রাষ্ট্রপতির সংলাপে নতুন কোনো বার্তা পাওয়া যাবে কি? – ডোনেট বাংলাদেশ

রাষ্ট্রপতির সংলাপে নতুন কোনো বার্তা পাওয়া যাবে কি?

মুঈদ রহমান
আপডেটঃ ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১ | ৯:৫৭ 112 ভিউ
আগামীকাল ২০ ডিসেম্বর নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সংলাপ শুরু করবেন। দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯। ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে রাষ্ট্রপতির এই সংলাপের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এটি একটি প্রক্রিয়ামাত্র। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেনমাত্র। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিএনপির সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে সংলাপ শুরু করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। সেসময়ে এক মাস চলা সংলাপে দেশের ৩১টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় যা দেখা যায় তা হলো, মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান করে একটি সার্চ কমিটি গঠন করে দেন। সেই সার্চ কমিটি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে কমিশনের সদস্য হিসাবে পাঁচটি নাম প্রস্তাব আকারে আহ্বান করেন। দলগুলো লিখিতভাবে নাম প্রস্তাব করার পর সার্চ কমিটি তা যাচাই-বাছাই করে ১০ জনের একটি শর্টলিস্ট তৈরি করে রাষ্ট্রপতি বরাবর পাঠান। রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াটি এভাবেই হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠিত হবে, তা সংবিধানে স্পষ্ট করেই উল্লেখ আছে। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ এই যে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, গত ৫০ বছরের কোনো সরকারই নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। প্রতিটি সরকারই কমিশন গঠনের সুবিধাটুকু নিজের হাতে রেখেছে। প্রতিটি সরকারই চায় রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে নিজেদের লোকদের কমিশনে নিয়োজিত করতে। তাই বর্তমান সংলাপ একটি ধারাবাহিকতামাত্র। আসছে সংলাপ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব বলেছেন, ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য, শক্তিশালী ও কার্যকর একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসছেন।’ প্রেস সচিবের বক্তব্যে উল্লিখিত শব্দকটি কাক্সিক্ষত ও আশাজাগানিয়া। কিন্তু মর্মাহত হওয়ার কারণ হলো শব্দগুলো শুধু বক্তব্যেই থেকে যায়, বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না। তারপরও আমাদের আশার ওপরই ভর করতে হবে। কারণ সব হারানো মানুষের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হলো ‘আশা’। আমরা সব হারিয়ে ওই আশাটুকু নিয়েই রাতে ঘুমাতে যাই। সংলাপের ক্ষেত্রে গেলবারের চেয়ে এবার কৌশলগত কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। সংলাপের প্রথম দিনে ডাকা হয়েছে সরকারের বিরোধীদলীয় মিত্র জাতীয় পার্টিকে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের সংলাপে প্রথম রাজনৈতিক দল ছিল বিএনপি। বর্তমান সময়ে বিএনপির যে রাজনৈতিক অবস্থান, তাতে সংলাপে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সংশয় আছে। দলের উপর মহল থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, তারা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ছাড়া কোনো ধরনের নির্বাচনে যাবে না। সেক্ষেত্রে সংলাপে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকছে না। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি পেলে তা স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাই রাষ্ট্রপতিও চাইবেন এমন দলকে দিয়ে আলোচনা শুরু করতে, যাতে করে সংলাপের গতি ব্যাহত না হয়। এ কারণেই বোধকরি জাতীয় পার্টিকে দিয়ে সংলাপ শুরু করতে চাওয়া হচ্ছে। বর্তমান সময়ে বিএনপির চেয়ে জাতীয় পার্টি সরকারের কাছে অধিকতর নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক সন্দেহ নেই। সর্বশেষ দল হিসাবে আওয়ামী লীগকে ডাকার আগে হয়তো বিএনপির ডাক পড়বে। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এ রকম একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশে কার্যরত আছে এবং প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে করেছে বিতর্কিত। তবে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতা আকাশচুম্বী। কারণ এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটি সরাসরি জড়িত। সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত থাকার কথা। কিন্তু বিগত দিনের কার্যকলাপ থেকে তা অনুধাবন করা অসম্ভব। আমাদের দেশের অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিধিতে ভিন্নতা আছে। কেবল আর্থিকভাবে স্বচ্ছ হলেই কমিশন পরিচালনা করা যায় না। কালোকে কালো এবং সাদাকে সাদা বলার মতো সৎ সাহসের ভীষণ প্রয়োজন এই কমিশনে। নির্বাচনি কাজে সরকারের যে কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করার দৃঢ়তা একজন নির্বাচন কমিশনারের থাকতে হয়। তা করতে ব্যর্থ হলে কিংবা নিরুপায় হলে স্বেচ্ছায় পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো সৎ মানসিকতার অধিকারী হতে হয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিগত পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ডে এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ছিটেফোঁটাও দেখতে পাইনি। এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে নির্বাচনে বিশ্বের মানুষ যে নেতিবাচক দিকটি দেখতে পেয়েছে, নির্বাচন কমিশন তার কানাকড়িও দেখতে পায়নি। এত ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন নির্বাচন কমিশন দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না। আরেকটি ব্যাপার হতে পারে যে, দেখেছে কিন্তু সত্যটা স্বীকার করতে পারেনি। তাহলে এতখানি দুর্বল চরিত্র নিয়ে কি কমিশন পরিচালনা করা যায়? বস্তুত একটি গণতান্ত্রিক দেশে যতটা শক্তিশালী নির্বাচনি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তার ধারেকাছেও আমরা যেতে পারিনি। নির্বাচন কমিশন যা করে থাকে তা হলো, সরকারি দলকে একটি কাগজে-কলমে ম্যান্ডেট দেওয়ার ব্যবস্থা। এতে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারল কি পারল না, তা বিবেচনা করার সময় নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকে না। বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই যে জবাবদিহিবিহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনিব্যবস্থা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রপতির সংলাপ, তা কতটা কার্যকর হবে? কেবল একটি নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমেই কি দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতিচর্চা শুরু করা যাবে? সাধারণ মানুষ তা মনে করেন না। শাসক দলের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে কোনো কমিশনই কোনো কাজে আসবে না। অন্তত বিগত দিনের অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘সংলাপ অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে বলেই মনে হচ্ছে। আশা করতে হয় অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে। অতীত অভিজ্ঞতা হলো নতুন এই পদ্ধতিতে আসা দুটি কমিশনই ব্যর্থ। এ দুটি কমিশন নির্বাচনিব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছে, মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেছে। একই পদ্ধতিতে আরেকটি কমিশন গঠনের আগে বলতে হবে, নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংসের দায় কে নেবে? নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগকর্তা, নাকি যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা, নাকি উভয় পক্ষ?’ সরকারি দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছা উপেক্ষা করা রাষ্ট্রপতির পক্ষে সম্ভব নয়। তাই যদি হয়, তাহলে সংলাপের ভেতর দিয়ে সে ইচ্ছাই পূরণ করা হবে, নতুন কিছু আশা করা যায় না। নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের যে কথা সংবিধানে বলা আছে, তা অধরাই থেকে যাবে। বর্তমান প্রক্রিয়ায় একই ধরনের কমিশন আসবে এবং কার্যকলাপও একই ধরনের হবে, কেবল সময়ক্ষেপণই সারা। মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:



































শীর্ষ সংবাদ:
বেনাপোল সীমান্তে সচল পিস্তলসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রেফতার নির্মাণসামগ্রীর দাম চড়া, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি কলম্বোতে কারফিউ জারি টিকে থাকার লড়াইয়ে ছক্কা হাকাতে পারবেন ইমরান খান? করোনায় আজও মৃত্যুশূন্য দেশ, শনাক্ত কমেছে ‘ততক্ষণ খেলব যতক্ষণ না আমার চেয়ে ভালো কাউকে দেখব’ এবার ইয়েমেনে পাল্টা হামলা চালাল সৌদি জোট স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালিতে যুবলীগ নেতার মৃত্যু সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র রপ্তানি করেছে মোদি সরকার বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে ফুল দেওয়া নিয়ে আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, এলাকা রণক্ষেত্র ইউক্রেনকে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও মেশিনগান দিয়েছে জার্মানি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে নারীকে ধর্ষণ, অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৩ ইউরো-বাংলা প্রেসক্লাবের ‘লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বজুড়ে আনবে একতা‘-শীর্ষক সভা বঙ্গবন্ধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নওগাঁর নওহাঁটায় স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন । ভূরুঙ্গামারীতে ব্যাপরোয়া অটোরিকশা কেরে নিল শিশুর ফাহিম এর প্রাণ ভূরুঙ্গামারী কিশোর গ‍্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আহত যশোরিয়ান ব্লাড ফাউন্ডেশন এর ৬ তম রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন বেনাপোলে পৃথক অভিযানে ৫২ বোতল ফেনসিডিল সহ আটক-২ বেনাপোল স্থলপথে স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমন নিষেধ গেরিলা যোদ্ধা অপূর্ব