যাযাবরদের শ্রেষ্ঠ মানুষে রূপান্তর করাই ধর্ম

৭ অক্টোবর ২০১৭, ১১:৩৩ অপরাহ্ণ  -->| নিউজটি পড়া হয়েছে : 268 বার

শেফাতুল ইসলাম পিন্জু [ বার্তা বিভাগ ]

কেবল আরবি বছরের প্রথম মাস বলেই নয়, নানা কারণেই মুসলিম মানসে, মুসলিম উম্মাহ, এমনকি বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে মহররমের এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কোরআনে আল্লাহতায়ালা যে চারটি মাসকে সম্মানিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন মহররম তার মধ্যে অন্যতম।

মহররম কেবল উম্মতে মোহাম্মদীর জীবনেই নয়, আগেকার নবী-রাসূলদের (আ.) কাছেও সম্মানিত ছিল।


কিন্তু মুসলিম জীবনে এগুলোর সঙ্গে আরেকটি বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়ে হাজির হয়েছে দশ মহররম। সেটি হল নবীজির (সা.) প্রিয় নাতি হজরত হোসাইন (রা.) সপরিবারে কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছেন।

প্রশ্ন হল, কারবালার ময়দানে নবীদৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) কেন প্রাণ দিয়েছেন, কেন তিনি শহীদ হয়েছেন? তাও একা নন, একেবারে মাসুম শিশুটিসহ হোসাইনের (রা.) পরিবারের সব সদস্যকে কেন শহীদ করা হল? তিনিই বা কেন মাসুম বাচ্চাসহ সবাইকে নিয়ে শহীদ হলেন। এর পেছনের মূল কারণটা হল সত্যের পক্ষে তিনি দাঁড়িয়েছেন। অন্যায়ের কাছে কোনোভাবেই মাথানত করেননি। ইয়াজিদের মতো জালিম, ন্যায় পরিপন্থি, নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতায় না আসা ব্যক্তির কাছে মাথানত করেননি, জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবে আজ আমরা কী দেখছি? কেবল রচনা আর সাহিত্যেই ধর্মের জন্য ত্যাগ, রয়েছে সভা-সেমিনারেও। কিন্তু সত্যিকারের ত্যাগ নেই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবনেও ত্যাগ নেই। শুধু তাই নয়, আমরা বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছি ত্যাগের পক্ষে বলিয়ান হতে; কিন্তু নিজের জীবনে আমল করছি ঠিক তার উল্টোটা। যে কোনোভাবে কেবল নিজের স্বার্থ, পরিবার-পরিজনের, এমনকি কোথাও কোথাও ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ জপতে জপতে মাথনত করছি তাগুতের কাছে। কেবল মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের দিকে তাকালেই এসব বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাবে। নির্যাতিতদের জন্য আল্লাহ বলছেন, ‘তোমাদের কী হল তোমরা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম কর না ওইসব মানুষের পক্ষে, যারা বলছে হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের এই জনপথ থেকে বের করুন, এর অধিবাসীরা জালিম। আর আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে ওলি (অভিভাবক) মনোনীত করুন, আপনার পক্ষ থেকে সাহায্যকারী প্রেরণ করুন।’

পৃথিবীর ৫৭টি মুসলিম দেশ, তাদের সংগঠন ওআইসি, সর্বোপরি প্রায় দুইশ’ কোটি মুক্ত মুসলিমও নির্যাতিতদের ভাষায় একইভাবে বলছে, ‘তাদের জন্য ওলি ও সাহায্যকারী’ পাঠান। অথচ আল্লাহর ঘোষণা, বান্দা এগিয়ে এলেই তো গায়েবি সাহায্য আসবে। এই যে আমরা মুসলিমদের সংগঠন ওআইসি, মুসলিম দেশ ও ব্যক্তি উদ্যোগে এগিয়ে যাচ্ছি না, বলার মতো একটুও ত্যাগ করছি না- এটাই কি কারবালার ত্যাগের শিক্ষা? বাস্তবতা তো সেটি বলে না। একবার ভাবুন, হোসাইন (রা.) কি সেদিন জালিম ইয়াজিদের (আজকের জালিমদের জুলুমের তুলনায় ইয়াজিদকে ভালো বললেও অত্যুক্তি হবে না) বিপক্ষে প্রাণ পর্যন্ত দিয়ে এটাই শিখিয়েছেন? মুখে মুখে ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না’ ফেনা তোলার শিক্ষা দিয়েছেন? কখনই নয়।

নির্যাতনের শিকারদেরও দেখুন, যখন বোনকে-স্ত্রীকে ধর্ষণের পর চোখের সামনে হত্যা করা হচ্ছে ভাইয়ের-স্বামীর সামনে, পরিবারের অন্য অর্ধেকের বেশি মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার পর কোনোমতে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি দৌড়ে পালাচ্ছে সে অবস্থায় পেছন দিক থেকে গুলি খেয়ে সেও প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ সে যদি সর্বস্ব হারানোর পর কিছুটা ক্রুদ্ধ-বেপরোয়া হয়ে সামনের দিকে দৌড় দিত তবে জালিম সেনার হাত কেঁপে অন্তত অস্ত্র পড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কেবল রোহিঙ্গা নয়, আমাদের গোটা দুনিয়ার মুসলমানের অবস্থাও হয়ে পড়েছে কেবল কোনোমতে বেঁচে থাকা। মান-মর্যাদা রইল কিনা, তাতে কি-ই বা আসে যায়। আরও ভয়াবহ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত সেখানে সামরিক বাহিনীর কিছু দালাল মুসলমান আছে যারা মুসলিম নিধনে সহায়তা করছে। এরা ভেবেছিল নিজেরা শান্তিতে বাস করবে, অন্যের কী হয় হোক; কিন্তু সর্বশেষ খবর এখন এদেরও শেষ করা হচ্ছে। কারণ মুসলিম বলতেই আর বাকি নেই ওখানে। আমরা ভুলে গেছি আল্লাহর এই বাণী- ইহুদি-নাসারারা (বেদ্বীন) কখনই তোমার অনুসরণ করবে না (তোমার ওপর রাজি-খুশি হবে না) যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসারী হও। যা হোক, আমি বলছি না যে, রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতন যৌক্তিক। বলতে চাই যা তা হল, বিভিন্ন দেশে অনেক মুসলিম মজলুম দরদী আছেন, দ্বীনের জন্য কোরবান হতে প্রস্তুত এমন ভাইরা কি তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না। আল্লাহর বাণী ‘তাকওয়া ও খোদাভীতিতে পরস্পরের সহায়তা কর’ ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহায়তায় থাকে, আল্লাহ বান্দার সহায়তায় থাকেন’ কোরআন-হাদিসের এ বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে আমাদের।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যে জালিম শাসনের মূলোৎপাটনে হজরত হোসাইন (রা.) জীবন দিয়েছেন, সত্যের পক্ষের সুস্পষ্ট অবস্থানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের শিক্ষা দিয়েছেন, সে শিক্ষাই কেবল হারিয়ে গেছে তা নয়, দেশে দেশে ইয়াজিদের প্রেতাত্মারা শাসক হিসেবে আজ জেঁকে বসেছে। জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে, বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে। তাই তো আমরা দেখি, ফিলিস্তিনের মজলুম মানুষের পক্ষে কথা বলায় কারাগারে বন্দি হতে হল একজন সৌদি যুবরাজকে। পদ ঠিক রাখার জন্য আমেরিকা এবং ফিলিস্তিনের নির্যাতিতদের পক্ষে কথা বলায় শাস্তি দেয়া রাজতন্ত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ কাবার ইমামও। এমনকি যে আরব উপদ্বীপ থেকে ইহুদিদের বের করে দিয়েছেন, নাসারামুক্ত ঘোষণা করেছেন আল্লাহর রাসূল (সা.) কেবল ক্ষমতা রক্ষায় তাদের স্থান দেয়া, তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে পিছপা হচ্ছে না বর্তমান শাসকরা। হোসাইন (রা.) যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, কল্লা দিয়েছিলেন বর্তমানের শাসকদের সঙ্গে তাদের কি কোনো মিল নেই?

বর্তমানে যেভাবে আরাকান, বসনিয়া-চেচনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও লিবিয়ায় মুসলিম নিধনযজ্ঞ চলার পরও ৫৭টি মুসলিম দেশের নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ ‘শান্তি’তে বাস করছে। কোনো মতো ত্রাণ পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে, এটাই যদি মানুষের দায়িত্ব হতো, তবে হোসাইনি রক্তে কারবালার প্রান্তর রক্তাক্ত হতো না। ৫৭টি দেশ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ নিয়ে হুমকি দিলে যেখানে তাগুতের ইবলিসের মতো বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পালানোর কথা, সেখানে নিজেদের ক্ষমতা, বৈষয়িক স্বার্থরক্ষায় আমরা মুসলিমরাই তাগুতের পা চাটছি। আসলে আমাদের শোচনীয় অবস্থা যে নিজেদের কারণে, সেটিও আল্লাহ বলে দিয়েছেন, ‘জলে-স্থলে যেসব ফেতনা-ফ্যাসাদ প্রকাশ পায়, তা মানুষেরই হাতের কামাই’।

বর্তমানে মানুষ যেভাবে কেবল নিজের সুখ-শান্তি, আয়-রোজগার, চাকরি, ব্যবসা ও ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে সত্য ও ন্যায়কে ছেড়ে দিয়ে অন্যায়-অনাচারের, কাফির-মুশরিকের সঙ্গে সখ্য গড়তেও পিছপা হচ্ছে না, তা থেকে সহজেই এটা অনুমান করা যায় যে, বেশিরভাগ মুসলমান একেকটা ইয়াজিদের প্রেতাত্মা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নীতিকথায় পিছিয়ে নেই; কিন্তু ‘বিচার মানি তালগাছ আমার’ মনোভাব তো অন্তত তাই প্রমাণ করছে। বহু আলেম, হাজী, গাজী রয়েছেন, যারা নীতিকথার ফুল ফোটান কিন্তু জেনে-শুনে দখল করে রেখেছেন অন্যের জায়গা। অন্যের অধিকার জেনেও সেটি ছাড়ছেন না কেবল এ কারণে যে, মানুষের কাছে লজ্জা পেতে হবে। আবু তালেব যেমন ‘লজ্জার ওপর জাহান্নাম’কে প্রাধান্য দিয়েছেন তেমন আজকের মুসলমান। আমাদের ভাব থেকে এটাই স্পষ্ট, যেন আবু তালেব এবং ওতবা-শাইবারাই আসল ঈমানদার ছিলেন, আমরা নই।

আসলে ইসলামের মূল শিক্ষা কী, সেটিই আমরা ভুলে গেছি। ইসলাম কোনো প্রথাসর্বস্ব, আনুষ্ঠানিকতাকেন্দ্রিক ধর্ম নয়। এটি হচ্ছে জীবনের প্রতিটি দিন সুবহে সাদিক থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বান্দার প্রতিটি কাজ কেমন হবে, কীভাবে চাকরি-ব্যবসা ও অন্যান্য কাজ একজন মানুষ সম্পাদন করবে, তার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আজ আমরা আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ হয়ে গেছি। যে কোনো সমস্যায় কেবল সভা-সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি ও আলোচনা সভা করে পার পেয়ে যাচ্ছি। একদল তো এত বেশি আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়েছে যে, কারবালা ও আশুরা মানে একটি মিছিল বের করা ও হোসাইনের দুঃখে ছোররা মেরে শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়েই হোসাইনের খুনের কাফ্ফারা আদায় করে। মনে রাখতে হবে, ইসলামের উদ্দেশ্য ও কারবালায় হোসাইন (রা.)-এর লক্ষ্য ছিল ইসলামের মর্মবাণী ধারণ করা এবং এর বিনাশের চেষ্টাকারীদের কাছে মাথানত না করা। যাযাবরদের শ্রেষ্ঠ মানুষে রূপান্তর করে নাগরিক ধর্ম ইসলাম সে শিক্ষাই দিয়ে গেছে। প্রথা ও আনুষ্ঠানিকতার পূজার শিক্ষা নয়।

মহররম আসে, মহররম যায়। কারবালার ত্যাগ, হোসাইন (রা.)-এর ত্যাগ নিয়ে কেবল আলোচনাই হয়; কিন্তু থেকে যায় ইয়াজিদের অনুসারীদের ভোগদখল ও জুলুম। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুণ। ‘হে ঈমানদারেরা, তোমরা কেন এমন কথা বল যার ওপর আমল করো না’ হে আল্লাহ আমাদের কোরানের বাণীর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার স্মরণের মাধ্যমে ইয়াজিদের প্রেতাত্মারা নিপাত যাক, হোসাইনি ত্যাগের চেতনা রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সাধারণ নাগরিক- সবার মধ্যে জেগে উঠুক। এটাই আল্লাহর দরবারে মহররমের প্রার্থনা।

লেখক : সাংবাদিক

সাইফুল ইসলাম

saifulh92@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্ত মানবতার সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান। ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম, সরকার ও রাষ্ট্ররিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোন মন্তব্য না করার জন্য বর্নমালা টেলিভিশনের পাঠক ও সুভাকাঙ্খিদের বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোন ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
পাঠকের মন্তব্য
Advertisement
সম্পাদকীয়

যাহা করিবার এখনই করিতে হইবে

গ্রিনহাউস গ্যাসের জন্য ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে এই ধরিত্রী—ইহার স্বপক্ষে প্রকাশ পাইতেছে নিত্যনূতন তথ্য। গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি উচ্চারিত নামটি হইল কার্বন ডাই-অক্সাইড। সমপ্রতি... বিস্তারিত
জনমত জরিপ

সংবিধান মোতাবেক নীতিমালা প্রণয়ন করে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। আপনি কি এ দাবির সঙ্গে একমত?

Loading ... Loading ...
Developed By : Donet IT