ছাড়ছে সড়কে বের হলেই তা চোখে পড়ার মতো।

যানবাহনের কালো ধোঁয়া বন্ধের বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতরের আর যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। কিন্তু যানবাহনের কালো ধোঁয়ার দূষণের মাত্রা পরিমাপ করার মতো কোন যন্ত্র বিআরটিএর কাছে নেই। ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের পরিবেশ সার্কেল থাকলেও কালো ধোঁয়া বন্ধে তাদের কোন কার্যক্রম নেই। ঢাকা মহানগর পুলিশেরও কালো ধোঁয়ার দূষণের মাত্রা পরিমাপের কোন যন্ত্র নেই।

মশায় অতিষ্ঠ মানুষ ॥ ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা নগরের মশা

মারতে ব্যর্থ হওয়ায় মশারি টানিয়ে অভিনব প্রতিবাদ জানিয়েছে ভাড়াটিয়া পরিষদ। শুক্রবার প্রেসক্লাবের সামনে এই অভিনব প্রতিবাদ জানানো হয়। মানববন্ধনে আধা ইঞ্চি মশা মারতে দুই মেয়র ব্যর্থ দাবি করে অবিলম্বে মশার উপদ্রব থেকে রাজধানীবাসীকে রক্ষার দাবি জানানো হয়। একদিকে মশার যন্ত্রণায় প্রতিবাদ যেমন চলছে তেমনি মশা মারতে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।

দুই সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার বক্সকালভার্ট ও কাভার্ড ড্রেন রয়েছে। যেগুলোতে দুই সিটি মশার ওষুধ ছিটাতে পারে না। আর প্লাস্টিক দ্রব্যসামগ্রী, পলিথিন, ডাবের খোসাসহ বিভিন্ন আবর্জনায় এই ড্রেনগুলো ভরাট থাকে। যে কারণে ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয় না। জমে থাকা এসব

পানিতে কিউলেক্স ভয়াবহরূপে বংশবিস্তার করছে।

চলতি অর্থবছরে মশক নিধন প্রকল্পে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ৭৭ কোটি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। মশক নিয়ন্ত্রণে গত দুই মার্চ কাউন্সিলরদের সঙ্গে সভা করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি আগামী ৮ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকায় কিউলেক্স মশা নিধনে ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরুর কথা জানান।

আর মশক নিধন কার্যক্রমে কৌশলগত ভুলের কারণেই মশার উপদ্রব বেড়েছে বলে স্বীকার করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপটা যেহেতু ছিল সেহেতু সেই

কার্যক্রমটা ডিসেম্বর পর্যন্ত চালিয়ে নেয়া আসলে সেটা ভুল ছিল, সেই কৌশলটা ভুল ছিল। আমাদের দেশে শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে কিউলেক্স মশার বিরুদ্ধে কার্যক্রম হাতে নেয়া উচিত ছিল।

মশার উপদ্রব বাড়ার কথা স্বীকার করে জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে বাস্তবতা মেনে নিতে আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। বলেন, এ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশা ডেঙ্গুর মতো বিপজ্জনক নয় সুতরাং আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। খালবিল পরিষ্কার-পরিছন্নতা করা হবে তখন এটি আমরা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হব আশা করি।

ভাঙ্গাগড়ায় ফুটপাথ-সড়ক ॥ রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত ধানম-ি। এই এলাকার বেশিরভাগ সড়ক কাটা

হয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু সেবা সংস্থাগুলো কাজ শেষ করে আর মেরামত করেনি। ২৭ নম্বরসহ বেশিরভাগ সড়কে এখন ধুলো আরও ধুলো। ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে গাছাপালা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত। এ নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষেভের শেষ নেই। কমলাপুর, ফকিরাপুল, বাসাবো, পীরজঙ্গী মাজার রোড, কাকরাইল, বাড্ডা, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা কাটা দেখা গেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, খামারবাড়ি মোড় থেকে ফার্মগেট, বাংলামোটর, শাহবাগ এলাকায় ফুটপাথ ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। সরানো হয়েছে সড়কবাতি। বন্ধ করা হয়েছে কারওয়ানবাজারের আন্ডারপাস প্রজাপতি গুহা। দোয়েল চত্বর থেকে হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত রাস্তায় চলছে উন্নয়ন কাজ। প্রেসক্লাবের সামনে থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত রাস্তায় চলছে

উন্নয়ন কাজ। ফুটপাথ এবং রাস্তার মাঝখানে ঘিরে চলছে কর্মযজ্ঞ। ব্যস্ত এ সড়কে যানজটের ফাঁকে যাতায়াত করছে মানুষ। ভাঙ্গা হয়েছে ফুটওভার ব্রিজও। আর দৈনিক বাংলা থেকে মতিঝিল হয়ে ইত্তেফাক মোড় পর্যন্ত গুলিস্তানের আশপাশের সব ফুটপাথ হকারদের দখলে। একই চিত্র মৌচাক ও মালিবাগে। আর বাংলামোটর, পরিবাগ, নিউ ইস্কাটনের ফুটপাথের কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব নয়। নানা রকম বাণিজ্য চলে এসব চলার ফুটপাথজুড়ে। তেমনি রাস্তাতেও চলে বাহারি ব্যবসা। বাসাবো থেকে মালিবাগ পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে অনেক স্থানের ফুটপাথ ভেঙ্গেচুড়ে খানখান হয়ে গেছে।

দূষণের শহর ॥ বায়ু দূষণের শহর হিসেবে ঢাকা মাঝে-মধ্যেই বিশ্বের মধ্যে শীর্ষস্থানে চলে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দূষণ চলতে থাকলে

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন ঢাকার বাসিন্দারা। এতে বাড়ছে চর্মরোগ, ফুসফুস ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুতে ছয় ধরনের পদার্থ ও গ্যাসের কারণে দূষণের মাত্রা বেড়েছে। এর মধ্যে সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন, কার্বন মনোঅক্সাইড, সিসা এবং দুটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা, যেগুলো খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলোর উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই বায়ু মান যাচাই করা হয়। আর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই পদার্থগুলোই শরীরে প্রবেশ করে। ফলে শুরুতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, বায়ু দূষণের কারণে এমনিতে ফুসফুসের ক্ষতি হয়। এর ফলে ব্রংকাইটিস, হাঁপানিসহ বড় অসুখ যেমন হতে পারে, তেমনি ঠান্ডা-জ্বর, সর্দিকাশি, নিউমোনিয়ার মতো অসুখও হতে পারে। এতে

ফুসফুস দুর্বল হয়ে যায়।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় বর্তমানে উন্নয়ন কাজ বেশি হচ্ছে। চলছে রাস্তার উন্নয়ন কাজ, বাড়ি স্থাপন, একই সঙ্গে ঢাকা শহরের আশপাশে গড়ে উঠেছে ইটের ভাঁটি। এসব কাজে বায়ু দূষণ রোধ বা কমানোর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা নিচ্ছে না। একই সঙ্গে তদারককারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে বায়ু দূষণে শীর্ষে উঠে আসছে রাজধানী ঢাকা। সাধারণত কয়েকটি প্রধান উপায়ে বায়ু দূষণ হচ্ছে। সেগুলো হলো- ঢাকা শহরে চলমান পুরনো গাড়ি। সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজ। শহরের আশপাশে ইটভাঁটি ও শিল্প-কলকারখানার দূষণ। শহরের ভেতরে জমা ময়লা-আবর্জনা পোড়ানোর

ধোঁয়া।

বিশৃঙ্খল গণপরিবহন ॥ গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা নতুন কিছু নয়। বাস্তব চিত্র হলো নানামুখী উদ্যোগেও সড়কে কোন পরিবর্তন আসেনি। রাস্তায় যানবাহনে রেষারেষি, স্টপেজের বাইরে যত্রতত্র যাত্রী তোলা, বাড়তি ভাড়া আদায়, চলন্ত গাড়ি থেকে যাত্রী নামিয়ে দেয়াসহ আগের সব স্বেচ্ছাচারিতাই চলছে সমানতালে। যাত্রীরাও রাস্তায় নেমে যেন স্বেচ্ছাচারী হয়ে যান। ফুটওভারব্রিজ এড়িয়ে চলা, চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে মাঝ রাস্তায় দৌড়-সবকিছু চলছে সমানতালে। সেইসঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা তো আছেই। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কঠোর নজরদারি ও নতুন সড়ক পরিবহন আইনের দৃঢ় বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সড়ক পরিবহনের এই নজিরবিহীন নৈরাজ্য বন্ধ হতে পারে।

হাঁটার অনুপযোগী রাস্তা ॥ রাজধানীতে হাঁটার পরিবেশ উন্নত করার বিষয়টি

উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। হাঁটার জন্য অবকাঠামো অর্থাৎ ফুটপাথ, সমতলে রাস্তা পারাপারে ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা এবং গলি রাস্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। বিদ্যমান ফুটপাথগুলোও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি নজর দেয়া হয় না। এ জন্য হাঁটতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, রাজধানীর ফুটপাথগুলো শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব পথচারীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফুটপাথে বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী, অবৈধ পার্কিং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের একটি বড় অন্তরায়। যেসব এলাকায় ফুটপাথ আছে তাও নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সব পথচারীর জন্য ব্যবহার উপযোগী

নয়। সব এলাকায় ফুটপাথ থেকে প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রশস্ত ফুটপাথ পথচারীদের জন্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, ইটভাঁটি বন্ধে অভিযান চলছে। এরপরের অনেক কারণ নিয়ে আমরা সিটি কর্পোরেশন ও বিআরটিএ’র সঙ্গে আলোচনা করেছি। সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে রাস্তার পাশে ময়লা রাখা, ঝাড়ু দেয়া, নির্মাণাধীন ভবনের ময়লা, হাসপাতালের বর্জ্যসহ যাবতীয় আবর্জনা সরানো ও পরিষ্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তারা আমাদের জানিয়েছে নিয়মিত মনিটরিং করছে।

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম নাজেম বলেন, রাজধানী চারদিকের যে পানির উৎস রয়েছে সেগুলো একদিকে যেমন দূষিত, অন্যদিকে এই জলাশয়গুলো নানা ধরনের রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ে। যার মধ্যে পানিবাহিত নানা রোগ ছাড়াও

উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মশা, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বিস্তার। তবে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে করেন তিনি।

শব্দের ভয়াবহতা ॥ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনে ৫৫ ডেসিবল, রাতে ৪৫ ডেসিবল হওয়া উচিত; বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ আর রাতে ৫৫ ডেসিবল; শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডেসিবল আর রাতে ৬৫ ডেসিবলের মধ্যে শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। অন্যদিকে হাসপাতাল বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০ আর রাতে ৪০ ডেসিবল শব্দ মাত্রা থাকা উচিত।

বেসরকারী সংস্থা ‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ’ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্ট ঢাকা শহরের ১০টি স্থানের শব্দ পরিমাপ করে দেখেছে। ঢাকায় নির্ধারিত মানদন্ডের চেয়ে প্রায় দেড়গুণ বেশি শব্দ সৃষ্টি হয়।

জরিপে দেখা গেছে, উত্তরার শাহজালাল এভিনিউতে শব্দ মাত্রা সর্বোচ্চ ৯৩ দশমিক ৫ ডেসিবল, মিরপুর ১-এ সর্বোচ্চ ৯৬ ডেসিবল, পল্লবীতে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ৫ ডেসিবল, ধানমন্ডি বালক বিদ্যালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ১০৭ দশমিক ডেসিবল, ধানমন্ডি ৫ নম্বর সড়কে সর্বোচ্চ ৯৫ দশমিক ৫, নিউমার্কেটের সামনে ১০৫ দশমিক ১, শাহবাগে সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৩ এবং সচিবালয়ের সামনে সর্বোচ্চ ৮৮ ডেসিবল। অর্থাৎ ঢাকা শহরের গড় শব্দমাত্রা ১০০ ডেসিবল যা খুবই আতঙ্কজনক।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ-দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালায় সুস্পষ্ট করে আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বিধি

অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়ের সামনে এবং আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো, মাইকিং করা, সেই সঙ্গে সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে জোরে শব্দ সৃষ্টি করা আইনত দন্ডনীয়। এই আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদন্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই আইনের তেমন কোন প্রয়োগ জনসম্মুখে লক্ষ্য করা যায় না।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ কর্মী ডাঃ লেনিন চৌধুরী বলেন, সম্প্রতি আমেরিকার ল্যাবে পরীক্ষার পর ওয়াসার

পানিতে বিষাক্ত পদার্থ পাওয়া গেছে। তার মানে হলো এই শহরের পানিতে দূষণ থাকছে। বাতাসে বায়ুমান অনেক সময় বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে। সড়কের চারপাশে পরিচ্ছন্নতার অভাবে দূষণ তো আছেই। হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে সবখানেই শব্দের ভয়াবহতা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT