পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ পার্বত্য শান্তিচুক্তি এক ঐতিহাসিক দলিল – বর্ণমালা টেলিভিশন

পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির দুই যুগ পার্বত্য শান্তিচুক্তি এক ঐতিহাসিক দলিল

সৌরেন চক্রবর্ত্তী
আপডেটঃ ২ ডিসেম্বর, ২০২১ | ৮:১৭ 161 ভিউ
আজ ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ২৪তম বার্ষিকী। ১৯৯৭ সালের এই দিনে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদিত হয়। দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিশেষ দিন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের এক-দশমাংশ আয়তনজুড়ে তিনটি পার্বত্য জলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। এখানে উপজাতি জনগোষ্ঠী নিজ নিজ ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির স্বকীয়তা বজায় রেখে দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর পার্বত্য অঞ্চল স্বাধীনতা-পূর্বকালে দীর্ঘদিন পশ্চাৎপদ ও অনুন্নত অবস্থায় ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিভিন্ন বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল উন্নয়নের গতিধারায় যুক্ত হচ্ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কুচক্রীদের হাতে বঙ্গবন্ধু স্বজনদের সঙ্গে নিহত হওয়ার পর ওই অঞ্চলের বহুমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের এ অচলাবস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে প্রায় দুই যুগ স্থায়ী হয়। ১৯৯৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সেখানকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে এগিয়ে আসেন। ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে ১১ সদস্যবিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। একই বছর ডিসেম্বরে খাগড়াছড়ির সার্কিট হাউসে সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন্ন রেখে সংবিধানের আওতায় এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই উপজাতীয় জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবি পূরণের সম্ভাব্য সর্বোত্তম সমাধান খুঁজতে উভয়পক্ষ ঐকমত্যে পৌঁছে। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বের গুণে ও প্রচেষ্টায় জাতীয় কমিটি ও জেএসএসের মধ্যে অনুষ্ঠিত সপ্তম বৈঠকে চূড়ান্ত সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে সরকারের পক্ষে জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং জনসংহতি সমিতির পক্ষে জেএসএসের সভাপতি ও শান্তিবাহিনীর প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যেটাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বলা হয়ে থাকে। তৃতীয় কোনো দেশ বা পক্ষের মধ্যস্থতা ছাড়াই দীর্ঘদিনের সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান এবং এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান হয়। এটা সম্ভব হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফলে। এ ঐতিহাসিক মুহূর্তে উপস্থিত থেকে তা দেখার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে আমার। ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে। পর্যায়ক্রমে চার ধাপে অস্ত্র সমর্পণ প্রোগ্রাম হয়। সর্বশেষ দুদকছড়িতে শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে। সেই অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত থাকার স্মৃতি আজও মনে পড়ে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ৬ মে স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন সংশোধন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন জাতীয় সংসদে পাশ হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই এক গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। কল্পরঞ্জন চাকমাকে মন্ত্রী নিয়োগ করা হয় এবং জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমাকে (সন্তু লারমা) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) নিয়োগ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে তিনজন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে পার্বত্য এলাকার উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এতে করে পার্বত্য এলাকার সার্বিক উন্নয়ন, বহুমুখী কল্যাণ ও সুষম উন্নয়নের যাবতীয় কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৯ সালের মার্চে সরকার আমাকে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন করে। তিন বছরের অধিক কর্মকালে বাস্তবে এ অঞ্চলের সব নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন কত ত্বরান্বিত হয়েছে তা দেখেছি। সেখানকার লোকজ ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পাশাপাশি মূলধারার সাংস্কৃতিক চর্চা সমানভাবে প্রবহমান। মহা সমারোহে বৈসাবি উৎসবের পাশাপাশি পালিত হয় বাংলা নববর্ষ। একইভাবে মহা আনন্দে উদযাপিত হয় ঈদ উৎসব ও দুর্গাপূজা। সংস্কৃতির বিবর্তনের এসব নবরূপ পরিস্থিতি আমাদের পার্বত্য সংস্কৃতিকে বিকশিত করছে বিভিন্নভাবে। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য-কী চমৎকার! পার্বত্য শান্তিচুক্তি এবং এর বাস্তবায়ন বিষয়ে পার্বত্যবাসীদের কারও কারও মধ্যে কিছু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, এ চুক্তির কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং জাতিসত্তাগত স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন্ন রাখার পাশাপাশি জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে এ অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি নির্বিশেষে সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সমৃদ্ধ জনপদ গড়ার সম্ভাবনা দিন দিন বিকশিত হচ্ছে, যা বাস্তবে সবাই দেখতে পাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, বিচক্ষণ নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা, তার সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা, সফল সংলাপ এবং শান্তি স্থাপনে উভয়পক্ষের সদিচ্ছার ফলেই সুদীর্ঘ সময়ব্যাপী চলে আসা এ জটিল সমস্যার সমাধানে এই ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন সম্ভব হয়েছে। দেশে-বিদেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের এ উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে কোনো তৃতীয় পক্ষের ভূমিকা ছাড়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান এবং শান্তি স্থাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেছেন। সৌরেন চক্রবর্ত্তী : সাবেক সিনিয়র সচিব sauren.chak@gmail.com

দৈনিক ডোনেট বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ট্যাগ:

সংশ্লিষ্ট সংবাদ:



































শীর্ষ সংবাদ:
বেনাপোল সীমান্তে সচল পিস্তলসহ চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রেফতার নির্মাণসামগ্রীর দাম চড়া, উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি কলম্বোতে কারফিউ জারি টিকে থাকার লড়াইয়ে ছক্কা হাকাতে পারবেন ইমরান খান? করোনায় আজও মৃত্যুশূন্য দেশ, শনাক্ত কমেছে ‘ততক্ষণ খেলব যতক্ষণ না আমার চেয়ে ভালো কাউকে দেখব’ এবার ইয়েমেনে পাল্টা হামলা চালাল সৌদি জোট স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালিতে যুবলীগ নেতার মৃত্যু সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র রপ্তানি করেছে মোদি সরকার বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে ফুল দেওয়া নিয়ে আ.লীগের দুপক্ষের সংঘর্ষ, এলাকা রণক্ষেত্র ইউক্রেনকে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র ও মেশিনগান দিয়েছে জার্মানি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে নারীকে ধর্ষণ, অস্ত্রসহ গ্রেফতার ৩ ইউরো-বাংলা প্রেসক্লাবের ‘লাল-সবুজের পতাকা বিশ্বজুড়ে আনবে একতা‘-শীর্ষক সভা বঙ্গবন্ধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নওগাঁর নওহাঁটায় স্থাপনের দাবিতে মানববন্ধন । ভূরুঙ্গামারীতে ব্যাপরোয়া অটোরিকশা কেরে নিল শিশুর ফাহিম এর প্রাণ ভূরুঙ্গামারী কিশোর গ‍্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আহত যশোরিয়ান ব্লাড ফাউন্ডেশন এর ৬ তম রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্পেইন বেনাপোলে পৃথক অভিযানে ৫২ বোতল ফেনসিডিল সহ আটক-২ বেনাপোল স্থলপথে স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশিদের ভারত ভ্রমন নিষেধ গেরিলা যোদ্ধা অপূর্ব