ঢাকা, Friday 17 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

ঘটনার সময় বাড়িতেই ছিল বরখাস্ত কর্মচারী রবিউল!

প্রকাশিত : 05:37 PM, 16 September 2020 Wednesday
56 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার ঘটনায় আটক সাময়িক বরখাস্তকৃত সরকারী কর্মচারী রবিউল ইসলামকে নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। হামলার ঘটনায় তিনি কোনভাবেই জড়িত নয় বলে দাবি করেছে তার পরিবার। ইউএনও’র ওপর হামলার সময় এবং পরেরদিন রবিউল বাড়িতেই ছিলেন বলে দাবি করেছেন তার বড় ভাই শফিকুল ইসলাম।

অপরদিকে, পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিল রেখেই রবিউলকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এদিকে এই মামলার তদন্তের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার

ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলী শেখের ওপর হামলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। ওই হামলার ঘটনায় একমাত্র জড়িত ব্যক্তি হচ্ছে ইউএনও’র বাসার সাবেক কর্মচারী ও চাকরি থেকে সাময়িক বহিষ্কৃত মালি রবিউল ইসলাম। গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ তথ্য স্বীকার করেছে সে। তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর কেউ জড়িত নয় এমন স্বীকারোক্তিও দিয়েছে সে। মূলত তাকে চাকরিচ্যুত করার ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পনা করে ইউএনওর ওপর হামলা করে বলেও স্বীকার করেছে রবিউল ইসলাম। হামলার ওই রাতে ইউএনওর বাড়ি থেকে বেশ মোটা অঙ্কের টাকাও লুটপাট করেছে সে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রবিউলের এসব কথার সত্যতাও পেয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি তার দেয়া তথ্য

বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা পুলিশও একমত ঘটনার সঙ্গে সে জড়িত এবং তার সঙ্গে আর কেউ জড়িত নয়।

ওই কর্মকর্তা জানান, অভিযুক্ত রবিউলের কথার সঙ্গে সিসিটিভির ফুটেজ, প্রযুক্তির ব্যবহার ও আলামত উদ্ধারের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। রবিউলের দেয়া তথ্যমতে আলমারির চাবি, হাতুড়িসহ বেশকিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে রবিউল ইসলাম জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরে সে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ঘোড়াঘাটে বদলি হয় মালির পদে। পরে সেখানে কাজ করার সময়ই টাকা চুরি করে। সেই অপরাধে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয় এবং বিভাগীয় মামলা করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রবিউলের দেয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রায় চার মাস আগে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী

কর্মকর্তার ১৬ হাজার টাকা চুরি করে সে। পরে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হিসেবে নেয়া হয়। ওই সময়ে রবিউল ইউএনওকে অনুরোধ করেছিল, তাকে যেন কোন শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা না হয়। কিন্তু পরে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করায় তার মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায় যখন তার সংসারে অভাব দেখা দেয়। চাকরিরত অবস্থায় সে ১৭ হাজার টাকা বেতন পেত, কিন্তু চাকরি থেকে সাময়িক বহিষ্কারের পর, সে বেতন পেতে শুরু করে মাত্র নয় হাজার টাকা। এই অবস্থায় এক মাস আগে সে ইউএনওর বাড়িতে গিয়ে তার অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়ে আসে। কিন্তু এরপরও

তাকে ক্ষমা না করায় ক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তাই এমন হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে রবিউল ইসলাম। পরিকল্পনা মোতাবেক গত ২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয় রবিউল। দিনাজপুর জেলা শহরে এসে একটি বাসে করে রওনা দেয় ঘোড়াঘাটের উদ্দেশে। সে যখন ঘোড়াঘাট পৌঁছে, তখন রাত প্রায় ১০টা। বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাঘুরি করে রাত ১টা ১৮ মিনিটে ইউএনও’র বাড়িতে প্রাচীর টপকে সে প্রবেশ করে। এরপর চেয়ার নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। ব্যর্থ হয়ে কবুতরের ঘর থেকে মই নিয়ে আসে। মূলত এই মইটি রবিউল ইসলাম যখন চাকরি করত তখন নিজেই তৈরি করেছিল। এই মই দিয়ে ওঠার চেষ্টা

করে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে আবার সে মই রেখে আসে। তখন সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবারও সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে ইউএনও’র ঘরের ভেতরে প্রবেশ করবে। রাত সাড়ে তিনটার দিকে রবিউল মই বেয়ে বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ইউএনও’র ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। কিন্তু ওয়াশরুমের দরজা বাইরে থেকে আটকানো থাকায়, সে ইউএনওর বেডরুমে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। প্রায় আধাঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে সে ওয়াশরুমের সিটকিনি খুলে বেডরুমে প্রবেশ করে। এ সময় শব্দ পেয়ে ইউএনও জেগে যান। তখন তার মাথাসহ শরীরে পেছন থেকে হাতুড়ি দিয়ে পরপর কয়েকটি আঘাত করে রবিউল। এই হাতুড়িটি সে সঙ্গে করেই নিয়ে

গিয়েছিল। হাতুড়ির আঘাতে ইউএনও চিৎকার দিয়ে বিছানায় ঢলে পড়েন। তার চিৎকারে পাশের রুম থেকে বাবা ওমর আলী শেখ এগিয়ে এলে, তাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেয় সে। তাকেও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে সে। এরপর আলমারির চাবি ছিনিয়ে নিয়ে, আলমারি খুলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রায় সাড়ে চারটার দিকে সে আবারও ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে নিচে নেমে আসে। মইটি আগের জায়গায় রেখে প্রাচীর টপকে রাস্তায় গিয়ে ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী কোচে উঠে দিনাজপুরে চলে যায়। এরপর বিরলের গ্রামের বাড়িতে গোসল এবং নাস্তা সেরে আবারও শহরে ডিসি অফিসে চলে যায়। পরদিন যখন ইউএনও’র খবরে দেশব্যাপী হুলস্থূল পড়ে যায়, তখন

দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের অফিসেই দিনভর ছিল রবিউল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে পুলিশকে জানিয়েছে, ইউএনও’র বাড়ি থেকে যে টাকা সে নিয়ে এসেছিল, তার মধ্যে কিছু টাকা এলাকার একজনকে দিয়েছিল। যাকে টাকা দেয়া হয়েছিল, সে একজন জুয়াড়ি। ওই ব্যক্তিও টাকা গ্রহণের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে। তবে ওই লোককে জুয়ার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ইউএনওর বাড়িতে প্রবেশ করে রবিউল এসব কার্যক্রম চালালেও, ওই সময় প্রহরী নাদিম হোসেন পলাশ ঘুমিয়ে ছিলেন বলে জানিয়েছে রবিউল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রবিউল একটি ব্যাগে জামা-প্যান্ট ও হাতুড়ি নিয়েই ভেতরে প্রবেশ করেছিল। সে জানত, বাসায় সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। তাই তাকে যাতে

কেউ চিনতে না পারে এবং সিসি ক্যামেরায় যাতে তার চেহারা না চেনা যায়, সে জন্য সে মাস্ক ও টুপি পরেছিল।

সে রাতে সিসিটিভি ফুটেজে দুজন ব্যক্তিকে ওই বাসায় প্রবেশ করতে দেখা গিয়েছিল, এমন কথা পুলিশের পক্ষ থেকে বলার যৌক্তিকতা বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইউএনও’র বাসায় বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এগুলোর একেকটার অবস্থান, রেজ্যুলেশন ও সেখানে আলো পড়ার ধরনে ভিন্নতার কারণে, একই ব্যক্তিকে ভিন্ন রঙের পোশাক পরিহিত ও একাধিক ব্যক্তি হামলায় অংশ নিয়েছে বলে মনে হয়েছিল। পরে গোয়েন্দা বিশ্লেষণে হামলাটিতে একজন ব্যক্তিই অংশ নেয় এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

এদিকে রবিউলকে আটক করার পর থেকে শোকে কাতর

হয়ে পড়েছেন তার মা রহিমা বেগম। তার দাবি ইউএনওর ওপর হামলার দিন রবিউল বাড়িতেই ছিল। সন্ধ্যার সময় পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে টিভি দেখেছেন। রাতে একসঙ্গে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে রবিউল। তিনি জানান, ঘটনার পরের দিন রবিউল আমাদের বলেছিল ‘আমি যদি ঘোড়াঘাটে উপস্থিত থাকতাম, তাহলে আমাকেও ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় ফাঁসানো হতো। ভাগ্যিস আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না’। রবিউলের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিন আমরা একসঙ্গেই ছিলাম। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে রবিউল বাড়ির গরু-ছাগলের জন্য ক্ষেতে ঘাস কাটতে যায়। ঘোড়াঘাটে ইউএনওর অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় ইতোপূর্বে রবিউলের সঙ্গে একটা অন্যায় করা হয়েছিল।

সেখানে ৫০ হাজার টাকা চুরির ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু ওই চুরির ঘটনার সঙ্গে কোনভাবে জড়িত ছিল না দাবি করেন তার মা। রবিউলের ভাবি শিউলি বেগম জানান, আটকের পর ডিবি পুলিশ বাড়িতে এসে রবিউলের ব্যবহৃত চারটি শার্ট, চারটি প্যান্ট, একটি হাঁসুয়া, একটি লোহার রড নিয়ে গেছে। এছাড়াও রবিউলের শ্বশুরবাড়ি থেকে একটি হাতুড়ি নিয়ে গেছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT