ঢাকা, Thursday 23 September 2021

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

অনাথ শিশু ও সুবিধা বঞ্চিত বৃদ্ধদের বাঁচতে শেখা …

প্রকাশিত : 08:54 AM, 2 January 2021 Saturday
83 বার পঠিত

মোহাম্মদ রাছেল রানা | ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স :-

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মমতায় ঘেরা মনোরম পরিবেশে অনেকটা নিজ পরিবারের সদস্যের মতো একসঙ্গে বসবাস করে আসছে একঝাঁক ফুটফুটে অনাথ শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ। জন্মসূত্রে এদের পরিবার-পরিজন থাকলেও, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সবার কাছেই তারা এখন ‘বোঝা’। এই অনাথ শিশুদের মধ্যে কারও বেঁচে নেই বাবা, কারও নেই মা। আবার কারও বাবা, অন্য কোথাও নতুন সংসার পেতেছে। স্বামী ছাড়া অভাবী সংসারে সেই হতভাগী মায়ের ক্ষমতাও নেই, সন্তানকে মানুষের মতো করে গড়ে তুলবার। এমনি এক অবস্থায় এসব পরিবারের অনাথ শিশুদের ঠাঁই মিলেছে দিনাজপুরের শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রমে।

অন্যদিকে বয়সের ভারে অসহায় মানুষরা দু’মুঠো ভাত আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে যখন দিশেহারা, নিজের প্রিয় সন্তানদের

কাছেও যখন তারা বোঝা, তখন তাদের মাথার ওপর বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে আশ্রয় দিয়েছে আলোচ্য শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রম প্রতিষ্ঠান। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া এসব অসহায় বৃদ্ধ ও অনাথ শিশুকে পরম শ্রদ্ধা, মমতা আর স্নেহভরে বুকে টেনে নিয়েছেন ডাক্তার নন্দ দুলাল চক্রবর্তী। যিনি শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক।

দিনাজপুর শহর থেকে সোজা উত্তরে চলে গেছে দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক। শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার উত্তরে এই মহাসড়কের ত্রি-মোহনীতে অবস্থিত ‘দশ মাইল’ মোড়। মহাসড়কের প্রায় ২ কিলোমিটার পশ্চিমে কাহারোল উপজেলার ৫নং পরমেশপুর এবং ৬নং গড়নূরপুর ইউনিয়নে কালো পিচঢালা চিকন রাস্তার পাশেই এই আশ্রম।

জানা যায়, ডাক্তার নন্দ দুলাল চক্রবর্তী ১৯৯২

সালে এলাকার কিছু সমাজসেবী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ১ একর ৮৫ শতক জায়গার উপর গড়ে তোলেন শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রম। নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপির বাবা সাবেক ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী আব্দুর রৌফ চৌধুরী এমপি ১৯৯৬ সালের ১১ জুলাই সেখানে একটি অনাথ ছাত্রাবাস উদ্বোধন করেন। বর্তমানে সেই ছাত্রাবাসে ৪০ অনাথ ছাত্র বসবাস করছে। রয়েছে একটি বৃদ্ধাশ্রম। সেখানেই ঠাঁই মিলেছে ১৩ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি উচ্চ বিদ্যালয়। সুবিধা বঞ্চিত ওই অঞ্চলের প্রায় দুই শ’ শিশু প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়া করে। উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় আড়াই শ’। সমাপনী, জেএসসি

ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল রীতিমতো ঈর্ষণীয়। এই তিন বিভাগে কেউই অকৃতকার্য হয়নি। পাসের ফল জিপিএ-৪ এর ওপর। ২০১৬ সালের ১১ মে ওই এলাকার সংসদ সদস্য মনোরজ্ঞন শীল গোপাল সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি দ্বিতল দাতব্য চিকিৎসালয় এবং অপারেশন থিয়েটার সমৃদ্ধ একটি হাসপাতাল উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এ্যাম্বুলেন্স। সেই এ্যাম্বুল্যান্সে আশপাশের এলাকাগুলোতে, সপ্তাহে দু’বার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয় ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা। বলতে গেলে বর্তমান ওই চিকিৎসালয় ও হাসপাতালটিই এলাকার দুস্থ অসহায় মানুষের চিকিৎসার একমাত্র অবলম্বন।

সরজমিনে শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রমে গিয়ে দেখা গেল, চাটাই ও টিনের চালায় ঝুপড়ির তৈরি ছোট দুটি ঘর নিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটির বৃদ্ধাশ্রম

কার্যক্রম। সেখানে বসবাস করছেন ১৩ বয়স্ক লোক। এদের মধ্যে ৯ বৃদ্ধা ও ৪ বৃদ্ধ। বিনে পয়সায় সকালে নাস্তা, দুপুর ও রাতে খাবার দেয়া হয় এই আশ্রম থেকে। খাওয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, যেটুকু পাচ্ছেন, অগ্যতা তাতেই সন্তুষ্ট আশ্রমের বাসন্দারা। চিকিৎসা সেবা নিয়ে তারা খুবই সন্তুষ্ট। সার্বক্ষণিক তারা পাচ্ছেন এক চিকিৎসক ও দু’জন সেবিকার সেবা। পাচ্ছেন বিনে পয়সায় সব ধরনের ওষুধ। কথা হলো প্রায় আশি বছর বয়স্ক ননীবালার সঙ্গে। বাড়ি দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের বড়ইল গ্রামে। স্বামী ও চার সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল তার। স্বামী মারা যাওয়ার পর তার আর ঠাঁই হয়নি তিলে

তিলে নিজের হাতে গড়া সেই সংসারে। ছেলেরা বৃদ্ধ মাকে বোঝা মনে করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। অসহায় অবস্থায় এক সময় তার ঠাঁই হয়, শ্রীনিগমানন্দ সারস্বত সেবাশ্রমের ওই বৃদ্ধাশ্রমে।

আশ্রমটিতে রয়েছে ৪০ অনাথ শিশু-কিশোর। সেবাশ্রমের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনে পয়সায় কাটছে তাদের শিক্ষা জীবন। এরপর কথা হলো এতিম শিশু-কিশোরদের সঙ্গে। তাদেরই একজন প্রাণ কুমার বর্মণ। বয়স ১৩ বছর। বাড়ি দিনাজপুর জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার জঙ্গলীপীর গ্রামে। প্রাণ কুমার জানায়, বছর ছয়েক আগে তার মা মারা যায়। বাবা গোপাল বর্মণ দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সৎ মায়ের সংসারে আরও দু’জন ভাই-বোন। চার বছর আগে তাকে ওই আশ্রমে রেখে যায়

পরিবারের লোকজন। সেবাশ্রমের উচ্চ বিদ্যালয়ে এখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। প্রাণ কুমার হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানালো, এখানে বেশ ভাল আছি।

প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে স্থানীয় ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোঃ নজরুল ইসলাম জানান, ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রতিষ্ঠাটি এই অঞ্চলের আর্ত-পীড়িত, অনাথ-অসহায়-হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এখানে যারা বসবাস করেন শুধু তারাই না, এলাকার আপামর দরিদ্র মানুষের জন্য সেখানে চিকিৎসা সেবার দুয়ার খোলা। শ্রী নিগমানন্দদেব দাতব্য চিকিৎসালয়ে চিকিৎসা নিতে আসা একজনের সঙ্গে কথা হয়। নাম আবুল কাশেম। বয়স প্রায় সত্তর। তিনি এসেছেন কাহারোল উপজেলার শাহীনগর ঘুগুরপাড়া এলাকা থেকে। তিনি বলেন, আমি একজন গরিব দিনমজুর। টাকা পয়সা তেমন নাই। নামমাত্র সম্মানী দিয়ে এখানে

ভাল চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষারও ব্যবস্থা আছে। জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথাসহ বিভিন্ন প্রাথমিক চিকিৎসার ওষুধ বিনে পয়সায় পাওয়া যায়। তাই এই দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতালে আমি আসি। মোঃ রুস্তম আলী (৬৫) নামে অপর এক ব্যক্তি বললেন, আমি অসুস্থ হয়ে এই হাসপাতালে ৪ দিন ভর্তি ছিলাম। এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ। এখানকার সেবা নিয়ে আমরা আমি সন্তুষ্ট।

আশ্রম পরিচালক ডাক্তার নন্দদুলাল চক্রবর্তী বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোরজ্ঞন শীল গোপাল এবং এলাকার সমাজসেবী মানুষের সহযোগিতায় তিনি তিলে তিলে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন। সমাজ সেবা বিভাগ থেকেও কিছু আর্থিক অনুদান প্রতিষ্ঠানটি পেয়ে থাকে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এখনও

অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও ভারতীয় হাই কমিশনার বরাবর আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে সাড়া পাব। তারপর আশ্রমকে আরও সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি ডোনেট বাংলাদেশ'কে জানাতে ই-মেইল করুন- donetbd2010@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

ডোনেট বাংলাদেশ'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© 2021 সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। ডোনেট বাংলাদেশ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT