জানা অজানায় আমাদের কবি কাজী নজরুল

৩০ আগস্ট ২০১৭, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ  -->| নিউজটি পড়া হয়েছে : 129 বার

শেফাতুল ইসলাম পিন্জু [ বার্তা বিভাগ ]

কাজী নজরুল ইসলাম (মে ২৪, ১৮৯৯–আগস্ট ২৯, ১৯৭৬) (জ্যৈষ্ঠ ১১, ১৩০৬–ভাদ্র ১২, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখযোগ্য। বাঙালী মণীষার এক তুঙ্গীয় নিদর্শন নজরুল। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার এবং সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।

বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতিবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তাঁর কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা  হাতে তাঁর প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তাঁর প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনে – কাজেই “বিদ্রোহী কবি”, তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উভয় বাংলাতে প্রতি বৎসর উদযাপিত হয়ে থাকে।


নজরুল এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক শিক্ষা ছিল ধর্মীয়।

স্থানীয় এক মসজিদে সম্মানিত মুয়াযযিন হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কৈশোরে বিভিন্ন থিয়েটার দলের সাথে কাজ করতে যেয়ে তিনি কবিতা, নাটক এবং সাহিত্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। এসময় তিনি কলকাতাতেই থাকতেন। এসময় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। প্রকাশ করেন বিদ্রোহী এবং ভাঙার গানের মতো কবিতা; ধূমকেতুর মতো সাময়িকী।

জেলে বন্দী হলে পর লিখেন রাজবন্দীর জবানবন্দী, এই সব সাহিত্যকর্মে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ছিল সুস্পষ্ট। ধার্মিক মুসলিম সমাজ এবং অবহেলিত ভারতীয় জনগণের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। তার সাহিত্যকর্মে প্রাধান্য পেয়েছে ভালোবাসা, মুক্তি এবং বিদ্রোহ। ধর্মীয় লিঙ্গভেদের বিরুদ্ধেও তিনি লিখেছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক লিখলেও তিনি মূলত কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলা কাব্যে তিনি এক নতুন ধারার জন্ম দেন। এটি হল ইসলামী সঙ্গীত তথা গজল, এর পাশাপাশি তিনি অনেক উৎকৃষ্ট শ্যামা সংগীত ও হিন্দু ভক্তিগীতিও রচনা করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা এবং অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা “নজরুল গীতি” নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।

১২ ভাদ্র, দ্রোহ ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪১তম প্রয়াণবার্ষিকী। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের (১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) এই দিনে চির অভিমানী বিদ্রোহী কবির মহাকাব্যিক জীবনের অবসান ঘটে। দীর্ঘদিন চেতনাহীন নির্বাক থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ঢাকায় থেমে যায় বাংলাদেশের জাতীয় কবির প্রাণের স্পন্দন। তবে প্রাণের স্পন্দন থেমে গেলেও সৃষ্টির আলোয় আজো অমর হয়ে তিনি। ক্ষুরধার লেখনির আঁচড়ে স্থান করে নিয়েছেন বাংলা সাহিত্য। গল্প, কবিতা, উপন্যাস কিংবা সঙ্গীত-সাহিত্য ও শিল্পের সব শাখায় তাঁর আগমন ছিল ধূমকেতুর মতো। আপন সৃষ্টির আলোয় নতুন দিনের আগমনী বার্তা দিয়ে এঁকে দিয়েছিলেন নবদিগন্তের উজ্জ্বল রেখা। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় আজো তিনি ‘উন্নত মম শীর’। নিপীড়িতের শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তি কিংবা প্রেম ও মানবতার বাণীতে আজো তিনি সমুজ্জ্বল। প্রেম, দ্রোহ ও মানবতার কবির প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

কবি কাজী নজরুলের সাহিত্যকর্ম ও অন্যান্য তথ্য

জন্মঃ ২৫ মে, ১৮৯৯

বাংলাঃ ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬

স্থানঃ চুরুলিয়া, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ রাজ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ)

মৃত্যুঃ ২৯ আগস্ট, ১৯৭৬

বাংলাঃ ১২ই ভাদ্র ১৩৮৩

স্থানঃ ঢাকা, বাংলাদেশ

পিতাঃ কাজী ফকির আহমদ।

মাতাঃ জাহেদা খাতুন

স্ত্রীঃ

১) নার্গিস আসার খানম (সৈয়দা খাতুন):  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী। কবি তার ছায়ানট, পূবের হাওয়া, চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে রচনা করেন। ছায়ানটের মোট ৫০ টি কবিতার মধ্যে বেদনা অভিমান, অবেলায়, হার মানা হার, অনাদৃতা, হারামনি, মানস বধু, বিদায় বেলায়, পাপড়ি খেলা ও বিধূর পথিকসহ মোট নয়টি কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে লেখেন।

২) প্রমিলা দেবীঃ কাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী।

৩) বেগম ফজিলাতুন্নেসাঃ কাজী নজরুল ইসলামের তৃতীয় স্ত্রী।

তাঁর কবিতায় বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁকে বিদ্রোহী কবি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মধ্যবয়সে তিনি পিক্স ডিজিসে আক্রান্ত হন।

স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে সপরিবারে বিদ্রোহী কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এসময় তাকে বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে তাকে `জাতীয় কবি` হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  তাকে D.Litt.  ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে  `একুশে পদক` প্রদান করা হয়।

নজরুল রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে অগ্নিবীণা (কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ), সঞ্চিতা, মরুভাস্কর, চিত্তনামা, ছায়ানট, বিষের বাশী, সন্ধ্যা, দোলন চাপা, জিন্জির, চক্রবাক, প্রলয়শিখা, ফণিমনসা, সর্বহারা, সিন্ধু হিন্দোল, ভাঙ্গার গান, ঝিঙে ফুল, সাম্যবাদী।

লেখকের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ হচ্ছে ব্যথার দান (প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ), রিক্তের বেদন, শিউলিমালা।

তার রচিত উপন্যাস হচ্ছে বাধনহারা (প্রথম উপন্যাস), মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা।

তার রচিত নাট্যগ্রন্থ হচ্ছে ঝিলিমিলি (প্রথম নাট্যগ্রন্থ), পুতুলের বিয়ে, আলেয়া, মধুমালা।

লেখকের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ হচ্ছে যুগবাণী (প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ), রাজবন্দীর জবানবন্দী, দুর্দিনের যাত্রী। কবির প্রথম কবিতা মুক্তি ।

এক নজরে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মঃ

কবিতা

অগ্নিবীণা (কবিতা) ১৯২২

সঞ্চিতা (কবিতা সংকলন) ১৯২৫

ফনীমনসা (কবিতা) ১৯২৭

চক্রবাক (কবিতা) ১৯২৯

সাতভাই চম্পা (কবিতা) ১৯৩৩

নির্ঝর (কবিতা) ১৯৩৯

নতুন চাঁদ (কবিতা) ১৯৩৯

মরুভাস্কর (কবিতা) ১৯৫১

সঞ্চয়ন (কবিতা সংকলন) ১৯৫৫

নজরুল ইসলাম: ইসলামী কবিতা (কবিতা সংকলন) ১৯৮২

কবিতা ও সংগীত

দোলন-চাঁপা (কবিতা এবং গান) ১৯২৩

বিষের বাঁশি (কবিতা এবং গান) ১৯২৪

ভাঙ্গার গান (কবিতা এবং গান) ১৯২৪

ছায়ানট (কবিতা এবং গান) ১৯২৫

চিত্তনামা (কবিতা এবং গান) ১৯২৫

সাম্যবাদী (কবিতা এবং গান) ১৯২৫

পুবের হাওয়া (কবিতা এবং গান) ১৯২৬

সর্বহারা (কবিতা এবং গান) ১৯২৬

সিন্ধু হিন্দোল (কবিতা এবং গান) ১৯২৭

জিঞ্জীর (কবিতা এবং গান) ১৯২৮

প্রলয় শিখা (কবিতা এবং গান) ১৯৩০

শেষ সওগাত (কবিতা এবং গান) ১৯৫৮

সংগীত

বুলবুল (গান) ১৯২৮

সন্ধ্যা (গান) ১৯২৯

চোখের চাতক (গান) ১৯২৯

নজরুল গীতিকা (গান সংগ্রহ) ১৯৩০

নজরুল স্বরলিপি (স্বরলিপি) ১৯৩১

চন্দ্রবিন্দু (গান) ১৯৩১

সুরসাকী (গান) ১৯৩২

বনগীতি (গান) ১৯৩১

জুলফিকার (গান) ১৯৩১

গুল বাগিচা (গান) ১৯৩৩

গীতি শতদল (গান) ১৯৩৪

সুর মুকুর (স্বরলিপি) ১৯৩৪

গানের মালা (গান) ১৯৩৪

স্বরলিপি (স্বরলিপি) ১৯৪৯

বুলবুল দ্বিতীয় ভাগ (গান) ১৯৫২

রাঙ্গা জবা (শ্যামা সংগীত) ১৯৬৬

ছোট গল্প

ব্যাথার দান (ছোট গল্প) ১৯২২

রিক্তের বেদন (ছোট গল্প) ১৯২৫

শিউলি মালা (গল্প) ১৯৩১

উপন্যাস

বাঁধন হারা (উপন্যাস) ১৯২৭

মৃত্যুক্ষুধা (উপন্যাস) ১৯৩০

কুহেলিকা (উপন্যাস) ১৯৩১

নাটক

ঝিলিমিলি (নাটক) ১৯৩০

আলেয়া (গীতিনাট্য) ১৯৩১

পুতুলের বিয়ে (কিশোর নাটক) ১৯৩৩

মধুমালা (গীতিনাট্য) ১৯৬০

ঝড় (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬০

পিলে পটকা পুতুলের বিয়ে (কিশোর কাব্য-নাটক) ১৯৬৪

প্রবন্ধ এবং নিবন্ধ

যুগবানী (প্রবন্ধ) ১৯২৬

ঝিঙ্গে ফুল (প্রবন্ধ) ১৯২৬

দুর্দিনের যাত্রী (প্রবন্ধ) ১৯২৬

রুদ্র মঙ্গল (প্রবন্ধ) ১৯২৭

ধুমকেতু (প্রবন্ধ) ১৯৬১

অনুবাদ এবং বিবিধ[সম্পাদনা]

রাজবন্দীর জবানবন্দী (গান) ১৯২৩

দিওয়ানে হাফিজ (অনুবাদ) ১৯৩০

কাব্যে আমপারা (অনুবাদ) ১৯৩৩

মক্তব সাহিত্য (মক্তবের পাঠ্যবই) ১৯৩৫

রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম (অনুবাদ) ১৯৫৮

নজরুল রচনাবলী (ভলিউম ১-৪,বাংলা একাডেমী)১৯৯৩

সঙ্গীত গ্রন্থাবলী

বুলবুল (১ম খন্ড-১৯২৮, ২য় খন্ড-১৯৫২)

চোখের চাতক (১৯২৯)

চন্দ্রবিন্দু (১৯৪৬)

নজরুল গীতিকা (১৯৩০)

নজরুল স্বরলিপি (১৯৩১)

সুরসাকী (১৯৩১)

জুলফিকার (১৯৩২)

বনগীতি (১৯৩২)

গুলবাগিচা (১৯৩৩)

গীতিশতদল (১৯৩৪)

সুরলিপি (১৯৩৪)

সুর-মুকুর (১৯৩৪)

গানের মালা (১৯৩৪)।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্ত মানবতার সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান। ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম, সরকার ও রাষ্ট্ররিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোন মন্তব্য না করার জন্য বর্নমালা টেলিভিশনের পাঠক ও সুভাকাঙ্খিদের বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোন ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
পাঠকের মন্তব্য
Advertisement
সম্পাদকীয়

যাহা করিবার এখনই করিতে হইবে

গ্রিনহাউস গ্যাসের জন্য ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে এই ধরিত্রী—ইহার স্বপক্ষে প্রকাশ পাইতেছে নিত্যনূতন তথ্য। গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি উচ্চারিত নামটি হইল কার্বন ডাই-অক্সাইড। সমপ্রতি... বিস্তারিত
জনমত জরিপ

সংবিধান মোতাবেক নীতিমালা প্রণয়ন করে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। আপনি কি এ দাবির সঙ্গে একমত?

Loading ... Loading ...
Developed By : Donet IT