ঢাকা, Thursday 23 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

রক্তভেজা মাটিতে নতুন ফসল, নিঝুম স্থাপত্য

প্রকাশিত : 09:55 AM, 31 December 2020 Thursday
76 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

চুকনগরে কিছু আর নেই। আগেই তা জানা ছিল। এর পরও ঢাকা থেকে বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছতেই অবাক হতে হলো। আসলেই কিছু নেই! মূল এলাকাটি এখন ফসলের উর্বর ভূমি। দেদার সবজি চাষ হচ্ছে। মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে হলুদ শর্ষে ফুল। সরু আলপথের ধারে বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে আছে দু’একটি তালগাছ। আরও একটু দূরে তাকালে বাড়ি-ঘর। বসতি।

সব দেখে সময়টাকেই ভিলেন মনে হয়। হায় সময়! এভাবে অতীত ভুলিয়ে দিতে পার তুমি? আজকের চুকনগর দেখে কে বলবে, কোন এক দুঃসহকালে এখানকার সবুজটুকু রক্তে ডুবে গিয়েছিল! মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল খাল বিল জলাশয়! দুই দশ জন নয়।

৫০ বা ১০০ জনও নয়। ১০ থেকে ১২ হাজার নিরীহ নির্দোষ মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়েছিল! ১৯৭১ সালে বর্বর এই গণহত্যা চালায় পাকহানাদার বাহিনী। আজও পৃথিবীর গণহত্যার ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম উদাহরণ হয়ে আছে চুকনগর।

না, এখন আর মাটিতে রক্তের দাগ নেই। বিলের ঝিলের পানিতে লাশ ভাসছে না। তবে ইতিহাসটি যারা জানেন, যারা বইয়ে কম বেশি পড়েছেন তারা অসীম শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়েই সময়টাকে অনুভব করতে পারবেন। কিছুই নেই। তবুও আছে বলে মনে হয়। শহীদের রক্তে ভেজা ভূমি থেকে জন্ম নেয়া ফসল গণহত্যার সাক্ষ্য দিচ্ছে, কান পাততে জানলে ঠিক শুনবেন আপনি। এখনও মাটির নিচে রয়ে গেছে অসহায় নর নারীর

শিশুর কঙ্কাল। হাড়গোড়। মাটিতে খালি পায়ে দাঁড়ালে শরীর তাই বুঝি কেঁপে ওঠে। নিজের অজান্তেই ভিজে যায় চোখের পাতা। মন আপনি গেয়ে ওঠে! মুক্তির মন্দির সোপান তলে/কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে…।

চুকনগর খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত। এর সন্নিকটে ভারত সীমান্ত। ১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকে পাক হানাদার বাহিনীর হত্যা নির্যাতন বেড়ে গেলে প্রাণ বাঁচাতে দলে দলে মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিতে শুরু করে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, একই অবস্থা চলছিল বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাট, রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনা, ফরিদপুর, বরিশাল অঞ্চলে। এসব এলাকার অসংখ্য মানুষ সীমান্ত পাড়ি দেয়ার উদ্দেশ্যে চুকনগরকে ট্রানজিট হিসেবে বেছে

নেয়। ১৯ মে রাতে চুকনগরে এসে সমবেত হয় তারা। পরিকল্পনা ছিল পরদিন সকালে সুযোগ বুঝে সাতক্ষীরা ও কলারোয়ার বিভিন্ন সীমানন্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমাবে।

এত এত মানুষ। রাতটুকু কাটানোও সহজ ছিল না। অগত্যা পাতখোলা বিল, কাঁচাবাজার চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, কালী মন্দিরসহ বিভিন্ন শ্মশানে আশ্রয় নেয় তারা। নির্ঘুম রাত কাটায়। ২০ মে সকালে খোলা আকাশের নিচে বসেই কেউ কেউ ভাত রান্না শুরু করেন। কেউবা চিড়ে-মুড়ি ও অন্যান্য শুকনো খাবার খেয়ে প্রস্তুতি নেন হাঁটার। সব মিলিয়ে কত লোক ওইদিন চুকনগরে সমবেত হয়েছিল তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় লক্ষাধিক নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সেদিন প্রাণ

বাঁচাতে চুকনগর পর্যন্ত ছুটে এসেছিল।

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে, এক জায়গায় এত লোক সমবেত হওয়ার খবর রাজাকাররা আগেই পৌঁছে দিয়েছিল পাকিস্তানী ক্যাম্পে। খবর পেয়ে বড় প্রস্তুতি নেয় হায়েনার দল। সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ করেই তিনটি ট্রাক চুকনগর বাজারের পাতখোলা এলাকায় প্রবেশ করে। ট্রাকে করে আসা খুনী বাহিনী হালকা মেশিনগান ও সেমি-অটোমেটিক রাইফেলে সজ্জিত ছিল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় গণহত্যা। দুপুর ৩টা পর্যন্ত নির্বিচারে হত্যা চালানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে দিগি¦দিক ছুটতে থাকে মানুষ। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার পরও নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। সেখানেই ভাসমান অবস্থায় গুলি করা হয় তাদের। অনেকে ডুবে মারা

যান। আজ যে ফসলের মাঠ সেখানে লাশ আর লাশ পড়েছিল। পাশের খালেও ভাসছিল লাশ। দুর্গন্ধে টিকতে না পেরে পরবর্তী সময়ে স্থানীয়রা এসব লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেন বলে জানা যায়।

মর্মন্তুদ সেই ইতিহাস স্মরণে গত কয়েক বছর আগে চুকনগরে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। ফসলি জমির কিছুটা জায়গা ঘিরে নিয়ে নীরব এই সৌধ গড়া হয়েছে। চুকনগর গণহত্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার কাজ করছে এই একটিমাত্র কাঠামো। খুব বোঝা যায় আজকের প্রজন্মের তেমন আসা যাওয়া নেই এখানে। এর একটি সুবিধাও খুঁজে পাওয়া গেল। নীভৃতে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো সৌধের সামনে। একান্তে স্মরণ করা গেল আলোচনার

বাইরে থাকা তৃণমূলের শহীদদের।

অবাক কা- হলো, স্মৃতিসৌধের পরিবেশটি বেশ পরিচ্ছন্ন। একটা ভাবগাম্ভীর্য ধরে রেখেছে। তবে এখানে সংগঠিত গণহত্যার ইতিহাস কোথাও লিপিবদ্ধ করা নেই। এ অবস্থায় এগিয়ে এলেন একাত্তরের গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। নাম ফজলুর রহমান মোড়ল। জানা গেল সৌধটির তিনিই দেখভাল করেন।

সেদিনের কথা জানতে চাইলে ফজলুর রহমান বলেন, তখন আমার বয়স আনুমানিক ১৪ কী ১৫ বছর। বৃহস্পতিবার সকলের কথা। আমি চাল কিনতে বের হয়েছি। হঠাৎ দেখি সাতক্ষীরার দিক থেকে মিলিটারিদের একাধিক গাড়ি ছুটে আসছে। এর পরপরই গুলির বিকট আওয়াজ। অন্যদের মতো ভয়ে দৌড়াতে শুরু করি আমি। সৌধের পেছনের ফুলকপির ক্ষেত দেখিয়ে তিনি বলেন, ওখানে বহু মানুষের

লাশ পড়ে ছিল। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর আমরা দেখেছি। তিনি জানান, প্রথমে চিকন আলী মোড়ল নামের একজনকে, পরে সুরেন্দ্রনাথ নামের এক কু-ু মশাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে জলে ও স্থলে লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। বলেন, গন্ধে টিকতে না পেরে গ্রামবাসী লাশগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেন। মরদেহ কোথাও আটকে গেলে লাঠি দিয়ে ঠেলে দিতেও দেখা যায়।

আহা বেদনা! মানুষ মানুষকে এত নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে? পাকিস্তানীরা কি মানুষ ছিল?

চুকনগন গণহত্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় কাজ করেছেন ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। তার দেয়া পরিসংখ্যান মতে, সেদিন কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। একদিনে নির্দিষ্ট একটি

এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ মানুষ হত্যা ইতিহাসে বিরল বলে জানান তিনি।

অথচ কিন্তু কী আশ্চর্য! গণহত্যার এ ইতিহাস সেভাবে সামনে আসেনি। রাজধানীকেন্দ্রিক চর্চায় বিশেষ মনোযোগী আমরা। চুকনগর কিংবা চুকনগরের মতো আরও অনেক বধ্যভূমি তাই জাতীয় ইতিহাসে সেভাবে ঠাঁই পায়নি। এ-ও আরেক বেদনা বৈকি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT