ঢাকা, Thursday 28 October 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

অন্তিম শ্রদ্ধার্ঘ্য

প্রকাশিত : 08:42 AM, 25 March 2021 Thursday
94 বার পঠিত

| ডোনেট বিডি নিউজ ডেস্কঃ |

দীর্ঘ প্রায় আটাশ বছর ধরে বহু সালাম স্যারকে দিয়েছি। অতি প্রয়োজনে, প্রয়োজনে এবং ভাব বিনিময়ে নিয়ত গভীর রাত অবধি কথা বলার অনুমতি দেয়াই ছিল। যখনই ফোন করতাম তখনই স্যারের উত্তর থাকত ‘বলো’। আর কথা শেষ হলে বলতেন ‘রাখ’। ‘বলো’ আর ‘রাখ’ শব্দ দুটি আর কোনদিন শুনতে পাব না। কারণ, স্যার এখন আর আমাদের মাঝে নেই। মহান সৃষ্টিকর্তা তার ইচ্ছায় স্যারকে আকস্মিকভাবে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। কর্মবীর আপনি এখন দূর আকাশের তারা। আমরা, স্যারের পরিবারের সকল সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী সকলেই রীতিমতো এতিম হয়ে গেলাম। বিশেষ করে দৈনিক জনকণ্ঠ ও গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প-পরিবারের সকল সদস্যের

জন্য তাঁর মহাপ্রয়াণ অপূরণীয় ক্ষতি সৃষ্টি করে গেল। কিন্তু স্যারের কর্মনিষ্ঠা আমাদের আমৃত্যু উজ্জীবিতই করে রাখবে। যতদিন এ মায়াময় পৃথিবীতে বেঁচে থাকব, ততদিন আপনাকে ভুলে যাওয়া অসম্ভব একটি বিষয়ে পরিণত হয়ে রইল। এটা স্যারের কর্মোদ্দীপনা, ন্যায়নিষ্ঠা, সততা বিশেষ করে এদেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগোষ্ঠীর জন্য তার আমৃত্যু লড়াইয়ের সফলতা। হাত খুলে লেখার সাহস জুগিয়েছেন, লিখেছি, প্রকাশ করেছেন। আর এ কারণে নানাভাবে নির্যাতনের খ—গও কম নেমে আসেনি। যে ইতিহাস বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও কখনও সামান্যতম বিরক্তির মনোভাব প্রকাশ করেননি। উল্টো উৎসাহ জুগিয়েছেন এগিয়ে যেতে। তাঁর সাহসে বলীয়ান হয়েছি সর্বদা। আমাদের মাঝে স্যার বেঁচে থাকবেন সবসময়।

স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মত্যাগের প্রয়াসের

মধ্যেই স্যারের কর্মজীবন সীমাবদ্ধ যেমন থাকেনি, তেমনি শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং গতানুগতিক ধারা দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে দেশের পাঁচটি বিভাগ থেকে সর্বপ্রথম একযোগে চার রঙের সংবাদপত্র দৈনিক জনকণ্ঠ স্যার প্রকাশ করে ইতিহাস গড়ে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল স্যারের জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি অধ্যায়। তিনি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেন তা স্যারের লেখা ‘যুদ্ধকালীন স্মৃতি’তে বিশদ বিবরণ রয়েছে, যা রীতিমতো চমকানোর মতো। অদম্য সাহসে অস্ত্রের ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরে অংশ নিয়ে যাঁরা এদেশের স্বাধীনতা অর্জনে শামিল হয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম তিনি। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জেনারেল এমএ জি ওসমানীর সিএনসি গ্রুপের সদস্য ছিলেন তিনি। সে এক লম্বা ইতিহাস।

স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে দেশ গড়ার সংগ্রামে আত্মনিয়োগ

করেও আরেক সফলতা অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন দৈনিক জনকণ্ঠসহ বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠান। গড়ে তুলেছেন শিল্পগোষ্ঠী ‘গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার।’ এ পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছয় সহস্রাধিক কর্মীকে নিয়ে স্যারের সংগ্রাম ছিল আমৃত্যু। একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা, সফল সম্পাদক স্যার। একদিকে যেমন ছিলেন জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, তেমনি মুদ্রক প্রকাশকও বটে।

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর এদেশের ইতিহাস যেমন বিপরীত ¯্রােতের দিকে এগোতে থাকে, ঠিক ওই সময়ে দৈনিক জনকণ্ঠ প্রকাশ করে আরেক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এ যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে লেখনী প্রকাশের মাধ্যমে এদেশের ইতিহাসকে সঠিক পথে এগিয়ে নেয়ার এক বন্ধুর সংগ্রাম। এ সংগ্রামেও স্যার বিজয়ী হয়েছেন। নীতি পরিবর্তনে কখনও ব্যত্যয়

ঘটেনি। শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সরকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দৈনিক জনকণ্ঠের ভূমিকা যে অপরিসীম তা কারও অস্বীকার করার উপায় নেই। বিএনপি, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এবং ১/১১ সরকার গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের আর্থিক মেরুদ- ভেঙ্গে দিয়ে শেষ করে দেয়ার অপপ্রয়াস চালিয়েছিল। কিন্তু স্যারের অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা এবং দুর্দান্ত সাহস এ অপপ্রক্রিয়াকেও দমাতে পারেনি। যখনই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির ওপর আঘাত এসেছে, তখনই অমিত বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আর এ কারণে জনকণ্ঠ ভবনকে উড়িয়ে দিতে টাইম বোমাও পোঁতা হয়েছিল। সত্যের ব্রত নিয়ে অবিচল অবস্থানকে এক চুলও নাড়াতে পারেনি। শুধু তাই নয়, সত্য প্রকাশের কারণে মান্যবর সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে

দুই দফায় জেলবন্দী করেও আপোসে আনা যায়নি। বরাবরই বীরের বেশে হয়েছেন জেলমুক্ত।

মহান মুক্তিযুদ্ধে যে কৃতব্রত নিয়ে অস্ত্র হাতে অংশ নিয়েছিলেন সেই ব্রত স্বাধীনতাপরবর্তী সময়েও স্যারের হৃদয়ের মণিকোঠায় ধারণকৃত ছিল। যে কারণে জনকণ্ঠ একের পর এক রাজাকার, আলবদর, আল শামস বিশেষ করে স্বাধীনতাবিরোধী এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ছিল অবিচল। শেষ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ায়ও বিজয়ের মালা পড়েছেন। দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংস কায়দায় হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে। যারা এখনও বিচারের আওতার বাইরে রয়ে গেছে, তাদেরও শাস্তির আওতায় আনতে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত অবিচল থেকেছেন তিনি।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির অবস্থানকে মজবুত একটি

অবকাঠামো আনতে ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে বেশি ব্রতী ছিলেন। এটা হচ্ছে স্যারের জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি সিদ্ধান্ত। কায়মনোবাক্যে যেমন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন সেনানি ছিলেন, তেমনি দেশ থেকে মৌলবাদ, জঙ্গীবাদসহ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প উপড়ে ফেলতে ছিলেন অবিচল। আর এ কারণে আজীবন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।

দেশপ্রেম, দ্রোহ, সংগ্রাম, প্রত্যাশা ইত্যাদি নিয়ে লড়াই ছিল তার চেতনা ও লক্ষ্য। অসীম সাহসী এ মুক্তিযোদ্ধার ডর ভয় বলতে যেমন কিছু ছিল না, তেমনি ছিল না কোন পিছুটান। বঞ্চিত হয়েছেন, বেইমান মীরজাফরদের রোষানলে পড়েছেন। কিন্তু কোন খেদ ছিল না। বিস্ময়কর জীবনালক্ষ্য। সংগ্রামী জীবনে যা অনিবার্য। বনেদী পরিবারের সন্তান হয়েও

অদম্য সাহসে যে কঠোর পরিশ্রম করে মানুষের কর্ম সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে গেছেন সেটিও আরেক ইতিহাস। জীবনের বিচিত্র কোলাহলে কৃত্রিমতার বিষাক্ত আবহ ও মানুষের অসহায়ত্বই স্যারকে প্রতিবাদী মনোভাবে গড়ে তুলেছিল। আত্মপ্রদর্শনের বহুমুখিতায় জীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন। ত্যাগের সাধনায় একদিকে হয়ে উঠেছিলেন শিল্পের মালিক, তেমনি অন্যদিকে বহুল প্রচারিত দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। বৃষ্টিস্রোত সকাল, তাপপ্রবাহের দুপুর, কনকনে শীত-জীবন চলার পথে কোন কিছুই দমাতে পারেনি তাঁকে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মাঝে জীবনজুড়ে রয়েছে তাঁর সুখ-দুঃখ, ভালবাসা আর কঠিন সংগ্রাম।

স্বপ্ন নিয়ে প্রতিটি মানুষ বেঁচে থাকে। স্যার এর বাইরে ছিলেন না। যে স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে জীবন চলা তা থেকে কখনও বিচ্যুত তাঁকে

করা যায়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নীতি আদর্শ ধারণ করেই জীবনের পথচলা। ফরাসী প্রবাদ, ‘যখন তোমার হাতে কারও জন্য একমুঠো সত্য থাকবে- এর পুরোটাই উন্মুক্ত করে দাও’-এ নীতি নিয়েই দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত থেকে লড়াই চালিয়ে গেছেন। আর এ কারণে জুলুম-নির্যাতন ও মানসিক কঠিন যন্ত্রণার শিকার হয়েছিলেন। অবৈধ উপায়ে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থের লোভ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে সক্ষম ছিলেন। একদিকে নিজের প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম, অন্যদিকে সত্যের পথে সাংবাদিকতা, আবার এক্ষেত্রে আপোসহীন মনোভাবে থেকে রীতিমতো অমরত্ব লাভ করে গেলেন।

দেশের সংবাদপত্র জগতে স্যার জনকণ্ঠকে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে। তাই দেশের

গণমাধ্যম জগতে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির জন্য হয়ে থাকবেন চির উন্নত মম শির। দাপুটে স্বভাবের হলেও মূলত তিনি সরল হৃদয়ের ছিলেন। বর্ণাঢ্য কর্ম, দিবারাত্র পরিশ্রম নিয়ে জীবন এক ঐশ^রিক ঐকতানে বিমুগ্ধকর। শিল্প জগতেও সফলতার কমতি ছিল না। বিশেষ করে এ দেশের সংবাদপত্র জগতে তাঁর নেতৃত্বাধীন দৈনিক জনকণ্ঠের সফলতা অর্জন অনন্য এক ইতিহাস। বিস্ময়েরও বিস্ময়। অনেকের ন্যায় রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়ে রাতারাতি এমপি, মন্ত্রী বনে যাননি সত্য, কিন্তু নিজভূমে নৃপতি হওয়ার অলীক এক লটারি পেয়ে গেছেন। যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রাণবাজি রেখে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন, সেই দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের এই সময়ে স্যারের প্রস্থান

অতি কষ্টের, বড় মনোবেদনার। আমরা এ বেদনা রাখব কোথায়?
মোয়াজ্জেমুল হক
লেখক : সাংবাদিক, উপসম্পাদক, দৈনিক জনকণ্ঠ, চট্টগ্রাম ব্যুরো

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT