একটি পারিবারিক নেটবিহীন রাতের গল্প

২ নভেম্বর ২০১৭, ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ  -->| নিউজটি পড়া হয়েছে : 229 বার

শেফাতুল ইসলাম পিন্জু [ বার্তা বিভাগ ]

১. রাফিনের দাদি জমেলা বেগম শেষ বয়সে এসে উঠেছেন বড় ছেলে জামিলের ঢাকার বাসায়। তার ছেলে সপরিবারে ধানমণ্ডি একটি ফ্ল্যাট কিনে বেশ ক’বছর হল বাস করে আসছে। অনেকটা বাধ্য হয়েই বয়সের ভারে নুয়ে পড়া স্বামীহীনা জমেলাকে ঢাকামুখী হতে হয়েছে। এ বয়সে গ্রামে তাকে যে দেখার কেউ নেই। আধুনিক আর প্রযুক্তিনির্ভর এই নগর তাকে স্বস্তি দিতে পারে কিনা, সেই প্রশ্ন অবশ্য আলাদা। অখণ্ড অবসরে শোয়া-বসা ছাড়া করার মতো তেমন কিছু খুঁজে পান না তিনি।

জমেলা বেগমের নাতি-নাতনি সাকুল্যে তিনজন। রাফিন তিন ভাইবোনের মধ্যে মেজ, ওর বড় বোন রাফা ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করছে। ছোট বোন রিশি ধানমণ্ডির এক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়াশোনা করছে। রাফিন পড়ছে ধানমণ্ডি বয়েজ স্কুলে ক্লাস নাইনে। রাফিনের বাবা জামিল একটি বেসরকারি ব্যাংকের ম্যানেজার। রাফিনের মা হাউসওয়াইফ। মোটামুটি এই হচ্ছে পরিবার ফিরিস্তি। এদের সঙ্গেই জমেলা বেগমের রাতদিন নাগরিক জীবন পার করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।


২. -হাই দাদি! হোয়াটস আপ?

-এখনও ঘুমাওনি দাদু?

-আজকের দিন কেমন আর কী করে কাটালা?

নিত্যদিন নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে এই টাইপ কমন কিছু কথাবার্তা শুনে জমেলা বেগম ভালোই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। কৃত্রিম হাসি দিয়ে ভালো থাকার ব্যাপারটাও পুরো জানানো হয়ে ওঠে না তার, ওদের হাত দখল করে নেয় মোবাইল ল্যাপটপের বাটন, চোখ দখল করে নির্দিষ্ট মাপের স্ক্রিন। নানা জাতের গেম আর ফেসবুক-টুইটার নাকি যেন আছে যা ঘিরে ওদের যাবতীয় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়। জমেলা বেগম অবশ্য মানিয়ে নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে এই পরিবর্তন গ্রহণের যথেষ্ট যোগ্যতা আছে তার।

৩. জমেলা বেগম তার নিজের শৈশব ভাবার চেষ্টা করেন।

শৈশব বলতেই তার মনে পড়ে হাজারটা রঙিন-মলিন স্মৃতিমাখা অবাধ স্বাধীনতার অসাধারণ কিছু দিনের কথা। বাবা-মায়ের আদর-শাসনভরা মুহূর্তগুলো, ভাইবোনদের সঙ্গে পড়ার টেবিলে করা খুনসুটি, দাদুভাইয়ের সাথে মারামারি-ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা, উঠানে মাদুর বিছিয়ে বসে জোছনা রাতে প্রবল আগ্রহে সদলবলে দাদির মুখে রূপকথার গল্প শোনা, আরও কত কিছু!

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জমেলা বেগম, তার বলার অনেক গল্পই ছিল, যা তিনি শিখেছিলেন তার দাদি সুফিয়া বেগমের কাছে। দাদি বলতেন, ‘শোন জমেলা, ভালো কইরা হাস্তর (গল্প) শিখা রাখ, একদিন তোরও নাতি-নাতনি হইব। তখন কিন্তুক এসব কামে লাগব কইলাম।’

হঠাৎ জমেলা বেগম শৈশবের ঐদিনটায় ফিরে যান, দাদির একথায় কী লজ্জাটাই পেয়েছিলেন সেদিন। বাচ্চা একটা মেয়েকে ভবিষ্যৎ নাতির কথা বললে লজ্জা পাওয়াটাই তো খুব স্বাভাবিক।

৪.  দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল সংস্কারজনিত কারণে টানা তিন দিন ধীরগতিতে ইন্টারনেট চলার প্রথম রাত আজ। জমেলা বেগমের বড় নাতনি রাফা ল্যাপটপ নিয়ে অনেকক্ষণ ট্রাই করল। অন্যান্য ওয়েবসাইটে আর কী ঢুকবে সামান্য ফেসবুকেই ঢোকা যাচ্ছে না। পেজ লোড হচ্ছে তো হচ্ছেই, বাফারিং চলছে তো চলছেই! এত দীর্ঘ রাত তার কীভাবে যে কাটবে!

রাফিনের ক্ল্যাস অফ ক্ল্যানে জরুরি অ্যাটাক দিতে হবে, বাঁচা-মরার প্রশ্ন। ওদিকে ক্লাসমেট সুজন লুডুস্টারে রিকুয়েস্ট দিয়ে রেখেছে, জয়েন দিতে হবে। সদ্য তোলা একটা ছবি কভার পিকচার হিসেবেও আপলোডও তো দিতে হবে, আগের ছবিটা পুরনো

হয়ে গেছে, তিন দিন ধরে চেঞ্জ করা হয় না। রাফিন নাইটপ্যাক কিনে রেখেছিল। রাত ১২টার পর সবকিছু করে শেষরাতে ঘুমাতে যাওয়ার প্লান ছিল তার। এখন দেখে, সেই নেটপ্যাক এখনও অ্যাক্টিভেট হয়নি। নেটওয়ার্কে সমস্যা সম্ভবত। রাফিন মনে মনে মোবাইল অপারেটরের গোষ্ঠী উদ্ধার করল!

৫. আকাশে ইয়াবড় জোছনা পিটপিট করছে আজ। জমেলা বেগমকে মধ্যমণি করে রাফিন, রাফা, রিশি জোছনা দেখছে। ওদের রাত জাগার অভ্যাস। আজ নেট নেই বটে, কিন্তু রাতজাগার নিয়মিত রুটিন পাল্টানো যায়নি। এ কারণেই এই জোছনাযাপন।

জমেলা বেগমের তার দাদির শৈশবের সেই ভবিষ্যদ্বাণী মনে পড়ে। নিজ থেকেই তিনি গল্পের ডালি খুলে বসেন। শুরুতে নাতি-নাতনির কেউ আগ্রহ না দেখালেও গল্পের যত গভীরে প্রবেশ করা হচ্ছে, ক্রমশ তাদের আগ্রহও বাড়ছে।

বহুদিন পর গ্রামের সেই গল্পের আসরের আবহ যেন ফিরে এসেছে শহরের ইট কাঠ আর জোছনায় ঘেরা এই রাতে, এই বারান্দায়। রাফিন খেয়াল করলো, তার নেটপ্যাক কাজ করছে। তবু সে দাদির গল্পে এতটাই মজেছে যে ডাটা কানেকশন অফ করে রাখল। ক্ল্যানে অ্যাটাক পড়লে পড়–ক। আজ রাতে অনেক রূপকথা আছে!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্ত মানবতার সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান। ডোনেট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম, সরকার ও রাষ্ট্ররিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোন মন্তব্য না করার জন্য বর্নমালা টেলিভিশনের পাঠক ও সুভাকাঙ্খিদের বিশেষ ভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোন ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।
পাঠকের মন্তব্য
Advertisement
সম্পাদকীয়

যাহা করিবার এখনই করিতে হইবে

গ্রিনহাউস গ্যাসের জন্য ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে এই ধরিত্রী—ইহার স্বপক্ষে প্রকাশ পাইতেছে নিত্যনূতন তথ্য। গ্রিনহাউস গ্যাসের মধ্যে সবচাইতে বেশি উচ্চারিত নামটি হইল কার্বন ডাই-অক্সাইড। সমপ্রতি... বিস্তারিত
জনমত জরিপ

সংবিধান মোতাবেক নীতিমালা প্রণয়ন করে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগের দাবি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। আপনি কি এ দাবির সঙ্গে একমত?

Loading ... Loading ...
Developed By : Donet IT