ঢাকা, Thursday 23 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

তিস্তা ব্যারাজের কমান্ড এলাকায় বোরো সেচ উদ্বোধন ১৫ জানুয়ারি

প্রকাশিত : 09:06 AM, 7 January 2021 Thursday
53 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

দেশের সর্ববৃহৎ তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকায় চলতি বোরো (খরিপ-১) মৌসুমে সেচ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। আগামী ১৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সেচ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হবে। নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের তিন জেলার ১১ উপজেলায় এবার ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান প্রদানে টার্গেট নেয়া হয়েছে। এ জন্য সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত মৌসুমে ২৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানে টার্গেট নেয়া হলেও নদীতে বেশ পানি থাকায় সেচ প্রদান করা হয়েছিল ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে। সে হিসাবে এবার ১০ হাজার হেক্টর জমি বেশি সেচ পেতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বুধবার তিস্তা সেচ প্রকল্পের

পরিচালক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ বলেন, তিস্তা সেচ প্রকল্প থেকে এবার তিন জেলার ১১ উপজেলার ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হবে। এর মধ্যে নীলফামারী জেলার ৫ উপজেলার মধ্যে ডিমলায় ৫ হাজার হেক্টর, জলঢাকা উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টর, নীলফামারী সদরে ১১ হাজার হেক্টর, সৈয়দপুরে ৫ হাজার হেক্টর, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলায় ৮ হাজার, রংপুর সদর ৫ হাজার, তারাগঞ্জে ২ হাজার, বদরগঞ্জ উপজেলায় ৫শ’ হেক্টর, দিনাজপুর জেলার চিরিবন্দরে দেড় হাজার ও পার্বতীপুর উপজেলায় ৫শ’ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। তিনি জানান, এ মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজের জলকপাট বন্ধ করে সেচ

ক্যানেলে পানি নেয়া হবে। ‘রোটেশন পদ্ধতিতে এবার তিন জেলার ১১ উপজেলার ৬০ হাজার হেক্টরে সেচ প্রদানের আশা করছি। সেই সঙ্গে আমরা এবার এটি পূরণ করতে পারব।’

বুধবার সরজমিনে গেলে জানা যায়, কয়েকদিন ধরে উজানের পানি তিস্তা নদীতে ৯ হাজার কিউসেক প্রবাহিত হলেও বর্তমানে এটি কমে এসে ৪ হাজার থেকে ৫ কিউসেকে প্রবাহিত হচ্ছে। বিকেল পর্যন্ত পানি প্রবাহ ছিল চার হাজার কিউসেকের বেশি। যা অব্যাহত থাকলে এবার বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ নিয়ে আর ভাবতে হবে না।

তিস্তা নদী হলো উত্তরের জীবনরেখা। তিস্তা তার জলদুগ্ধে উত্তরের জীবনকে বাঁচিয়ে রাখে। কখনও প্রত্যক্ষভাবে, কখনও পরোক্ষভাবে। উত্তরের জনপদে তিস্তা অববাহিকার মানুষ তাই

তিস্তার কাছে ঋণী। সেচ নির্ভন বোরো আবাদে তিস্তার পানির ব্যাপক চাহিদা। আর অন্যদিকে উজানের পানি প্রবাহের উপর উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের ভাগ্য সেচের উপর নির্ভরশীল।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী দৈনিক জনকণ্ঠের এই প্রতিবেদককে জানান, উজানের পানি প্রাপ্তিতার উপর নির্ভর করে সেচ প্রদান। এরপরেও রবি ও খরিপ-১ মৌসুমে বোরো মৌসুমে সেচ প্রদানের একটি টার্গেট রাখা হয়েছে ৬০ হাজার হেক্টর।

এদিকে মহাপরিকল্পনা নিয়ে তিস্তা অববাহিকার মানুষজন আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। পদ্ম সেতুর পর তিস্তা অববাহিকার চিত্র পাল্টে যাবে মহাপরিকল্পনায়। এই খবর এখন তিস্তা অববাহিকার সঙ্গে জড়িত লাখো পরিবারের মাঝে খুশি বিরাজ করছে। তারা

পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের আশা করছে।

১৯৮৯ সালের পর তিস্তা নদীকে ঘিরে পেশাজীবী, মৎস্যজীবী, কৃষিজীবীসহ নানা পেশার হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে কয়েক হাজার মানুষ পথে বসে যায়। লাখ লাখ হেক্টর ফসলের জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এক সময়ের বিত্তবান জোতদার কৃষক পরিবারগুলো রাতারাতি পথের ফকিরে পরিণত হয়ে যায়। নেমে আসে দরিদ্রতা। তিস্তা পাড়ে গৃহহীন মানুষরা ঝুপড়ি ঘরে বসবাস শুরু করে। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটে তাদের, দেখা দেয় মঙ্গা।

পরবর্তীতে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ বছরের ঐকান্তিক চেষ্টায় ও নানা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে তিস্তাপাড়ের মানুষকে নিয়ে আসেন। তিস্তা নদীর চরের বাড়িগুলোকে বন্যামুক্ত

করতে ভিটা উঁচু করে দেয়া হয়। বাড়িতে বাড়িতে খামার করতে সরকারী কর্মসূচী হাতে নেয়। গবাদি পশু পালনসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চরের নারীদের সম্পৃক্ত করাসহ শুষ্ক মৌসুমে নানা ফসল ফলাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। বিনামূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে কৃষক ও কৃষাণীদের সরকারীভাবে প্রশিক্ষণ দেয়। প্রায় প্রতিটি চরে জনসংখ্যার অনুপাতে প্রাথমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। চরবাসীর স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ৬ হাজার জনবসতি নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। চরে অভাবের সময় কর্মহীন মানুষের কাজ নিশ্চিত করতে বছরে দুই বার ৪০ দিন করে কর্মসৃজন কর্মসূচী সরকারীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।

তিস্তা নদীর বাংলাদেশ

অংশে নদীটির বিস্তৃত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুজ্জীবনে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। ‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এ্যান্ড রেস্টোরেশন’ নামে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে আনুমানিক আট হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি চীনের ঋণ সহায়তায় পরিচালিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে চীন তিস্তা নদীতে কি ধরনের প্রকল্প হতে পারে সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ধারণা নেয়ার জন্য জরিপ পরিচালনার কাজ শেষ করেছে। বর্তমানে পরিকল্পনাটি ইআরডির আওতায় রয়েছে। এই প্রকল্পটিতে তিস্তার উপকূল ব্যবস্থাপনা বিষয়ক নানা অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রীষ্মকালে পানি সঙ্কট দূর করতে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতারসহ নানা কারণে তিস্তা সমস্যার

কোন সমাধান এখনও হয়নি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যেহেতু তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি সেটি কাটিয়ে শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। প্রকল্পটিতে এখনও পর্যন্ত যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে তার মধ্যে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে নদীগর্ভে ড্রেজিং করা, রিভেটমেন্ট বা পাড় সংস্কার ও বাঁধানো এবং ভূমি পুনরুদ্ধার। এছাড়া বন্যা বাঁধ মেরামতেরও পরিকল্পনা রয়েছে।

তিস্তা সেচ প্রকল্পের পরিচালক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ বলেন, তিস্তা রেস্টোরেশন প্রকল্পে ‘তিস্তার বিস্তৃতি কোন এলাকায় হয়ত পাঁচ কিলোমিটার, কোথাও দেড় কিলোমিটার বা কোথাও তিন কিলোমিটার আছে। সেক্ষেত্রে এই বিস্তৃতি

কমিয়ে দেড় বা দুই কিলোমিটার কিংবা প্রকল্পের নক্সায় যা আছে সে অনুযায়ী করা হবে। ‘তিনি বলেন, এর ফলে তিস্তার পারে থাকা শ’ শ’ একর জমি বা ভূমি পুনরুদ্ধার হবে যা ভূমিহীন মানুষ কিংবা শিল্পায়নের কাজে লাগানো হবে। সেই সঙ্গে ড্রেজিং করে নদীর গভীরতা বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় তিস্তা চুক্তি সই হওয়ার ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার মুখে তা আটকে যায়। এরপর ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেন যে তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো হবে। কিন্তু এর পর পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও তিস্তা সমস্যার কোন সমাধান এখনও হয়নি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে মীমাংসা আসার সম্ভাবনা থাকলেও সেটি হয়নি।

চলতি বছরে বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে আসার কথা রয়েছে। ওই সফরে দ্বিপাক্ষিক কিছু ইস্যুতে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি হতেও পারে এমন আশা করছেন অনেকেই।

তিস্তায় যখন পূর্ণমাত্রায় পানি আসত তখন শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৬৫-৭০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হতো। সাধারণভাবে

ধান চাষ করলে যে ব্যয় হয়, সেচ প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে সেই ধান চাষ করলে ব্যয় হয় ২০ ভাগের ১ ভাগ।

ডালিয়ার জেলে হেকমত আলী (৫০) বললেন, আমরা সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিদিন দোয়া করে মাছ ধরতে তিস্তায় নেমে পড়ি। বর্তমানে নদীতে ৫ হাজার কিউসেক পানি। এই পানি যেন সারা শুষ্ক সময় ধরে থাকে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT