ঢাকা, Monday 27 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

আঙুলের ছাপ না থাকায় চরম বিড়ম্বনায় রাজশাহীর এক পরিবার

প্রকাশিত : 12:12 AM, 24 December 2020 Thursday
352 বার পঠিত

| ডোনেট বিডি নিউজ ডেস্কঃ |

এক বিরল বংশগত সমস্যার কারণে একই পরিবারের দুই ভাইয়ের হাতের আঙুলে নেই ছাপ। রাজশাহীর পুঠিয়ার অপু সরকারের দুই হাতের আঙুলের দিকে তাকালে যদিও ভিন্ন কিছু মনে হবে না। তবে ২২ বছর বয়সী অপুর জীবন অনেকটা দুর্বিসহ করে তুলছে তার হাতের আঙুল।
অপুর দুই হাতের আঙুলে কোনো ছাপ নেই। শুধু তার নয়- তার বাবা, ভাই, জ্যাঠাসহ পরিবারের মোট ছয়জনের আঙুলেই কোনো ছাপ নেই। এক যুগ আগেও এটি হয়তো তেমন কোনো সমস্যা হিসেবেই গণ্য হতো না। তবে গত কয়েক দশকে আঙুলের ছাপের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে বহুগুণে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি যে বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়, সেটি

হচ্ছে আঙুলের ছাপ।
এই বিরল বংশগত সমস্যার নাম অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়া। সুইজারল্যান্ডের একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ইটিন এবং আরও কয়েকজন গবেষক এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০১১ সালে। ওই গবেষণায় তারা এই বংশগত বা জেনেটিক সমস্যার জন্য দায়ী জেনেটিক মিউটেশনটি শনাক্ত করেন। তাদের গবেষণার সময় পর্যন্ত সারা বিশ্বে মোট চারটি পরিবার শনাক্ত হয়েছিল, যারা বংশগতভাবে এই সমস্যায় ভুগছেন। এর সবগুলোই ছিল এশিয়া মহাদেশের বাইরে।
২০০৭ সালে এক সুইস নারী আঙ্গুলের ছাপ দিতে না পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দরে বারবার সমস্যায় পড়ার পর অধ্যাপক ইটিনের শরণাপন্ন হন। সেটিই ছিল তার কাছে এ ধরণের প্রথম কোনো রোগী।

পরবর্তীতে গবেষক দলটি ওই নারীর পরিবারের ১৬ জনের ওপর গবেষণা চালিয়ে বংশগত সমস্যার কারণটি খুঁজে বের করেন।
গবেষকদলটি এই রোগের আরেকটি নাম দেন – অভিবাসন বিলম্ব রোগ বা ইমিগ্রেশন ডিলে ডিজিজ। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে যখন জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আঙুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়। তখন থেকেই অপু সরকার আর তার পরিবারের সমস্যার শুরু। অপুর বাবা অমল সরকার যখন বারবার আঙ্গুলের ছাপ দিতে ব্যর্থ হন, তখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে ঠিক কী করবেন। পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এনআইডি কার্ডে লেখা হয় আঙ্গুলের ছাপ নেই।
এরপর থেকে সমস্যা শুধু বেড়েছেই। ২০১৬

সালে যখন মোবাইল সিম কার্ডের জন্য আঙ্গুলের ছাপ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়, তখন নতুন করে বিপদের মুখে পড়েন অপু সরকার। তিনি বলেন, যতবারই মোবাইলের জন্য সিম কিনতে গিয়েছি, ততবারই ফেরত আসতে হয়েছে। বাবা এবং আমার ছোট ভাইসহ আমাদের তিনজনের সিম মায়ের নামে তোলা।
মোবাইল ফোনের সিম ছাড়াও ২০১০ সাল থেকেই পাসপোর্ট ইস্যুর জন্য আঙুলের ছাপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই নিয়ম রয়েছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও। কয়েক মাস চেষ্টা করার পর সিভিল সার্জনের করে দেয়া মেডিকেল বোর্ডের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে শেষ পর্যন্ত পাসপোর্ট হাতে পান অমল সরকার। তবে বিদেশের বিমানবন্দরে গিয়ে আবার কি ঝামেলায় পড়তে হয়, সেই

ভয়ে এখনও বিদেশে ভ্রমণ করার সাহস করতে পারেননি তিনি। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এখন বিমানবন্দরে ভ্রমণকারীদের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়।
পেশায় কৃষক অমল সরকার চলাফেরার জন্য একটি মোটর সাইকেল ব্যবহার করেন। তবে তার কাছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ডটি নেই। তিনি বলেন, আমি রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দিয়েছি। তবে আঙুলের ছাপ না থাকায় আমাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়নি। অমল সরকারের বাবা এবং দাদারও একই সমস্যা ছিল। তারা দু’জনই ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বড় ভাই গোপেশ সরকার প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করার পর সম্প্রতি তার পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন।
দিনাজপুরের একটি হাসপাতালে চাকরি করেন গোপেশ সরকার। তার হাসপাতালে যখন কর্মচারীদের হাজিরার

জন্য আঙুলের ছাপ নেয়া শুরু হয়, তখন তিনি কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে পুরনো পদ্ধতিতে খাতায় স্বাক্ষর করেন। মেডিকেল বোর্ড তাদের এই সমস্যাকে ‘কনজেনিয়াল পালমোপ্লান্টার কেরাটোডার্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। অধ্যাপক ইটিন মনে করছেন, সরকার পরিবারের বংশগত কেরাটোডার্মাই সেকেন্ডারি অ্যাডারমাটোগ্লিফিয়ায় রুপ নিচ্ছে। ডারমাটোগ্লিফিয়ায় আক্রান্তরা হাত এবং পায়ের তালুর চামড়ায় শুষ্কতার সমস্যা এবং কম ঘাম অনুভব করার কথাও বলেন। অপু সরকারের পরিবারও একই ধরণের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।
অমল এবং গোপেশ সরকার ছোটবেলা থেকেই যেহেতু জানেন যে আঙুলের ছাপের এ সমস্যা তাদের বংশগত, তাই তারা কখনও চিকিৎসার চেষ্টাও করেননি। তবে হাতের তালুর চামড়ার খসখসে ভাব কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে কিছুদিন একটি

ক্রিম ব্যবহার করেছিলেন অমল সরকার।
সম্প্রতি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে স্মার্টকার্ড করেছেন অপু সরকার এবং তার বাবা। আঙুলের ছাপ দিতে পারেননি, তবে রেটিনা স্ক্যান করা হয়েছে তাদের। নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, স্মার্টকার্ডের তথ্য থেকে রেটিনা স্ক্যান বা ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমেও ভবিষ্যতে সিম কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। অমল সরকার বলছেন, কৃষিকাজ করলে তার হাতের চামড়া খুব সহজেই ফেটে যায় এবং সেটি তুলনামূলক খসখসে – এ নিয়ে তিনি এমনিতেই অস্বস্তিতে ভোগেন। তার ওপর এই সমস্যার কারণে পদে পদে অপদস্থ হতে হচ্ছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT