ঢাকা, Tuesday 28 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

করোনায়ও জাতীয় রুচি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে একুশের গ্রন্থমেলা

প্রকাশিত : 09:49 AM, 11 January 2021 Monday
60 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

নিজের ভাষা ও সাহিত্য ঘিরে বাঙালীর যে আবেগ যে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস সবই, বলা চলে, অমর একুশে গ্রন্থমেলার জন্য তোলা থাকে অথচ সে আয়োজনটিই কিনা এবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কোভিড পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারির মেলা শেষতক কবে শুরু করা যাবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনা-সমালোচনায় অংশ নিলেও পরিষ্কার কোন প্রস্তাবনা দিতে পারছে না। এ অবস্থায় কিছুটা ব্যতিক্রম মেলা পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য এনামুল করিম নির্ঝর। করোনাকালে বইমেলার আয়োজনটি যখন চ্যালেঞ্জের মুখে তখন নানা প্রস্তাবনা নিয়ে সরব হয়েছেন তিনি। সামনে এসেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কথা হয় জনকণ্ঠের সঙ্গে। একান্ত সাক্ষাৎকারে এনামুল করিম নির্ঝর বলেন, করোনাকালেও

সফলভাবে বইমেলা আয়োজন সম্ভব এবং একইসঙ্গে বিশেষ কিছু করে দেখানোর সুযোগ আছে। তার মতে, জাতীয় রুচি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে একুশের বইমেলা। তবে এ জন্য মেলা যখনই হোক, আর কালক্ষেপণ না করে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, আগেই পরিকল্পনা সেরে রাখা গেলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে মেলা ঘিরে একটি নবজাগরণও সৃষ্টি করা সম্ভব হবে হতে পারে। মেলা এবার একইসঙ্গে বাস্তবে এবং ভার্চুয়ালি আয়োজন করার পরামর্শ তার। এনামুল করিম নির্ঝর স্বনামধন্য স্থপতি। চলচ্চিত্র পরিচালক। শিল্পী। যুক্ত রয়েছেন লেখালেখির সঙ্গেও। আছে আরও নানা পরিচয়। তবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটিতে নাম লেখানোর পর থেকে আলাদাভাবে আলোচনায়।

অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে গত দুটি মেলার বিন্যাসে, সজ্জায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে আয়োজক বাংলা একাডেমি। সরকারী প্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধ সত্ত্বেও নির্ঝরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন উন্নত আধুনিক নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে।

কিন্তু এবার কী হবে? জানতে চাইলে নির্ঝর একটু পেছনে ফিরে যান। বলেন, প্রথমবার কাজটি করতে গিয়ে আমি শিখেছি। শেখা বলব না, এক ধরনের অবলোকন। দেখেছি শুধু। দ্বিতীয়বার আমি শিখেছি। আর এবার তো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। আমাদের জন্য বিরাট এক উপলক্ষ। আবার একই সময় বড় বাধা হয়ে এসেছে করোনা। তাই এবারের প্ল্যান, আমি বলব, আবিষ্কার করা। সংক্রমণের মধ্যেও বিগত দিনের শিক্ষা কাজে লাগিয়ে কতটা ভাল

করা যায় কীভাবে করা যায়, একাডেমি রাজি থাকলে, সেটাই আবিষ্কার করার চেষ্টা করব।

কিন্তু মেলা আয়োজন নিয়েই তো অনিশ্চয়তা। আয়োজক বাংলা একাডেমি, এমনকি প্রকাশকদের একাংশ এখনও দোলাচলে। আপনি বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন? জবাবে শঙ্কা সংশয় সব একরকম উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, করোনা অবশ্যই একটা বাস্তবতা। ঠিক আছে। কিন্তু করোনার মধ্যে আমরা কি খাচ্ছি না? আমরা কি চিন্তা করছি না? অন্যান্য যা কাজ, করছি না? করছি তো। একইভাবে বইমেলা করা সম্ভব। আয়োজনটি আমাদের মেধা চর্চার সঙ্গে জড়িত, চিন্তার সঙ্গে জড়িত। তাছাড়া আগেই বললাম, সুবর্ণজয়ন্তীর বিরাট উপলক্ষ আমাদের সামনে। উপলক্ষটি মিস করা উচিত হবে না বরং উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে নবজাগরণ সৃষ্টি করা সম্ভব। কোভিডকালে সার্বিকভাবে মানুষের মনে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে তা থেকে উদ্ধারেও ভূমিকা রাখতে পারে এবারের বইমেলা।

নির্ঝরের পরের কথাটি আরও বেশি মনোযোগ দাবি করে। তিনি বলেন, যখন কোন সমস্যা সামনে আসে তখন সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়। আমি তো বলব, এবার নতুন কিছু করে দেখানোর বিরাট সুযোগ পেয়েছে বাংলা একাডেমি। কত ভালভাবে সুব্যবস্থাপনায় একটা মেলা আয়োজন করা যায়, তারা তা করে দেখাতে পারে।

এ ক্ষেত্রে আপনার নিজের পরামর্শ কী? বৈরী সময়ে মেলার পরিকল্পনা কেমন হওয়া উচিত? আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন? প্রশ্নের উত্তরে নির্ঝর বলেন, আমি তো অনেক আগে থেকেই এই ভাবনার

মধ্যে আছি। বইমেলাটা আমার কাছে ছোট জিনিস মনে হয়নি কখনই। এটা শুধু বই কেনা-বেচার জায়গা নয়। এটা দেশের মানুষের মেধা মনন ও রুচি চর্চার যোগসূত্র হতে পারে। সে ভাবনা এবং কোভিডের কথা মাথায় রেখে আমি এ প্ল্যান, বি প্ল্যান, সি প্ল্যান প্রস্তুত করেছি। যে কোন একটি কার্যকর করা গেলে আর কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।

সব মিলিয়ে যদি ছোট একটি ধারণা দিতে বলি, তাহলে সেটি কেমন হতে পারে? জবাবে পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমত বলব, একইসঙ্গে বাস্তবে এবং ভার্চুয়ালি মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। বাস্তবে বলতে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আয়োজনটি। মাঠের মেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা

খুব জরুরি। সে জন্য মেলাটিকে কতগুলো অঞ্চলে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। একটি এলাকায় শুধু প্যাভিলিয়ন রাখা যেতে পারে, যেখানে থাকবে অপেক্ষাকৃত বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। আরেকটি এলাকায় থাকল এক বা একাধিক ইউনিটের স্টল। অপেক্ষাকৃত ছোট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেখানে স্থান দেয়া যেতে পারে। লিটলম্যাগের জন্য থাকতে পারে আলাদা কর্নার। এভাবে মেলাটিকে ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। পাঠক সে অনুযায়ী, তার গন্তব্য ঠিক করে নেবেন। এর ফলে সংক্রমণের মধ্যে অতিরিক্ত ঘোরাঘুরির প্রয়োজন হবে না।

তিনি বলেন, মেলায় লোকসমাগম সীমিত রাখার বিষয়েও কথা হচ্ছে। শুনছি। আমিও মনে করি আগে থেকে রেজিস্ট্রেশন করে মেলায় প্রবেশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হবে না। তবে একেবারে নতুন যে প্রস্তাবটি নির্ঝর দেন সেটি হচ্ছে, মেলা পরিচালনা কমিটিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংশ্লিষ্ট করা এবং তাদের গাইডলাইন নেয়া।

আপনি একইসঙ্গে ভার্চুয়ালি মেলার কথা বলছিলেন। সেই পরিকল্পনাটা কেমন? খুব সহজ, চটজলদি উত্তর নির্ঝরের। বলেন, অনলাইনে মেলার বই সম্পর্কে সকল তথ্য সুন্দরভাবে গুছিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। তাহলে মেলায় আসার পূর্বেই পাঠক তার প্রয়োজনীয় বই ও স্টল সম্পর্কে জেনে আসতে পারবেন। সরাসরি স্টলে গিয়ে বই সংগ্রহ করতে পারবেন তারা। কোভিড পরিস্থিতির কারণে অনেকে মেলায় নাও আসতে পারেন। তাদের জন্য অনলাইনে বই ক্রয়ের ব্যবস্থা রাখা যায়। অনলাইনে অর্ডার সংগ্রহ করে পাঠকের

কাছে বই সরবরাহের কাজ সারা বছর যেসব প্রতিষ্ঠান করছে, আমি জানি না কোন বাধা আছে কিনা, প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে চুক্তি করতে পারে পারে বাংলা একাডেমি।

এ প্রসঙ্গে আরও যে নতুন প্রস্তাবটি রাখেন নির্ঝর সেটি একইসঙ্গে অভিনব। তিনি বলেন, প্যাভিলিয়ন ও স্টল সীমিত রেখে তার তুলনায় অধিকসংখ্যক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে একই স্টল বা প্যাভিলিয়ন একাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা সময়ে ব্যবহার করবেন। একাংশ যখন স্টল ব্যবহার করবে অন্য অংশটি তখন ব্যবহার করবে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম। বই টানাহেঁচড়া করা লাগবে না, সেই ব্যবস্থাও করা যাবে।

তা, এইসব আগাম ভাবনা সংশ্লিষ্টরা নেয়ার জন্য

কতটা প্রস্তুত বলে মনে করেন? জবাব দেয়ার সময় হতাশা আড়াল করতে পারেন না নির্ঝর। বলেন, আসলে আর্কিটেক্টের কাজকে অনেকে মনে করেন শুধু একটি প্ল্যান এঁকে দেয়া। কতগুলো স্টল হবে, কতগুলো বইয়ের দোকান হবে, কতগুলো টয়লেট, এন্ট্রি ক’টা হবে, বুঝে নিয়ে সাজিয়ে দেবে, ব্যস। আসলে তো তা না। আর্কিটেক্টের কাজ হচ্ছে পুরো বিষয়টিকে ব্যবহারোপযোগী করা। সার্থক করা। সফল করা। এ জন্য তাকে অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে ব্যাপ্তিটা বুঝতে হয়। তার পর ব্যবহারিক জায়গায় নিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে গ্রাফিক ডিজাইন আছে। চিন্তার কাজ আছে। কপি রাইটিংয়ের কাজ আছে। আর্কিটেকচারের কাজ আছে। অনেক কিছু আছে।

আমি হয়ত অভিজ্ঞতার কারণে নিজেই সব করেছি।

তিনি বলেন, আদতে এটি একার কাজ নয়। আমি সবসময় এর সঙ্গে হয়ত থাকতেও পারব না। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে একটি আগ্রহী দল করা দরকার। সবাই মিলে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করা গেলে একুশের বইমেলাই জাতীয় রুচি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। তার এ মন্তব্যটি যে কোন বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়।

কিন্তু বাংলা একাডেমির সঙ্গে এসব চিন্তা শেয়ার করেছেন? তাদের মনোভাব কেমন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারী প্রতিষ্ঠান তো, নানা সীমাবদ্ধতা ওদের। অনেক সময় শেষ মুহূর্তে কাজ শুরু করার কথা বলে। এর ফলে সৃজনশীল অনেক ভাবনা শেষতক আর বাস্তবায়ন করা যায় না। শিল্পী হিসেবে

মনের ক্ষুধাটা থেকে যায়। তার চেয়ে বড় কথা, মেলাটি আরও যা হতে পারত, হয় না। বেশ মজা করেই নির্ঝর বলেন, ‘সরকারের কাজ এভাবে হয় না’, ‘সরকারের কাজ ওভাবে করতে হয়’ ইত্যাদি কথা প্রচুর শুনতে-টুনতে হয় আমার। কিন্তু মেলাটি তো মূলত নতুন চিন্তার মানুষের। রাজধানী শহরে বড় হওয়া প্রজন্মটির রুচির কথাও ভাবতে হবে। তাই আমি একাডেমিকে প্রায়শই বলি, চেষ্টা করলে অনেক কিছুই বদলানো যায়। আমরা কেন চেষ্টা করব না?

এ পর্যায়ে যে প্রশ্নটি জরুরী হয়ে সামনে আসে সেটি হচ্ছে, এনামুল করিম নির্ঝর সমকালের বিচারে খুবই চাহিদাসম্পন্ন একজন স্থপতি। নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত থাকেন। এর পরও,

যতদূর জানা যায়, একাডেমির কাজটি বিনা পারিশ্রমিকে, অনেকটা নিজে উদ্যোগী হয়ে করে দিচ্ছেন তিনি। এর ব্যাখ্যা কী? উত্তরে নির্ঝর বলেন, আমার এতক্ষণের আলাপে এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আছে। তারপরও বলি, বাঙালীর ভাষা আন্দোলনের গৌরবটুকু ধারণ করে আছে বইমেলা। এটি শুধু বই বেচাকেনার মেলা নয়, বাঙালী সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেয়ার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উর্ধে তুলে ধরার বড় সুযোগ। আর জাতীয় রুচি গঠনের ইস্যুটি তো বললামই। সব মিলিয়ে বইমেলার কাজটিকে আমি দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি, জব বা বিজনেস নয়।

একই বিবেচনায় মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান নিজেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যতটা সম্ভব তাকে উৎসাহিত করেন বলে জানান তিনি। বলেন, আগামীকাল মঙ্গলবার এবারের মেলা নিয়ে

একাডেমির সঙ্গে একটি মিটিং হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এবারের প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরব আমি।

একাডেমি তার কোন একটি প্ল্যানের সঙ্গে একমত হলে কোভিডের মধ্যেও মেলা সফল এবং সেইসঙ্গে বই বিক্রি দ্বিগুণ হবে বলে আশ্বস্ত করেন নির্ঝর।

অবশ্য শেষ কথাটি, বলার অপেক্ষা রাখে না, সময় বলবে। তথাপি এনামুল করিম নির্ঝরের কথা এক ধরনের আত্মবিশ্বাস জোগায়। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেয়। এই বা কম কিসে!

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT