ঢাকা, Sunday 24 October 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

দৃষ্টিনন্দন রূপে ফিরছে তুরাগ নদ, কূল ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে ওয়াকওয়ে

প্রকাশিত : 09:09 AM, 10 March 2021 Wednesday
45 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

বহুকাল পরে দৃষ্টিনন্দন রূপে ফিরছে ঢাকার তুরাগ নদ। ইতোমধ্যেই তুরাগ নদের কূল ঘেঁষে গড়ে তোলা হচ্ছে আট ফুট চওড়া ওয়াকওয়ে। সোমবার তুরাগ পাড়ে গিয়ে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। নদীতে নৌকা চলছে। চলছে ইঞ্জিন বোট। কড়া রোদেও নদীর পাড়ে গড়ে তোলা ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটতে দেখা গেল নানা বয়সীদের। আকর্ষণীয় ওয়াকওয়ে আস্তে আস্তে বিনোদনপ্রেমীদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন তুরাগ নদের ওয়াকওয়েতে হাঁটছে শত শত মানুষ। সেখানে নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, যুবক, যুবতী থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ আনন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। আর প্রাণভরে নিশ্বাস নিচ্ছেন। সে এক অন্য রকম অনুভূতি। যা না গেলে বোঝা

যাবে না। নদীর ওপারে ঘনসবুজ কাঁশবন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গেলে ফিরতে মন চায় না।

সোমবার দুুপুর সাড়ে বারোটার দিকে ঢাকা উদ্যানের পাশ দিয়ে যাওয়া তুরাগ নদের পাড়ে গড়ে তোলা ওয়াকওয়েতে কথা হচ্ছিল রাসেল আর হেনা নামের দুই যুবকের সঙ্গে। তারা গলাগলি ধরে যাচ্ছিলেন। দেখে না বোঝার কোন কারণই নেই যে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বলছিলেন, আমরা ঢাকা উদ্যানের জেটি ঘাটের পাশের আদিবা গার্মেন্টসে চাকরি করি। তীব্র রোদের মধ্যেও ওয়াকওয়ে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই একগাল হেসে নিলেন।

বললেন, আগে এখান দিয়ে বাসায় যেতাম না। ভেতর দিয়ে টেম্পো বা রিক্সা বা হেঁটে যেতাম। ওইসব রাস্তায় তীব্র যানজট

থাকে। সঙ্গে ধুলা ফ্রি। বাসায় যাওয়ার পর ধুলোয় সারা গায়ে মনে হতো পাউডার মেখে দিয়েছে। এখন রোজ ছুটি শেষে তুরাগ নদের পাড় ঘেঁষে গড়ে তোলা ওয়াকওয়ে দিয়ে হেঁটে যাই। ধুলা বালি নেই। নির্জন রাস্তা। নদীর কলতান। কি সুন্দর পরিবেশ। ঠাণ্ডা বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। পয়সা বাঁচে। নদের ওপারের সবুজ গাছ গাছালি দেখতেই মন ভাল হয়ে যায়। তাই অনেক পরিশ্রমের পর যখন বাসায় ফিরি তখন এখান দিয়ে হেঁটেই ফিরি। এতে বাসায় যাওয়ার পর মনেই হয় না, এত পরিশ্রম করে বাসায় ফিরলাম। যেদিন বিকেলে ডিউটি থাকে না, সেদিন গার্মেন্টসের সবাই যোগাযোগ করে ওয়াকওয়ে দিয়ে হাঁটি। দিনকে দিন

সুন্দর হচ্ছে তুরাগ।

তারা আরও জানান, শুধু আমরাই নই। প্রতিদিন অনেক দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে তুরাগের পাড়ে। সুন্দর হাঁটার রাস্তা হয়েছে। নদীর পাড়ে বসে থাকা যায়। কোন বখাটের উৎপাত নেই। ছিনতাইকারী, নেশাখোর নেই। সন্ধ্যার পরে আরও সুন্দর লাগে। কারণ দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা কাজ চলছে। ভেকু (এসকেভেটর) দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে। ইট, বালু, সিমেন্ট আর রড বোঝাই জাহাজ ভিড়ছে যখন তখন। এসব জাহাজের বড় বড় লাইট পুরো এলাকা আলোকিত করে রাখছে।

আবার রাস্তা যেখান দিয়ে তৈরি হচ্ছে, সেখানে খানিক দূরে দূরেই বড় বড় লাইট লাগানো। সন্ধ্যা নামলেই দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই রাত দশটা এগারোটা নাগাদও নদের

পাড়ে ঘুরে বেড়ান। শীতল বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তবে নদ শাসনের কারণে অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন দৃষ্টিনন্দন কাজ হওয়ার কারণে তারাও সেই দুঃখ ভুলে গেছেন। কেউ কেউ শৈশবের প্রমত্তা তুরাগের গল্প করছেন। আবার তুরাগ আগের অবস্থায় ফিরছে। ভাবতেই ভাল লাগছে বলেও জানালেন অনেকেই। এক সময় কত মাছ ধরা পড়ত। হাজার হাজার পাখির কল কাকলিতে মুখরিত থাকত তুরাগ। নদীখেকোদের কারণে সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আবার তুরাগ সেই অবস্থায় ফিরছে। এতে নদের পাড়ের মানুষ দারুণ খুশি।

তুরাগ রক্ষায় সরকারের নেয়া উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন অনেকেই। বলছেন, ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত নদী রক্ষায় যুগান্তকারী রায় দেয়। সেই রায়ের প্রেক্ষিতেই খানিকটা

দেরিতে হলেও সরকার প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক বৈঠকে ঢাকার চারপাশের নদী ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ বন্ধ ও নাব্য ফিরিয়ে এনে নদী রক্ষায় টাস্কফোর্স গঠন করে দেন। এ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুলাইতে শুরু হয়ে ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। প্রকল্পটির নাম দেয়া হয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালুনদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প। সে মোতাবেক ইতোমধ্যেই নির্দিষ্ট নদ ও নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে তুরাগ নদের

দুই পাড়ের সীমানা পিলার স্থাপনসহ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ শুরু হয়।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ-এর যুগ্ম পরিচালক ও ঢাকা নদী বন্দরের নিয়ন্ত্রক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, তুরাগ নদের দুইপাড়ের অন্তত দশ হাজার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদের কাজ প্রায় শেষ। এখন নদের পাড়ের ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। নদের অনেক জায়গায় খাড়া মোটা দেয়াল তৈরির কাজ চলছে। অনেক জায়গায় নদী রক্ষা বাঁধ তৈরি হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় হচ্ছে। যার মধ্যে ঢাকা উদ্যানের পাশে কয়েক কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। ওয়াকওয়ে দৃষ্টিনন্দন করতে আরও কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো চলছে। এজন্য সেখানে একটি অস্থায়ী

জেটি ঘাট করা হয়েছে। যেখানে নদের পানির স্রোতের তীব্রতা বেশি, সেখানে ঢালু করে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। যাতে ঢেউ এসে পাড়ে আছড়ে পড়ে তীর ভাঙতে না পারে। এজন্য ওয়াকওয়ে তৈরির পর নদের দিকে ব্লক দেয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে তুরাগ নদের মিরপুর ছোট দিয়াবাড়ি এলাকাতেও। সেখানে তুরাগ নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা কোন স্থাপনা নেই। পুরো এলাকা শূন্য। চোখ অনেক দূর চলে যায়। কোথাও আর অবৈধ স্থাপনার কারণে দৃষ্টি আটকায় না। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও ছোট দিয়াবাড়ি ঘাটে দাঁড়ালে দৃষ্টি একহাজার গজও সামনে যেত না। অবৈধ স্থাপনার কারণে দৃষ্টি আটকে যেত। ছোট দিয়াবাড়ি

খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ দিকে অনায়াসে গাবতলী ব্রিজ আর উত্তর দিকে চটবাড়ি পর্যন্ত দেখা যায়।

তুরাগের পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠেছিল ইট, বালু, সিমেন্ট, কাঠসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এক সময় এসব দোকানের আড়ালে যে একটি নদ ছিল, তা কারও বোঝারও উপায় ছিল না। এখন অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়ায় নদ স্পষ্ট হয়েছে। নদের তীর ঘেঁষে প্রভাবশালীদের বাড়ি, ঘর, দোকানপাট, অবৈধ বালু তোলার উঁচু স্থাপনা, বহুতল ভবনসহ নানা ধরনের স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা ছিল। নানা আপত্তি, বাধার পরেও এসব আর টেকেনি। নদের আশপাশের এলাকার মানুষ তুরাগ নদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

নদটির পশ্চিম দিকে সাভার থানাধীন কাউন্দিয়া

ইউনিয়ন। ইউনিয়নটি ঢাকা-১৪ আসনের অধীন। কাউন্দিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দাবি, নদ পাড় হলেই ঢাকা। নদীতে সারাবছরই তীব্র স্রোত থাকে। নদ পাড় হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে। বালুবাহী বা সিমেন্ট বোঝাই জাহাজের ধাক্কায় মানুষবাহী নৌকা ডুবে যায়। এতে বড় মানুষও মারা যায়। আবার কাউন্দিয়া এলাকার অনেক কোমলমতি ছেলে মেয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করে। অনেক সময় নৌকার ধাক্কায়, স্রোতে নৌকা উল্টে বা সিমেন্ট বা বালুবাহী জাহাজের ধাক্কায় নৌকা ডুবে কোমলমতি ছেলে মেয়েদের সলিল সমাধি হয়। যা বড়ই বেদনার। তাই সরকার যেন নদটির ওপর দিয়ে একটি ব্রিজ করে দিয়ে এলাকাবাসীকে নিরাপদ করে। এমনটাই দাবি করেছেন নদের পাড়ের

প্রায় সবাই।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT