ঢাকা, Wednesday 22 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

জোয়ার আর বানের পানি মিলেই তীব্র জলোচ্ছ্বাস

প্রকাশিত : 07:59 PM, 23 August 2020 Sunday
57 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

দেশের উপকূলীয় আট জেলায় একযোগে বন্যা চলছে। এসব জেলার অন্তত ১২টি বড় নদীর পানি বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা থেকে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পরিস্থিত কোনো কোনো এলাকায় বেশ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের চেয়েও বেশি উঁচু ঢেউ ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে। এতে ভেসে গেছে ফসলের ক্ষেত, মাছের ঘের। শুধু গ্রাম নয়, বন্দর-শহরেও প্রবেশ করেছে এই পানি। সাগরের জোয়ার আর উজান থেকে নেমে যাওয়া বানের পানি মিলে সৃষ্টি হয়েছে এই জলোচ্ছ্বাস। এমন পরিস্থিতি আরও ৪৮ ঘণ্টা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি)।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম

সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উপকূলের এই জলোচ্ছ্বাসের পেছনে হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের একক দায় নেই। কেননা যে সময়ে জলোচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, তখন একই সঙ্গে তিনটি প্রাকৃতিক বিষয় ঘটমান ছিল। এগুলো হচ্ছে- অমাবস্যা, সুস্পষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুম। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবটা এক্ষেত্রে বেশ কাজ করেছে। কেননা সমুদ্রের পানির উষ্ণতা বেড়ে গেলে লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। অতি সক্রিয় মৌসুমের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব আছে। আর বৈশ্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরের পানির স্তর ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সে কারণে অন্যান্য নিয়ামক সৃষ্টি হলে সমুদ্রের বাড়তি পানিস্তর অতিরিক্ত ভূমিকা রাখছে। এছাড়া উজান থেকে নামা বন্যার পানিও দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা তথা জলোচ্ছ্বাসে ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা

জানান, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঘূর্ণিঝড় এবং এর থেকে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস মোকাবেলার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু বহু বছর পর তারা বন্যার মুখোমুখি হলেন। অমাবস্যায় এমনিতে ১ থেকে ২ ফুট বেশি সামদ্রিক জোয়ার থাকে। অমাবস্যার সময়ে সাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রায় ৬০ কিলোমিটার বেগে বায়ুপ্রবাহ ছিল। এই বায়ু সাগরের জোয়ারে বাড়তি ভূমিকা রাখে। এর সঙ্গে আরও শক্তি যুক্ত করে সক্রিয় মৌসুম। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানিস্তর এমনিতে ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার বেশি আছে। সবমিলে তৈরি হয়েছে জলোচ্ছ্বাস। উপকূলীয় বিভিন্ন নদ-নদী হয়ে এই পানি ঢুকে পড়েছে ভূ-ভাগের বেশ ভেতরে। এতে কোথাও বাঁধের ফাঁক গলিয়ে আবার কোথাও

বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। আবার কোথাও নদীর দুই তীর ছাপিয়ে শহর-বন্দর ও বাড়ির উঠানে পানি চলে গেছে। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার পাংশী গ্রামের বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব দিলারা বেগম যুগান্তরকে জানান, ২০ আগস্ট থেকে তার বাড়ির আঙিনায় চলে এসেছে জোয়ারের পানি। এর আগে ১৯৮৮ সালের বন্যায় এভাবে পানি এসেছিল। গত মে মাসের ঘূর্ণিঝড় আম্পানে উপজেলার অন্যান্য এলাকা জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হলেও তার বাড়ির আঙিনা তলায়নি।

সরকারি সংস্থা এফএফডব্লিউসির এ সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিবেদনেও দিলারা বেগমের অভিজ্ঞতার মিল পাওয়া গেছে। সংস্থাটির শনিবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, উপকূলীয় ৮ জেলার ১২ নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সংস্থাটি ১৪ পয়েন্টে

পানিপ্রবাহ পরিমাপ করে বলেছে, এর মধ্যে অন্তত ৬ স্থানের পানিপ্রবাহ ঘূর্ণিঝড় আম্পান সময়কালের চেয়ে বেশি।

এই ছয়টি স্থানের একটি বরিশালের কীর্তনখোলা। নদীটিতে ২০ আগস্ট পানির স্তর ছিল ৩ মিটারের বেশি। ২ মিটার ৫৫ সেমি. এর বিপদসীমা। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে এই নদীর পানি উঠেছিল ২ মিটার ৮৫ সেন্টিমিটার। ঝালকাঠিতে বিশখালী নদীতে আম্পানের সময়ে পানি উঠেছিল ২ মিটার ৩০ সেন্টিমিটার। ২০ আগস্ট এটি প্রবাহিত হয় ৩ মিটার ২৮ সেন্টিমিটার সমতলে। ভোলার দৌলতখানে সুরমা-মেঘনা নদীর বিপদসীমা ৩ মিটার ৪১ সেন্টিমিটার। কিন্তু ২০ আগস্ট প্রবাহিত হয় সাড়ে ৪ মিটার সমতলে। আর আম্পানের সময়ে এটিতে পানির সর্বোচ্চ স্তর ছিল ৩ মিটার ৭২

সেন্টিমিটার। একই জেলায় তেঁতুলিয়া নদীর বিপদসীমা ২ মিটার ৯০ সেন্টিমিটার। আম্পানে এটি সর্বোচ্চ ৩ মিটার ৪০ সেন্টিমিটার পানি প্রবাহ ছিল। ২০ আগস্ট এ নদীতে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৩ মিটার ৫৬ সেন্টিমিটার। এভাবে বরিশালে নয়াভাঙ্গানি ও হিজলায় ধর্মগঞ্জ নদীর পানি আম্পানের জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও বেশি বলে জানা গেছে।

বুয়েটের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০১৬ সাল থেকে প্রায় প্রতিবছরই দেশে বন্যা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরে প্রতিবছরই সৃষ্টি হচ্ছে ঘূর্ণিঝড়। একাধিক ঘূর্ণিঝড়ও হয়েছে কোনো কোনো বছর। এছাড়া অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ হয়েছে প্রায় প্রতিবছর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, এসব

ঘটনাই সেই শঙ্কার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এ কথায় বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দৃশ্যমান। সামনের দিনগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ আরও তীব্র, ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

এদিকে এফএফডব্লিউসি বলছে, উপকূলীয় জেলাগুলোয় জলোচ্ছ্বাসে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাতও একটি ভূমিকা রেখেছে। ১৭-১৮ আগস্ট থেকে কোনো জেলায় মাঝারি থেকে ভারি আবার কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। একই সঙ্গে সাগরের লঘুচাপ এবং অমাবস্যার প্রভাব থাকায় সাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে ১-২ ফুট অধিক উচ্চতার জোয়ার পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে কীর্তনখোলা, বিশখারী, বলেশ্বর, কচা, বুড়িশ্বর, সুমা-মেঘনা, তেঁতুলিয়া, নয়াভাঙ্গানি, ধর্মগঞ্জ, তড়কি, সুগন্ধা ও পশুর নদীতে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। ফলে খুলনা,

বাগেরহাট, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরগুনায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে।

এফএফডব্লিউসির নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূইয়া বলেন, উল্লিখিত জেলার নদনদীতে বিভিন্ন স্থানে পানি সমতল বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটারের বেশি উচ্চতায় অবস্থান করছে। জোয়ারের সময়ে পানি আরও বেড়ে যায়। তিন জেলায় এই জলোচ্ছ্বাস বা পানির সমতল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের অপেক্ষা অধিক উচ্চতায় গিয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি এই বন্যা পরিস্থিতি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উন্নতি ঘটতে পারে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, সাগরে ২৫ আগস্টের দিকে আরেকটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। ইতঃপূর্বে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপটি বর্তমানে ভারতের মধ্যপ্রদেশসহ পশ্চিমভাগ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। এর কারণে বাংলাদেশ ও ভারতে

প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও লঘুচাপের প্রভাবে আরও কয়েক দিন এমন বৃষ্টি হবে। এ কারণে ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও ভারি বৃষ্টি হতে পারে। আগামী তিনদিন এই বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT