ঢাকা, Saturday 18 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

মানবিক অনুভূতি নয় শুধু, প্রাণবিক হওয়ার নতুন চর্চা

প্রকাশিত : 03:32 PM, 28 September 2020 Monday
230 বার পঠিত

| ডোনেট বিডি নিউজ ডেস্কঃ |

মানুষকে মানবিক গুণাবলীর হতে হবে। তবেই সে মানুষ। এজন্য বহুবিধ সাধনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সবাই যান, এমন নয়। যারা যান তারাই প্রকৃত অর্থে মানুষ। তবে আজকের বাংলাদেশ, সব দেখে বলাই যায়, আরও একধাপ এগিয়ে গেছে। এখন শুধু মানবিক নয়, প্রাণবিক হওয়ার সচেতন চর্চা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ, মানুষের চারপাশে আরও যত প্রাণ, তাদের কথাও ভাবতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে। ভালবাসতে হবে তাদের। কারণ ‘এ্যানিমেলস হ্যাভ ফিলিংস টু।’

সব ধরনের প্রাণীর প্রতি ভালবাসা আদর গ্রামীণ সমাজেই এক সময় বেশি দেখা গেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’র কথাই যদি ধরা যায়, সেই যে কালজয়ী গল্পটা, মনে পড়ে? কাশিমপুর গ্রামের হতদরিদ্র

কৃষক গফুর আর তার লালন-পালন করা গরুটির মধ্যকার সম্পর্ক আজও পাঠকের চোখের পাতা ভিজিয়ে দেয়। গফুর ও তার মেয়ে আমিনা আদর করে গরুর নাম রেখেছিল মহেশ। নিজেরা না খেয়ে, কম খেয়ে মহেশকে খাওয়াত। ঘরের চাল চুইয়ে বৃষ্টি পড়ে। তবুও খড় বের করে মহেশের মুখের সামনে ধরতে তারা দুইবার ভাবে না। গফুর মহেশের গলা জড়িয়ে ধরে বলতেন, ‘মহেশ, তুই আমার ছেলে… তোকে আমি পেটপুরে খেতে দিতে পারি নে- কিন্তু, তুই তো জানিস তোকে আমি কত ভালবাসি।’ মহেশও প্রত্যুত্তরে ‘গলা বাড়াইয়া আরামে চোখ বুজিয়া’ রাখত। শেষতক মহেশকে হারিয়ে অসীম বেদনায় ডুবতে হয় গফুরকে। বাবার সঙ্গে কেঁদে যায়

কিশোরী আমিনাও।

একই আমিনাকে গত কোরবানির ঈদে আমরা ফিরে আসতে দেখি অর্থী রূপে। নিজের প্রিয় গরু বিক্রি হয়ে গেলে অঝর ধারায় কেঁদেছিল বগুড়ার সেই কিশোরী। ভরা হাটে তার এমন কান্না দেখে বড়রাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। ছবিটি অন্যান্য প্রাণীর প্রতি মানুষের ভালবাসার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হয়ে এখনও ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাছুর যখন, স্থানীয় হাট থেকে প্রাণীটি কিনে আনা হয়েছিল। অর্থী একে নিজ হাতে খাওয়াত। এর সঙ্গে খেলাধুলা করত। বাছুরটির নাম দেয়া হয়েছিল নবাব। নবাব বড় ও নাদুস-নুদুস হতেই ঘোড়াধাপ হাটে ওঠানো হয়। সেখানেও বাবার সঙ্গে অর্থী ছিল। ক্রেতা গরু নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলে সে আর

স্থির থাকতে পারেনি। বন্ধু হারানোর এই শোক সারাদেশের মানুষকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। অনেকেই মেয়েটিকে নতুন গরু কিনে দিতে এগিয়ে আসেন। এভাবে দারুণভাবে সামনে আসে প্রাণীপ্রেম। আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ আমরা খুঁজে পাই রাজশাহীতে। গত বছরের অক্টোবরের ঘটনা। বাঘা উপজেলার খোর্দ্দ বাউসা গ্রামের একটি আমবাগানে তখন হাজার হাজার পাখির বাস। পাখিগুলো ২৫টি গাছে বাসা বেঁধে প্রায় চার বছর ধরে অবস্থান করছে। সব বাসাতেই সে সময় পাখির ছানা। ছানাগুলো উড়তে শেখেনি। অথচ বাগান মালিক ফলের ভবিষ্যত ক্ষতির কথা ভেবে পাখির বাসাগুলো ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে অনেক পাখির ছানা মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিল। কিন্তু খবর পেয়ে ঠিকই ছুটে

এলো স্থানীয় পাখিপ্রেমীরা। ছানা উড়তে শেখার আগ পর্যন্ত বাসা না ভাঙ্গার জোর দাবি তুললেন তারা। প্রাণবিক দাবির মুখে ১৫ দিন সময় দিলেন বাগান মালিক।

না, এখানেই শেষ নয়। রাজধানীর নাগরিক সমাজও পাখির জীবন রক্ষার্থে পাশে দাঁড়ালেন। তবে প্রাণবিক চাওয়াকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অনন্য নজির স্থাপন করল দেশের হাইকোর্ট। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রিটের প্রেক্ষিতে কোন দ্বিধা না করেই বলে দিলেন, পাখির বাসা ভাঙ্গা যাবে না। পাখির বাসা না ভাঙতে হাইকোর্টের রুল, ভাবা যায়? কতভাবেই না পিছিয়ে আছি আমরা! কিন্তু হাইকোর্টের তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ আমাদের প্রাণবিক হওয়ার সূচককে যারপরনাই উর্ধমুখী করেছে।

গ্রাম বা মফস্বল শহরের মানুষের মতো রাজধানী

ঢাকার মানুষও প্রাণীদের প্রতি ভীষণ ভালবাসা দেখিয়ে অভ্যস্ত। বর্তমানের ঢাকা এ ইস্যুতে আরও বেশি সরব। এখানে কুকুর বা বিড়াল শুধু পোষ্য প্রাণী নয়, পরিবারের সদস্য। ঘরের মানুষজনের মতোই বাসার নরম বিছানায় ওরা ঘুমোয়। সোফায় গা এলিয়ে দেয়। প্রিয় কুকুর বা বিড়াল কোলে নিয়ে ছবি তোলা, ঘুমোতে যাওয়া এ তো নিত্যদিনের ঘটনা। কেউ কেউ হয়ত বলবেন, পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব। বিদেশী জাতই শুধু ঘরে রাখা হয়। হ্যাঁ, এ কথা একেবারে মিথ্যে নয়। তবে একই মানুষ পথের কুকুরটির প্রতিও সহানুভূতিশীল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা এবং ধানম-ির রবীন্দ্র সরোবর এলাকা থেকে একবার ঘুরে আসলেই সেটি বোঝা যাবে।

এ শহরে আছে

বানরও। ঢাকার গেন্ডরিয়া, ক্যান্টনমেন্টসহ কয়েকটি পুরনো এলাকায় এখনও বানর দেখা যায়। বেশ আছে ওরা। কয়েকদিন আগেও গে-ারিয়ার সাধনা ঔষধালয়ের কারখানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মানুষের পাশাপাশি নির্ভয়ে বিচরণ করছে ওরা। কারখানা ও পাশ্বর্¦বর্তী কবরস্থানের সীমানা প্রাচীরে অবস্থান নেয়া বানরকে পাশের দোকান থেকে পাউরুটি কিনে খাওয়ানোর লোকের অভাব নেই। হাত বাড়িয়ে কী সুন্দর খাবার নিচ্ছে ওরা! কোন ভীতি কাজ করছে না ভেতরে। সারা বছরই স্থানীয়ভাবে এদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

আকাশ নামের এক তরুণ বলছিলেন, আশপাশের বাসাবাড়িতে ঢুকে ডাইনিং টেবিলে বসে নাকি খাবার খায় বানর! ফ্রিজ খুলে ফেলে। তার পরও বাড়ির লোকেরা এদের আক্রমণ করে না। বরং

বাকিগুলোর জন্য বাইরে কিছু খাবার ছুড়ে দেয়! এর পাশাপাশি বিভিন্ন বাসার এক্যুরিয়ামে দারুণ রঙিন সব মাছ ছেড়ে দেয়া হয়। কবুতর ময়না মুনিয়া ইত্যাদি পাখি বাসায় লালন-পালন করেন অনেকে। বাংলা সিনেমার খ্যাতিমান নায়িকা ববিতার বাড়ি ভর্তি পাখি। ময়না তো সারাক্ষণ নকল করেন নায়িকাকে। এমনকি ববিতার হা হা হাসি অবিকল হেসে দেখায়! গাছেরও প্রাণ আছে। সেই প্রাণ জাগিয়ে রাখার নাগরিক চেষ্টাও উল্লেখ করার মতো। কিছুদিন আগে, অনেকেরই মনে থাকার কথা, এক বাড়ির ছাদের গাছ বঁটি দিয়ে কেটে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন এক নারী। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া সেই নারী তার পর থেকে ভিলেন। যে তরুণীর গাছ কাটা হয়েছিল দূর-দূরান্ত

থেকে মানুষ তার কাছে নতুন গাছ পাঠিয়েছে। মানুষের প্রাণবিক আচরণের এমন আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।

তবে সম্প্রতি ঢাকা থেকে কুকুর অপসারণের খবর প্রচারিত হলে প্রাণবিক ঢাকা যেন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্মম কায়দায় কুকুর অপসারণ করছে এমন অভিযোগ ওঠে। তাতেই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে মানুষ। যে সে প্রতিবাদ নয়। শহরের শিক্ষিত সচেতন সর্বোপরি মানবিক ও প্রাণবিক মানুষ এই প্রতিবাদে যোগ দেন। ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপক প্রচার চালান তারা। বিশিষ্টজনরা বিবৃতি দিয়ে এর প্রতিবাদ জানান। রাজপথে মানববন্ধন করা হয়। এমনকি কুকুর অপসারণ বন্ধে রিট করা হয় হাইকোর্টে। এ অবস্থায় মেয়র ফজলে নূর তাপসের পক্ষ থেকে

জানানো হয়, কুকুর অপসারণের কোন কাজ দক্ষিণ সিটি করছে না। আর উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ব্যক্তিগতভাবে কুকুর ও বিড়াল পোষেন। সে জায়গা থেকে তিনিও জানিয়ে দেন, উত্তর সিটি থেকে কোন কুকুর অপসারণ করা হবে না। সব মিলিয়ে প্রাণবিক ঢাকারই যেন জয়জয়কার। এ চর্চা এগিয়ে নেয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এখন। এ প্রসঙ্গে কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা বলছেন, প্রাণ প্রকৃতির ক্ষুদ্র অংশ মানুষ। তাই সবাইকে নিয়ে ভাল থাকতে হবে। এটি যখন হয় না তখনই ভারসাম্য নষ্ট হয়। করোনার মতো ভাইরাসের আক্রমণের শিকার হতে হয় আমাদের। তাই সব প্রাণের অনুভূতিকে মূল্য দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। মানুষ এবং

প্রাণীর সহাবস্থান চেয়ে যারা বিবৃতি দিয়েছিলেন তাদের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তার মতে, আমরা মানুষ বলেই আমাদের দায়িত্ব বেশি। সে দায়িত্ব এবং দায় অনুভব করতে হবে। আমাদের মানবিক এবং প্রাণবিক হতে হবে। তা না হলে মানুষ ও পশুর মধ্যে পার্থক্য কী?

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT