ঢাকা, Sunday 26 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বেসরকারী শিক্ষায় বিপর্যয় ॥ করোনার ছোবলে সব লণ্ডভণ্ড

প্রকাশিত : 10:10 PM, 26 August 2020 Wednesday
128 বার পঠিত

| ডোনেট বিডি নিউজ ডেস্কঃ |

করোনার ছোবলে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে শিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশের যোগান দেয়া বেসরকারী শিক্ষাস্তর। টানা পাঁচ মাসের বন্ধে অর্থ সঙ্কটে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিশুদের কিন্ডারগার্টেন, বেসরকারী স্কুল, কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নিজের প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিচ্ছেন উদ্যোক্তা ও শিক্ষকরাই। ‘ফার্নিচারসহ স্কুল, ‘কলেজ বিক্রি হইবে’ ‘স্কুল ভবন ভাড়া হবে’ কিংবা ‘টু-লেট’ রাজধানীর বহু অলিগলি সড়ক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গায়ে এখন বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। শত শত শিক্ষক ও উদ্যোক্তা নিজের প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও বন্ধ করে দিয়ে পেটের তাগিদে খুঁজছেন অন্য পেশা। সারাদেশেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি ও বন্ধের খবর মিলছে। বহু শিক্ষক চাকরি হারিয়ে ফল

বিক্রি, মুদির দোকান দেয়াসহ দিনমজুরের কাজ করছেন। অনেকেই চলে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে।

বেসরকারী শিক্ষক, উদ্যোক্তা ও বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, ‘ভালো নেই লাখ লাখ বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার। রাজধানীতেই দুই শতাধিক ছোট বড় কেজি স্কুল ও কলেজ বিক্রির উদ্যোগ ও চিরতরে বন্ধের কথা জানিয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলো বলছে, ইতোমধ্যেই কেজি স্কুলের অন্তত দুইজন শিক্ষক অর্থ কষ্টে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেছেন। অর্ধাহারে-অনাহারে কাটছে দিন লাখ লাখ শিক্ষক, কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের। করোনার ছোবলে ল-ভ- হয়ে গেছে সব কিছু। অনেকে চাকরি হারিয়ে শহর ছেড়ে চলে গেছেন গ্রামে। লোকলজ্জার ভয়ে কিছু করতে না

পেরে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বেসরকারী শিক্ষা স্তরের এ সঙ্কটের দিকে সরকারের দ্রুত নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, শিক্ষা খাতের ৮৫ ভাগেরও বেশি যোগান দেয়া বিশাল এ অংশের বর্তমান আর্থিক সঙ্কট ও ভবিষ্যতের আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করে তারা বলেছেন, বেসরকারী শিক্ষা স্তরের চলমান সঙ্কটে নজর না দিলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম।

করোনাকালে শিক্ষাঙ্গনের সঙ্কটের চিত্র নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে উদ্বেগজনক নানা চিত্র। শিক্ষক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর্থিক সঙ্কটে কষ্টে চিরকুট লিখে গত সপ্তাহে

আত্মহত্যা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের সৃষ্টি বিদ্যাপীঠের শিক্ষক আবদুল খালেক। আত্মহত্যা করেছেন কুড়িগ্রামের প্যারাগন কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষক রওশন কবীর। অর্থ সঙ্কটে দুশ্চিন্তায় রাজধানীর মিরপুরের সানওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক মোঃ মনোয়ার স্ট্রোক করে মারা গেছেন বলে বলছেন শিক্ষকরা।

ইতোমধ্যেই পুরোপুুরি বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারী বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলের মধ্যে আছে রাজধানীর পূর্ব দোলাইরপাড়ে অবস্থিত হলিহার্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, রামপুরার ইকরা আইডিয়াল স্কুল, ধনীয়া কদমতলীর ঢাকা কিন্ডারগার্টেন, যাত্রাবাড়ীর আধুনিক বিদ্যালয়। খিলগাঁওয়ের ঢাকা ক্যাডেট স্কুল, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বৃটেন স্ট্যান্ডার্ড স্কুল, পশ্চিম ধানম-ির দীক্ষাপীঠ, মিরপুরের শিশুকানন স্কুল, নতুন জুরাইনের নলেজ হেভেন আইডিয়াল স্কুল, উত্তর মুগদাপাড়ার প্লাজা

কিন্ডারগার্টেন।

মুগদা ব্যাংক কলোনির মুগদা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুরের শতদল কিন্ডারগার্টেন, আলমবাগের স্কলার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, জুরাইন পাইলট স্কুল, নুরে মদিনা কিন্ডারগার্টেন, ব্রাইট কেজি স্কুল, এন পিমিনি ইংলিশ স্কুল, আলমবাগ কিন্ডারগার্টেনের মতো বহু বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে পুরোপুরি বন্ধ হতে যাওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায়।

এসব প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি বন্ধ করে ভবন বাড়িওয়ালাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখলেও শিক্ষকরা আশা করছেন যদি পরিস্থিতি ভাল হয় তবে আবার চেষ্টা করবেন খোলার। প্রধান শিক্ষকরা প্রায় প্রত্যেকেই বলছেন, তারা প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে চান কিন্তু এখনতো কেউ তা কিনতেও রাজি হচ্ছেন না। অনেকেই দুই মাস ধরে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলেও ক্রেতা

পাচ্ছেন না।

ইতোমধ্যেই বিক্রির আশায় বিজ্ঞাপন দিয়েছেন মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় অবস্থিত ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন এ্যান্ড হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তকবীর আহমেদ, সাভার বাইপালে অবস্থিত সৃজন সেন্ট্রাল স্কুল এ্যান্ড কলেজের প্রধান শামীম ইকবাল, রাজধানীর কচুক্ষেতে অবস্থিত আইডিয়াল পাবলিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক নারগিস আক্তার, রামপুরার হলিভিশন রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের প্রধান আক্কাস আলীসহ অনেক শিক্ষক। অনেকে পরিচিত জনের কাছে প্রতিষ্ঠান বিক্রির জন্য চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে বিভিন্ন সড়কে বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন।

‘২৫০ জন শিক্ষার্থী এবং ১২ জন শিক্ষকসহ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন ও উচ্চ বিদ্যালয় বিক্রি করা হবে’ রাজধানীজুড়ে এমন বিজ্ঞাপন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। করোনার শুরু দুই মাসের মাথায়

এটি বিক্রির জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন এর পরিচালক তাকবীর আহমেদ। অথচ এখন পর্যন্ত বিজ্ঞাপন দেখে কিনতে কেউ আসেনি বলে জানান এ উদ্যোক্তা। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একেতো করোনার এই অবস্থায় আসলে কেউ কেনার ঝুঁকি নিতে চান না। শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে কিনে ব্যয় কিভাবে সামলাবে তা নিয়ে সবাই দ্বিতীয়বার চিন্তা করেন।

তিনি আরও বলেন, মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধের ঢাকা উদ্যান এলাকার নবীনগর হাউজিং ৪ নম্বর সড়কে অবস্থিত ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেন এ্যান্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে তিনি শিশুদের এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। করোনাকালে বিদ্যালয়ের টিউশন ফিসহ সব রকম আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থ সঙ্কটে পড়ে তিনি বিদ্যালয়টি এখন বিক্রি করে

দিতে চান।

বাইপালে অবস্থিত সৃজন সেন্ট্রাল স্কুল এ্যান্ড কলেজের চেয়ারম্যান শামীম ইকবাল বলেছেন, আমি এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। আমার শিক্ষার্থীদের কথা ভাবলে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু, আমি আর কী করতে পারি? এই স্কুলটি চালানোর জন্য আমার মাসে এক লাখ টাকা প্রয়োজন । শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি পাচ্ছি না একটি টাকাও।

প্রতিষ্ঠান বন্ধ ও চাকরি না থাকায় এখন জীবন রক্ষায় সম্মানের কথা চিন্তা না করে মুদি দোকান দিয়েছেন মুগদা ব্যাংক কলোনির মুগদা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের জনপ্রিয় এক শিক্ষক ‘মারুফ স্যার’। তিনি জনকণ্ঠকে বলছিলেন, ‘ভাই আমার মতো বহু শিক্ষক এখন জীবন বাঁচাতে অন্য পেশা খুঁজে

বেড়াচ্ছে। অল্প কিছু টাকা ছিল তা দিয়ে এখন দোকান দিয়েছি। অনেক পরিচিত শিক্ষক সব কিছু ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। আসলে আমরা না পারছি কারো কাছে সাহায্য চাইতে, না পারছি কষ্ট সামলাতে। স্কুল থাকলে বেতন সমস্যা হলেও অন্তত টিউশনি করে পরিবার চলত আমার মতো হাজার হাজার শিক্ষকের। এখনতো তাও নেই।’ এই শিক্ষক জানান, আমার এলাকার আশপাশের অনেক স্কুলের শিক্ষক এখন নিজেরা এক সঙ্গে মিলে অনলাইনে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ দিয়েছেন। অন্তত জীবনটাতো বাঁচাতে হবে। মান্ডার ব্রাইন মুন, রংধনু, গ্যালাক্সি আইডিয়াল, স্বরলিপিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা আলোচনা করেছেন তারা জীবন রক্ষা করতে ভিন্ন কিছু করছেন। তারা এক সঙ্গে

মিলে অনলাইনে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন। তাতে যদি অন্তত পরিবার বাঁচাতে পারেন এই আশায়।

রাজধানীর ব্রাইট স্টার বিদ্যানিকেতনের মালিক জাহাঙ্গীর হোসেন, মেমোরী টিউটরিয়ালের প্রধান মিজানুর রহমান এখন আর্থিক সঙ্কটের কারণে ভাড়া বাসা বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বন্ধ করা স্কুল ভবনে বসবাস করছেন। তারা বলছেন, এতে অন্তত দুই স্থানে বাড়ি ভাড়া দিতে হচ্ছে না। তবে এভাবে চলতে থাকলে হয়তো ঢাকাতেই থাকা হবে না। কিংবা অন্য কোন কাজ খুঁজতে হবে। রাজধানীর স্বরলিপি উচ্চ বিদ্যালয় ও ফুলকুঁড়ি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা জানালেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্কুল ভবনের একটি অংশ এখন তারা ভাড়া দিয়েছেন।

বিক্রি বা হস্তান্তরের বিজ্ঞাপন দেয়া একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে হলি ভিশন

রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজ। এটি রাজধানীর রামপুরার উলন রোডে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল হামিদ রানার কাছে স্কুল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনার এই সময় শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারায় এমন উদ্যোগ নিয়েছি। তবে কেউ কিনবেন কিনা, তাতো নিশ্চিত নই। এখন কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিনতেও রাজি হচ্ছেন না। বহুদিন ধরে বিজ্ঞাপন দিয়েছি।

রাজধানীর মালিবাগের ঢাকা ক্যাডেট স্কুলটি ভাড়া মেটাতে না পেরে সরঞ্জাম বিক্রি করে দিয়েছে। ভাড়া করা ভবনটিও ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সরঞ্জাম বিক্রি করে বকেয়া ভাড়া মেটানো সম্ভব না হওয়ায় অগ্রিম জমা রাখা টাকা থেকে বাড়ির মালিককে ভাড়া পরিশোধ করে সাতক্ষীরায় চলে গেছেন প্রতিষ্ঠানটির

মালিক সাইদুর রহমান। করোনা মহামারীর সময় মালিকানা হস্তান্তরের চেষ্টায় থাকা জুরাইন আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেনের মালিক মোশাররফ হোসেন বলছিলেন, শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না। শিক্ষকরা বলছেন, বেকারত্ব ঘুচাতে অনেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লায় কিন্ডারগার্টেন চালু করেছিলেন। অনেকে এটিকে ব্যবসা হিসেবেও নিয়েছিলেন। কিন্তু কে জানতো করোনার সময় প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই এখন তাই কিন্ডারগার্টেন স্কুল পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

বাড্ডায় অবস্থিত হলি ভিশন কিন্ডারগার্টেনের অধ্যক্ষ মোঃ সামসুল হক বলছিলেন, আমরা কষ্ট করে স্কুলটি চালিয়েছিলাম। প্রথম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত চার শতাধিক শিক্ষার্থী আছে। বাড়িভাড়া, শিক্ষকদের বেতন এখন আর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি

দীর্ঘ হওয়ায় স্কুল পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মোঃ সামসুল হক আরও জানান, বাড্ডা এলাকার টাইনি টট, শেখ রাসেল কিন্ডারগার্টেনসহ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে। করোনার কারণে এ ধরনের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তিনি।

নার্গিস আক্তারের জন্য নিজের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দেয়াটা ছিল অত্যন্ত কষ্টের। তবু তার ছিল না কোন উপায়। গত পাঁচ মাস ধরে রাজধানীর মাটিকাটা এলাকার আইডিয়াল পাবলিক স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর অভিভাবক করোনা মহামারীর কারণে টিউশন ও অন্যান্য ফি দিতে পারেননি।

কিন্ডারগার্টেন স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক নার্গিস আক্তার বলেছেন, ‘উপায় নেই। পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। করোনা মহামারী এক চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতি মাসেই জমতে জমতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য খরচের বাকির পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে। রাজধানীর বসিলা এলাকার আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ও রয়েছে বিক্রির তালিকায়। এর মালিকদের একজন ফারুক হোসেন রিপন জানিয়েছেন, বাড়িভাড়া ও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন মিলিয়ে আমার লাখ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে। আর কোন উপায় নেই স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠান চালানোর।

প্রতিষ্ঠান বন্ধ, টিউশনিও নেই। সংসার চালাতে উপায় না থাকায় রাজধানীর মিরপুরের প্রাইম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক এস আর রানা ও এ্যাডভান্সড চাইল্ড কেয়ার একাডেমির শিক্ষক মিরাজুল ইসলাম এখন মৌসুমি ফল আম বিক্রেতা- এ খবর ইতোমধ্যেই ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। স্কুলের সামনেই আম বিক্রি করছেন এমন খবর গণমাধ্যমে এসেছে।

মিরপুরের নবাবেরবাগ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা

ও প্রধান শিক্ষক শামছুর রহমান জানান, স্কুল ছেড়ে দিতে হচ্ছে আর ভাড়া টানতে পারছি না। যথাসময়ে টিউশন ফি আদায় না হওয়ায় বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ইতোমধ্যেই কয়েক লাখ টাকা লোন নিয়েছি। আর পারছি না। কাজীপাড়ার লিটল ফ্লাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ তানজীম বলেন, কেমন বেকায়দায় পড়েছি, বুঝতেই পারছেন। শ্রম বিক্রি করা ছাড়া আর কোন উপায় তো দেখি না। করোনার কারণে শিক্ষকদের টিউশনিও নেই। এদিকে কেবল ঢাকাতেই নয়। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সংগঠনগুলো বলছে, ঢাকার বাইরের চিত্রও একই। ইতোমধ্যেই বহু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে।

খুলনার আলহাজ সারোয়ার খান

কলেজের প্রভাষক নেকবর হোসাইন চাকরি করতেন। বেসরকারী কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক ফোরামের সভাপতিও নেকবর হোসাইন। শহরে বাসাভাড়া করে থাকতেন, টিউশনি, কোচিং করিয়ে কোনরকম সংসার চালাতেন। করোনার কারণে বেতন বন্ধ, খরচ মেটাতে না পারায় ফিরে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি বলেছেন, কলেজের আয় বন্ধ, তাই বেতনও নেই। এখন টিউশনি-প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়েও ছাত্র-ছাত্রী পড়াতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছি।

তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ বেসরকারী কলেজের আয় খুব কম। এ কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের নামমাত্র বেতন-ভাতা দিত। করোনা আসার পর সেই উপার্জনও বন্ধ হওয়ায় বেতন-ভাতাও দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষকদের পাঁচ হাজার আর কর্মচারীদের আড়াই হাজার টাকা করে সরকার এককালীন প্রণোদনা

দিচ্ছে। টাকাটা প্রতি মাসে দিলেও শিক্ষকরা খুশি হতেন। শিক্ষকরা প্রায় সবাই বলছেন, করোনাভাইরাসের ছোবলে ল-ভ- হয়ে গেছে তাদের সব কিছু। চাকরি হারিয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। যারা কেবল প্রতিষ্ঠান থেকেই কিছু বেতন পেতেন। একই সঙ্গে টিউশনি করে জীবন চালাতেন।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার চৌধুরী জানান, প্রায় প্রতিদিনই তারা কোন না কোন জায়গা থেকে খবর পাচ্ছেন যে স্কুল বিক্রি করে দেবেন মালিকরা। যতদূর আমরা জানি, শতাধিক স্কুল বিক্রির চেষ্টা চলছে। যদি সরকার কোন সহায়তা না দেয় এবং করোনা সঙ্কট আরও বেশি দিন স্থায়ী হয়, তাহলে সারাদেশে কেবল ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলই বন্ধ

হয়ে যাবে। কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া এসব স্কুলের শিক্ষকদের আর্থিক সহায়তা, মালিকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ইউটিলিটি বিল মওকুফ করার দাবি করেছেন ইকবাল বাহার চৌধুরী।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন এ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মিজানুর রহমান জনকণ্ঠকে তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলছিলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বন্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে কিন্ডারগার্টেন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। বেকার হয়ে পড়বেন প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। সরকারের আর্থিক সহায়তা না পেলে এই ১০ লাখ পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সারাদেশে ৬০ হাজারের মতো কিন্ডারগার্টেন এবং সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক কোটিরও বেশি শিশু শিক্ষালাভের সুযোগ পাচ্ছে। এ ছাড়াও ১০ লক্ষাধিক

শিক্ষক-শিক্ষিকা ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয়েছিল। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের পরিবারবর্গ। এ বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যার আহার জোগানো এখন কষ্ট। কোন শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রাইভেট টিউশনও করতে পারছে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় না থাকায় বেতনও পাচ্ছেন না। অনেকেই জীবন বাঁচাতে শ্রমিকের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকে ফল বিক্রি করছেন। অনেকে ছোট খাটো মুদি দোকান দিয়ে কোনমতে জীবর রক্ষা করছেন। এ বিষয়ে সরকারের এগিয়ে আসা বড় বেশি প্রয়োজন।

জানা গেছে, শিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশের যোগান দেয়া বেসরকারী খাতের অধিকাংশ উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও কর্মচারী সমিতির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই সরকারের কাছে প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধার জন্য আবেদন করা হয়েছে। কেউ কেউ আবেদনের

পর সংবাদ সম্মেলনেও দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। শিশুদের কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারী স্কুল, কলেজ, থেকে শুরু করে বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা সকলেই সরকারের সহায়তা চেয়েছেন। সহায়তা চেয়েছে ইংলিশ মিডিয়াম ও কোচিং সেন্টারের শিক্ষকরাও।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও এ দাবিকে যৌক্তিক অভিহিত করে শিক্ষা খাতের বর্তমান আর্থিক সঙ্কট ও ভবিষ্যতের আর্থিক দুরবস্থা বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এজন্য প্রয়োজনে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়ারও সুপারিশ করে শিক্ষাবিদরা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্র্বল হয়ে পড়লে মালিকরা প্রতিষ্ঠান চালাতে গণহারে ছাঁটাই করবে। জনবল না কমালে তারাও চালাতে পারবে না। চাপ দিলেও ফল পওয়া যাবে না। ফলে বেসরকারী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা না দিলে শিক্ষা বিস্তার তো বটেই আরও অনেক ধরনের সঙ্কট তৈরি হবে। এজন্য প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলেও দেশের বড় বড় নামী বেসরকারী স্কুল ও কলেজকেও মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে অর্ধেকেরই বেশি শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত নন। তাদের বেতন ভাতা হয় প্রতিষ্ঠানের আয় থেকেই।

শ্যামলী আইডিয়াল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ এম এম সাত্তার বলছিলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত চেষ্টায় দেশের কারিগরি শিক্ষায় আজ যে অর্জন তা কিন্তু বেসরকারী স্তরেই। আজ যে সঙ্কটে পড়েছে এ খাত সেখানে যদি প্রণোদনা না হয় তাহলে জননেত্রী শেখ হাসিনার এ অর্জন যেমন সঙ্কটে পড়বে তেমনি আর কতদিনে এ খাত

দাঁড়াতে পারবে তাও ভাবা কঠিন। সরকার সহযোগিতা দিলে বেসরকারী বিশাল এ খাত একটু হলেও দাঁড়াতে পারবে।

চরম সঙ্কটে পড়েছেন বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন। সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি (এপিইউবি)। অর্থমন্ত্রীর বরাবর সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন স্বাক্ষরিত আবেদনে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় প্রত্যেক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের অন্তত ছয় মাসের বেতনের সমপরিমাণ ঋণ প্রদানের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

করোনার ছোবলের এই সঙ্কটের মধ্যে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আদায়ে নমনীয় নীতি ও সহায়তার জন্য প্রত্যেক বিশ^বিদ্যালয়কেও চিঠি দিয়েছে উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারী বিশ^বিদ্যালয় সমিতি। সমিতির সেক্রেটারি

জেনারেল বেনজীর আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্মকর্তাদের বেতনসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর স্বার্থে সমিতির পক্ষ থেকে সরকারী প্রণোদনার জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT