ঢাকা, Friday 17 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

দুই ভিন্ন মেরুতে নিজেদের আবদ্ধ রেখেছিল বেশিরভাগ দেশ

প্রকাশিত : 10:38 AM, 23 December 2020 Wednesday
72 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকায় যে টানাপোড়েন, তা হয়েছিল বৃহৎ শক্তির, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার জন্য। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পত্র লিখে বলেন, ‘চীনের সরকার ও জনগণ সব সময় পাকিস্তান সরকার ও জনগণের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষায় পাকিস্তানকে সমর্থন জানাবে। জাতিসংঘের পক্ষে এক বার্তায় বলা হয়, ‘মিশন মানবিক বিপর্যয় রোধে কাজ করবে, শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এভাবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ দেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বিশে^র প্রভাবশালী দেশগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হয়। যা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।

এ দেশের মানুষ যখন পাকিস্তানের কাছ থেকে মুক্তির জন্য জীবনপণ লড়ছে,

তখনকার পৃথিবী ছিল একেবারে ভিন্ন। দুটো ভিন্ন মেরুতে নিজেদের আবদ্ধ রেখেছিল বেশিরভাগ দেশ। বৃহৎ শক্তির দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে ঠাণ্ডা লড়ইয়ে যুক্ত হয়েছিল এ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে, অন্যদিকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (যার সবচেয়ে প্রভাবশালী অংশ ছিল আজকের রাশিয়া) এবং ভারত ছিল বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পক্ষে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়া বিশ^ রাজনীতির প্রতিচ্ছবি ওঠে আসে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মধ্য দিয়ে। মূলত বিদেশী সাংবাদিকরাই শক্তিশালী দেশগুলোর অবস্থান তুলে ধরেন তাদের লেখনিতে। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, পাকিস্তানের সাংবাদিকদের অনেকে নিজ দেশের পক্ষে ছিলেন না। তাদের লেখনিতে পাকিস্তানী সেনাদের

বর্বর হত্যা ও নির্যাতনের ভয়াবহতা যেমন ওঠে আসে তেমনি বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের থলের বিড়ালও প্রকাশ পায়।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন ওয়াশিংটন থেকে বেঞ্জামিন ওয়েলসের ‘হেরাল্ড ট্রিবিউনে প্রকাশিত’ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘পাকিস্তান উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র পাচ্ছে’। খবরে বলা হয়, ‘আট হাজার টনী পাকিস্তানী জাহাজ ‘সিপসাহ’ সম্প্রতি করাচীতে উত্তর কোরীয় হালকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ খালাস করছে বলে গতকাল এখানে ওয়াকিবহাল মহল জানায়। সূত্র জানায়, উত্তর কোরিয়ার হাংন্যাম থেকে জাহাজটি ১৮ সেপ্টেম্বর করাচী বন্দরে পৌঁছায়’। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘লা লিবর বেলজিক’ (ব্রাসেলস) এ প্রকাশিত সম্পাদকীয়র শিরোনাম করা হয়, ‘বৃহৎ শক্তিগুলোর দায়িত্ব’। এতে বলা হয়, ‘…এটা কি অনুমোদনযোগ্য

যে আন্তর্জাতিক কৌশলের নামে যুক্তরাষ্ট্রে এক হাতে বাঙালীদের দেশত্যাগে বাধ্য করা পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দকে অস্ত্র সরবরাহ করবে এবং অন্য হাতে ওউ শরণার্থীদেরই প্রবাসে বেঁচে থাকার জন্য সাহায্য বিলাবে?’

১৯৭১ সালের ২০ অক্টোবর ‘দি গ্লোব এ্যান্ড মেইল’ (টরেন্টো)-তে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘চরম উত্তপ্ত এশিয়া’। একই বছরের ২৫ অক্টোবর ‘নিউজউইক’ উইলিয়াম পি বান্ডির প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিপর্যয় এড়ানো’।

ভারতের স্বীকৃতি ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ ॥ ডিসেম্বর মাসের তিন তারিখে ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর থেকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের বাইরে আমেরিকা, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং

ভারতের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক বাদানুবাদও শুরু হয়েছিল। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সোভিয়েত ইউনিয়েনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছিলেন।

আমেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে ভারতকে থামানো এবং পাকিস্তানকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করা। ভারতের উপর এক ধরনের সামরিক হুমকি তৈরি করতে বঙ্গোপসাগরে রণতরীও পাঠিয়েছিল আমেরিকা। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ১৯৭১ সালের ‘ছয় ডিসেম্বর’ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত। হেনরি কিসিঞ্জার লিখেছেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীর দেয়া সেই স্বীকৃতির ফলে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার সব সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন ভারতকে দেয়া সব

ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। তবে ভারতের উপর এর প্রভাব পড়েনি। আমেরিকার এই সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনে কূটনীতিকরা কিছুটা বিস্মিত হন।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, অনেকে ভেবেছিলেন ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আমেরিকা যে ‘নিরপেক্ষ ভূমিকা’ পালন করেছিল, এবারও হয়ত দেশটি তেমন ভূমিকাই নেবে। এছাড়া, ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে ভারতের ব্যাপারে আমেরিকার সিদ্ধান্তকে ‘হাস্যকর’ হিসেব বর্ণনা করেছিল। ভারত যাতে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা বন্ধ করে সেই লক্ষ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। কারণ, মস্কো চেয়েছিল ভারত যুদ্ধে যাক।

জাতিসংঘে আলোচনা ॥ জাতিসংঘ

নিরাপত্তা পরিষদ ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান ইস্যুটি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাঠিয়ে দেয়। এর আগে পূর্ব-পাকিস্তানে যুদ্ধ বিরতি সংক্রান্ত প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে বারবার নাকচ করে দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের কোন ক্ষমতা নেই। এমন অবস্থায় পাকিস্তানী কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তেই থাকে। ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আমেরিকাকে জানিয়েছিলেন যে পূর্ব-পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আট ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটি হয়। কিন্তু ভারত এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে যুদ্ধ বিরতির কোন প্রস্তাব তারা মানবে না।

পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ বিরতি এবং ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ

পরিষদে যে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল, তাতে সমর্থন দিয়েছিল আমেরিকা। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই প্রস্তাবের পক্ষে ১০৪টি ভোট পড়েছিল এবং বিপক্ষে ছিল ১১টি ভোট। এই ভোটাভুটির পরদিন জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতীয় প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য নরেন্দ্র সিংকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, ‘আমরা যুদ্ধবিরতি করব না। অবশ্যই না। আমরা বোকা নই।’

পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে কিসিঞ্জারের উদ্বেগ ॥ আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার ‘হোয়াইট হাউস ইয়ারস’ বইয়ে লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আনা কোন যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মানবেন না ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। নিক্সনের বর্ণনা অনুযায়ী, শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়,

বরং পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরকে পাকিস্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী।

১৯৭১ সালে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, যিনি ১৯৮৯ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনের নির্দেশে বুশ জাতিসংঘে ভারতকে ‘হামলাকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

১৯৭১ সালে সোভিয়েত নেতা ব্রেজনেভের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর। এদিকে, আমেরিকার ক্রমাগত চাপের কারণে এক পর্যাযয়ে সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভ একটি প্রস্তাব দেন আমেরিকার কাছে। হেনরি কিসিঞ্জারের বর্ণনা মতে, ব্রেজনেভ যে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার অন্যতম বিষয় ছিল, ২৫ মার্চের আগে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যে পর্যায় থেকে আলোচনা

ভেঙ্গে দিয়েছিল, সেখান থেকেই পুনরায় আলোচনা শুরু করা। ব্রেজনেভের পরামর্শের ভিত্তিতে ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা করে আমেরিকা। এর ভিত্তিতে নতুন একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়।

তবে এই প্রস্তাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতীয় সৈন্য প্র্যতাহারের দাবি বাদ দেয়া হয়। পাকিস্তান এবং আমেরিকা চেয়েছিল আপাতত যুদ্ধ বন্ধ করে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১০ ডিসেম্বর সকালে এই প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন সোভিয়েত দূতের কাছে। কিন্তু এরপর ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কোন সাড়া মিলেনি। এরই মধ্যে মার্কিন রণতরীর একটি বহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হওয়ার জন্য নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার

তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানে যাতে কোন আক্রমণ না হয়, সেজন্য সতর্কবার্তা হিসেবে এই রণতরী পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।’ এই বহরটি তখন মালাক্কা প্রণালীর পূর্ব দিকে অবস্থান করছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন কর্নেল রিয়াজ জাফরী। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ২০১৬ সালে এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, পোল্যান্ডের প্রস্তাব মেনে নেয়ার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের ‘বিচ্ছিন্নতাকে’ মেনে নেয়া। কিন্তু ওই প্রস্তাব মেনে নিলে ভারতের হাতে আত্মসমর্পণ করতে হতো না বলে উল্লেখ করেন রিয়াজ জাফরী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বলেছিলেন, ‘আমরা পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করেছি।’

পাকিস্তানের বিপক্ষে

বিশ্বকে ক্ষুব্ধ করেছিল একটি প্রতিবেদন ॥ ‘আবদুল বারীর ভাগ্য ফুরিয়ে আসছিল। পূর্ববঙ্গের হাজারও মানুষের মতো তিনিও বড় একটি ভুল করেছেন – তিনি পালাচ্ছেন, কিন্তু পালাচ্ছেন পাকিস্তানী পেট্টোলের সামনে দিয়ে। তার বয়স ২৪, সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলেছে। তিনি কাঁপছেন, কারণ তিনি এখনই গুলির শিকার হতে যাচ্ছেন।’

এভাবেই শুরু করা হয়েছিল গত অর্ধশতকের দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী নিবন্ধগুলোর একটি। লিখেছেন এ্যান্থনি মাসকারেনহাস, একজন পাকিস্তানী সাংবাদিক। যার প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকায়। এই নিবন্ধের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো দেশটির পূর্ব অংশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দমন-পীড়ন আর নিষ্ঠুরতার বিষয়টি বিশ্বের সামনে উঠে আসে। বিবিসির মার্ক ডামেট লিখেছেন, এই প্রতিবেদন

বিশ্বকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ক্ষুব্ধ আর ভারতকে শক্ত ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেছিল।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে বলেছিলেন, লেখাটি তাকে এত গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল যে এটি তাকে ইউরোপীয় রাজধানীগুলো আর মস্কোয় ব্যক্তিগতভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দেয়, যাতে ভারত এক্ষেত্রে সশস্ত্র হস্তক্ষেপ করতে পারে।

পাকিস্তানের পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য আট সাংবাদিককে আনা হয়েছিল ঢাকায়। যখন তারা আবার পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান, তখন তাদের মধ্যে সাত সাংবাদিক পাকিস্তানী সরকারের চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট করেন। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম ঘটে করাচীর মর্নিং নিউজের সাংবাদিক এবং ব্রিটেনের সানডে টাইমস পত্রিকার পাকিস্তান সংবাদদাতা এ্যান্থনি মাসকারেনহাস। ইভোন মাসকারেনহাস স্মৃতিচারণা করছেন,

‘আমি কখনোই আমার স্বামীর এ রকম চেহারা দেখিনি আগে। তিনি ছিলেন খুবই ক্ষুব্ধ, চিন্তিত, বিষণ্ন আর আবেগী। ‘সরাসরি লন্ডন টাইমসের সম্পাদকের দফতরে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন সাংবাদিক। তিনি তাকে বলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানে পরিকল্পিত গণহত্যার একজন প্রত্যক্ষদর্শী এবং আর্মি অফিসারদের বলতে শুনেছি যে এটাই একমাত্র সমাধান।’ তারপর হ্যারল্ড ইভান্স প্রতিবেদনটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। সানডে টাইমস পত্রিকায় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, যার শিরোনাম ছিল, ‘গণহত্যা।’

জাতিসংঘের ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল ॥ এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ বইতে বলা হয়েছে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখের সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা

হয়… (পাক ভারত) উপমহাদেশের শরণার্থী পুনর্বাসন ও শান্তি ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের সক্রিয় কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে এমন মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে হবে যাতে করে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হয়।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘জাতিসংঘ যদি নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে পাকিস্তানে একটা রাজনৈতিক সুরাহার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, তাহলেই কেবল পাক-ভারতের বিস্ফোরণমুখী সীমান্ত থেকে সৈন্য প্রত্যাহার সম্ভব হবে এবং নিরীহ ও ভুখা বাংলাদেশের মানুষদের বাঁচানো যাবে।’

এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখা বইতে রয়েছে, ‘…পাকিস্তানী সৈন্য সীমান্তে এগুনোর ১১ দিন পর ১৩ অক্টোবর

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তে তাদের সৈন্য সমাবেশ শুরু করেন। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে দু’দল-দু’দলের দিকে নিশানা তাক করল-এদিকে পাকিস্তানী সৈন্য, অপরদিকে ভারতীয়রা। এ ব্যাপারটি প্রথম ঘটে ১৯৭১ সালের ২৪ অক্টোবর। সেই সময় ইন্দিরা গান্ধী ভাবলেন যে, বিশ^ জনমতকে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার সময় এসেছে।

‘… এই সময় প্রায় আড়াই সপ্তাহ ধরে ইন্দিরা গান্ধী ব্রাসেলস, ভিয়েনা, লন্ডন, অক্সফোর্ড, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, প্যারিস ও বন ঘুরলেন। উদ্বাস্তুদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ সাহায্যও পেলেন, কিন্তু পেলেন না কোন সমাধান। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকসন ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, ইয়াহিয়া খান তাকে পাক-ভারত সীমান্ত থেকে তার সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অতএব আপনার উচিত

হবে সমগ্র পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী অপসারণ করা…।’

৭ ডিসেম্বর তৎকালীন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ও ইউএসএসআর-এর প্রেসিডেন্ট লিওনিদ ব্রেজনেভ পোলেন্ডের ওয়ারশ নগরীতে অনুষ্ঠিত পোলিশ কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে বক্তৃতা দানকালে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ দ্ব্যর্থহীনভাবে যে রায় দিয়েছে সেই রায় এবং তখনকার জনগণের মৌলিক অধিকারের রক্তাক্ত পদ্ধতিতে দমন করার প্রচেষ্টা ও লাখ লাখ শরণার্থীর মর্মন্তুদ ঘটনার পরিণতি হচ্ছে এই যুদ্ধ।

দ্য সান বাল্টিমোর পত্রিকায় এক বিবৃতিতে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের জনৈক উচ্চপদস্থ সরকারী মুখপাত্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর প্রথম থেকেই ভারতীয় নীতির ফলে সঙ্কট আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বলে

মন্তব্য করেন।

গবেষক অস্ট্রিক আর্যুর ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে আরও বলা হয়েছে, ওই দিনই অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিগেল এইচ বোয়েন ‘দ্য ক্যানবেরা টাইমস’ এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে অস্ট্রেলিয়ার নিরপেক্ষ ভূমিকার কথা ঘোষণা করেন। ৭ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো এক বিবৃতিতে বলেন, যদি ভারত ও পাকিস্তান দুই যুদ্ধরত দেশ অনুরোধ করে, তাহলে ইন্দোনেশিয়া এই সংঘর্ষের মধ্যস্থতা করতে রাজি আছে।’

১২ ডিসেম্বর লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফি বলেন, জোট নিরপেক্ষ দেশসমূহ পাক-ভারত যুদ্ধ বন্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর কেনিয়ার সানডে পোস্ট পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তান যদি পূর্ব

বাংলার নির্বাচিত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে তাহলে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হবে এবং তার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া ছাড়াও অন্যান্য দেশকে নানা অসুবিধার হাত থেকে রক্ষা করবে।’ মার্কিন সাংবাদিক জোসেফ ক্রাফট ওয়াশিংটন পোস্টে ২৫ নবেম্বর এক নিবন্ধে লেখেন, এখন এ কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে, যখন গত মার্চ মাসে পূর্ব বাংলার সামরিক শাসন পুনরায় চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানী শাসকচক্র যতটুকু চিবুতে পারে তারচেয়ে বেশি মুখ গহবরে গ্রহণ করেছিল …।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন এক লেখায় বলেছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট ১৯৭১-এর মার্চের দিকে ঢাকা

থেকে জাতিসংঘের কর্মীদের প্রত্যাহার করে নিলেও গণহত্যা বন্ধে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি।

তার লেখার বলা হয়, ১৯৭১-এর ২৮ জুলাই জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি জন আর কেলি ঢাকায় আসেন। দুই আগস্ট জাতিসংঘ গঠন করে ইউনিপোরও বা ইউনাইটেড নেশনস ইস্ট পাকিস্তান রিলিফ অপারেশন। বলা হয়, এই মিশন মানবিক বিপর্যয় রোধে কাজ করবে, শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করবে না। পরে ২৩ এপ্রিল জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধি সমর সেন শরণার্থীদের জন্য সাহায়তা কামনা করেন। এর ফলে মহাসচিব উ থান্ট ১৯ মে বিভিন্ন দেশের সরকার, বেসরকারী সংস্থা ও জনগণের প্রতি বাঙালী শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। উ থান্টের এ আবেদনের পর বাংলাদেশ

সঙ্কট যেমন আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছিল…।’ বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকায় যে টানাপোড়েন, তা হয়েছিল বৃহৎ শক্তির, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার জন্য।

মার্কিন নীতি ও ভূমিকা এক রৈখিক ছিল না ॥ ‘মিথস এ্যান্ড ফ্যাক্টস : বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ারহাউ ইন্ডিয়া, ইউএস, চায়না এ্যান্ড দ্য ইউএসএসআর শেপড দ্য আউটকাম’ মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে রচিত একটি বই। লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক বি জেড খসরু। লেখকের দাবি অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের ভূমিকাও বিশ্লেষণ করেছেন। পৃষ্ঠা ৪১৯ : ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১, শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য আমেরিকার সহায়তা চেয়েছেন।

মার্কিন দলিলপত্রের আকার এবং জাতিসংঘের বিতর্কের বিবরণী দেখলেই ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্র মোটেই নিষ্ক্রিয় ছিল না। প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে দেশটির ত্বরিত ও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। মার্কিন দলিলপত্র, বিশেষ করে কংগ্রেস ও প্রতিনিধি পরিষদের বিতর্ক থেকে জানা যায়, একাত্তরে বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন নীতি ও ভূমিকা একরৈখিক ছিল না। অর্থাৎ এক আমেরিকা বহু নীতি।

সে সময় ওয়াশিংটনে কর্মরত বাংলাদেশের মাহবুবুল আলম লিখেছেন, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বের বৃহৎ শক্তির মধ্যে ভারত রাশিয়া আমাদের পাশে থেকে মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করলেও আমেরিকা ও চীন ছিল পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর পক্ষে ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে।

চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পত্র লিখে বলেন, ‘চীনের সরকার ও জনগণ সব সময় পাকিস্তান সরকার ও জনগণের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষায় পাকিস্তানকে সমর্থন জানাবে।

এক পর্যায়ে এসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরাশক্তির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। এই স্নায়ু যুদ্ধের অন্যতম কারণ ছিল মুক্তিযুদ্ধে অন্য দুই পরাশক্তি সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করায় পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে চীন ও আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। এ প্রেক্ষিতে ভারত রাশিয়ার সমর্থন চায়। সোভিয়েত রাশিয়া মুক্তিযুদ্ধকালে চীন ও আমেরিকাকে যুদ্ধে জড়িত হওয়া থেকে বিরত রাখে। জাতিসংঘে আমেরিকা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা পালন

করে।

লরেন্স লিফশুলজ তার আন ফিনিসড রেভ্যুলেশন গ্রন্থে লিখেন, মোশতাকের দলের সঙ্গে আমেরিকার কর্মকর্তাদের কলকাতা ও অন্যান্য স্থানে ৮টি গোপন বৈঠক হয়েছে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ বাংলাদেশ বিষয়ে বক্তব্য পেশ করতে যাবেন। এই দুই বৃহৎ শক্তি পাকিস্তানকে অস্ত্রসহ যাবতীয় সাহায্য সহযোগিতা করে। শুধু তাই নয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা তার প্রভাব খাটায়। কোন দেশ যাতে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা ও সমর্থন না করে তার জন্য যা যা করণীয় তার সবই করে আমেরিকা।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT